ভাষা প্রসঙ্গে ‘অবজারভার’ বনাম ‘মর্নিং নিউজ’
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৫৪
ভাষা আন্দোলনের বিষয় কিছু ভাবতে বা লিখতে গেলে একটি প্রশ্ন বরাবর বিস্ময়চিহ্ন নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। একজন বাঙালি যার মাতৃভাষা বাংলা, যিনি সেই ভাষায় কথা বলতে-লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তিনি কেন একটি অচেনা ভাষাকে দেশের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দেবেন। বিশেষ করে, যে উর্দু যখন দেশের প্রায় সবার জন্য একটি বিজাতীয় ভাষা, নিত্যদিন ব্যবহারের অনুপযোগী ভাষা। আরো বিস্ময়কর যে, দেশের শিক্ষিত শ্রেণী বিশেষত শিক্ষক, অধ্যাপক, সাংবাদিক, সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণে পারঙ্গম ব্যক্তিরাইবা কোন বিচারে উর্দুর প্রতি সমর্থন জানান? ঢাকায় তখনো (১৯৫২ সাল নাগাদ) হাতে গোনা কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা। এদের প্রায় সবকটাই মুসলিম লীগ সরকারের জবানে কথা বলে। কোনো কোনোটি আগ বাড়িয়ে মিথ্যা সংবাদ রচনা ও রটনা করে বাংলার দাবি নস্যাত্ করে। যেমন—মর্নিং নিউজ, আজাদ, সংবাদ ইত্যাদি দৈনিকপত্র।
এ অবস্থায় হামিদুল হক চৌধুরী যদিও মুসলিম লীগের সাবেক নেতা, তবু দলীয় কোন্দলের কারণে নুরুল আমিন সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। হয়তো সে কারণে শুরু থেকে ইংরেজি দৈনিক অবজারভার ভাষা আন্দোলনের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছিল। বলা চলে ভাষা আন্দোলনের একমাত্র সমর্থক দৈনিক পত্রিকা ‘পাকিস্তান অবজারভার’। স্বভাবতই সুযোগ পাওয়া মাত্র সরকার তা বন্ধ করে দেবে এটাই স্বাভাবিক। এর কারণ যেমন একদিকে একুশে ফেব্রুয়ারি সামনে রেখে ভাষা আন্দোলনের ব্যাপক প্রস্তুতি তেমনি আসন্ন প্রাদেশিক নির্বাচন—যেসব ক্ষেত্রে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং রাখবে। তাই পাকিস্তান অবজারভারের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল ভাষা আন্দোলনের ওপর পরোক্ষ আঘাত।
একুশের প্রস্তুতি উপলক্ষে এ সময় প্রায়ই আর্টস বিল্ডিং প্রাঙ্গণে ছোটখাট সভা প্রায় লেগেই থাকতো। সঠিক দিন তারিখ মনে নেই। আমতলায় একদিন এক সভায় অবজারভারের তত্কালীন তরুণ সাংবাদিক এবিএম মুসাকে আক্ষেপের সুরে বলতে শুনি, আমরাতো নিষিদ্ধ অবজারভারের হতভাগ্য সাংবাদিক, ভাষা আন্দোলনের পক্ষে কিছু লেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। জানি না এতকাল পর ঘটনাটি মুসা সাহেবের মনে আছে কিনা। সে সময় ছাত্র-শিক্ষক-সাংবাদিকরা অবজারভার ও তার সাংবাদিকদের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল। কিন্তু পত্রিকার মালিকের প্রতি নয়। কারণ, সেখানকার সাংবাদিক ও কর্মচারীদের প্রতি তার আচরণ সহূদয় ছিল না। তারা তখন নিয়মিত বেতনের দাবিতে ধর্মঘটের পথে পা বাড়ান। তার মধ্যে নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া। বলতে হয়—মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।
‘পাকিস্তান অবজারভার’ নিয়ে এতকিছু বলার কারণ—কাগজটির প্রতি নিষেধাজ্ঞা ও তার সাংবাদিকদের দুর্দশাই নয়, ইংরেজি দৈনিক ‘মর্নিং নিউজ’র ভাষা বিষয়ক অপপ্রচার, লীগ নেতাদের যেমন-তেমন বক্তব্য, মওলানা আকরম খাঁর দুই নৌকা ধরে চলা ইত্যাদির সঠিক জবাব একমাত্র অবজারভারই দিয়ে আসছিল। সেই কাগজটি একুশের ক্রান্তিলগ্নে আমাদের হাতছাড়া। মাঘ শেষে ফাল্গুন শুরু হয়ে গেছে। অবজারভারের দেখা মিলছে না। হোস্টেলের কমনরুমের পত্রিকা রাখার লম্বা টেবিলে অবজারভারের জায়গাটা এখন খালি। এ শূন্যতার সুযোগে ‘মর্নিং নিউজ’ ওঠে পড়ে লেগেছে বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে। যদিও বাংলাই কাগজ মালিকদের বরাবর দীর্ঘকাল ধরে দানাপানি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা জুগিয়ে এসেছে। বাংলা-বাঙালির এ উদারতার দাম বাঙালি-অবাঙালি মুসলিম লীগ নেতাদের কেউ দেয়নি। স্মর্তব্য লিয়াকত আলী খানকে গণ পরিষদে নির্বাচিত করে আনা হয় এই পূর্ববঙ্গ থেকে। ফেব্রুয়ারির এ দিনটিতে বড় খবর ‘মর্নিং নিউজ’র পাতায় সম্পাদকীয় স্তম্ভে:অবজারভার নিষিদ্ধ করার জন্য অভিনন্দন জানানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের প্রতি, মুসলিম লীগ দলের প্রতি। এবং তা অপরিসীম আনন্দে। নবাব বাড়ির বাসিন্দা খাজা সাহেবদের পত্রিকা ‘মর্নিং নিউজ’ পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই বাংলার বিরোধিতা করে চলেছে। কারণ একটাই, নবাববাড়ির খানদানি জবানি ভাষা উর্দু। তারা রাজনীতি করেন বাংলায়, বাংলার মাটিতে বসে ব্যবসা, রাজনীতি ইত্যাদির সবকিছু সুবিধা ভোগ করেন, কিন্তু কথা বলেন বাংলার বিরুদ্ধে, কাজ করেন বাংলা-বাঙালির স্বার্থের বিরুদ্ধে।
সেটা বিভাগ পূর্বকাল থেকেই। আর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও ঢাকা বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার পর থেকে তাদের রমরমা অবস্থা। এমনকি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও। যেমন মাওলানা আকরম খাঁ’র। তবে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বাংলা-বিরোধিতায় ‘মর্নিং নিউজ’ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। তাই বছরখানেক আগে বাংলা রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে ‘মর্নিং নিউজ’র ভূমিকা সম্পর্কে ‘ঢাকা প্রকাশ’ তাদের সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছিল (২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫১): ‘সহযোগী মর্নিং নিউজ আদাপানি খেয়ে নেমে গেছেন উর্দুর পক্ষে। উহার শ্রাদ্ধশান্তি না হওয়া পর্যন্ত যে ইনি ক্ষান্ত হবেন না এদেশের লোক তা ভালো করেই জানে। কিন্তু টাকা ও ক্ষমতার বলে কাম ফতে করার দিন আর নেই। জনবল চাই, জনগণের সাপোর্ট পেতে হলে জনগণের মতামতকে গ্রাহ্য করতে হয়’।
না, ওরা কেউ জনমত গ্রাহ্য করেনি। পরিণাম ভালো হয়নি। এক বছর আগে ‘ঢাকা প্রকাশ’ যা লিখেছিল বায়ান্নতে এসে তা আরো প্রকট সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মুসলিম লীগ ও তার সরকার তাদের জনসমর্থন হারিয়ে চলেছে। তা আরো স্পষ্ট একুশের সপ্তাহখানেক আগেও, যখন ভাষার প্রশ্নে ছাত্ররা জনসাধারণের কাছ থেকে অকুণ্ঠ, স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পেয়ে চলেছে। আর তা দেখে শেষ মুহূর্তে সরকার দিশেহারা যা আমরা পরে দেখবো।
লেখক:ভাষাসংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক