বাঁচা

ঘুম ভেঙে যাবার পরও শব্দটা কানে লেগে থাকে। কোদালের মাথায় শক্ত কিছু একটা লেগে টং করে ওঠার শব্দ। চোখ খুলে অন্ধকার ঘরে শব্দটা আবারও যেন স্পষ্ট শুনতে পান আরেফিন সাহেব। স্বপ্ন দেখছিলেন। গতকাল বিকেলে বাগানের পুরো ঘটনাটা আবার দেখতে পেলেন। কোদালের মাথায় সেই শব্দটাও স্পষ্ট শুনতে পেলেন। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, পানি খাওয়া দরকার। লেপ সরিয়ে মেঝেতে পা রাখতেই তীব্র ঠাণ্ডার অনুভুতি পাগলা কুকুরের মতো আচমকা পা কামড়ে ধরে। দ্রুত স্যান্ডেলে পা ঢোকান আরেফিন সাহেব। উঠে গিয়ে ঘরের কোণায় ছোট টেবিলের ওপর রাখা গ্লাস থেকে পানি খান। ভোর হয়নি এখনও। শীতের শেষরাত ভারী একটা বস্তার মতো চেপে বসে আছে চারপাশে। ঘরের ভেতরে কোথাও একটা টিকটিকি ডেকে ওঠে। আরেফিন সাহেব বিছানায় বসেন। খাটের মাথায় রাখা চাদরটা শরীরে জড়িয়ে নেওয়ার পরেও ভেতরে হালকা একটা কাঁপুনি টের পান। আরেফিন সাহেব জানেন এই অনুভূতিটা ঠান্ডার নয়, ভয়ের। ভয় পেয়েছেন আরেফিন সাহেব। কাল বিকেল থেকে ভয়ের একটা শক্তিশালী ঢেউ বারবার ভেতর থেকে আঘাত করে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ভয়ের অনুভূতির অসংখ্য বুদবুদ তৈরি করছে মাথার ভেতরে। সেগুলি অস্তে আস্তে ছড়িয়ে যাচ্ছে শরীরে। এখনো কাউকে কিছু বলেননি আরেফিন সাহেব। রাহেলাকেও না। পাশেই ঘুমাচ্ছে রাহেলা। নিশ্চিন্ত নিদ্রা। লেপের তলায় ওর শরীরটা শ্বাস নেওয়ার নিয়মিত ছন্দে নড়ছে। খুব সাবধানে ঘরের দরজা খুলে লাগোয়া বারান্দায় এসে দাঁড়ান আরেফিন সাহেব। গাছপাল ঘেরা উঠোনের মধ্যে শীতের হাওয়া এতক্ষণ একা একাই খেলে বেড়াচ্ছিল। এবার আরেফিন সাহেবকে সামনে পেয়ে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে। গ্রিলের সামনে দাঁড়ান আরেফিন সাহেব। এল প্যাটার্নের একতলা বাড়িটার সামনে অনেকটা জায়গা। সেখানে ছোট-বড় অনেক গাছ। অনেক বছর ধরে মনের আনন্দে গাছ লাগিয়েছেন তিনি। বারান্দার ধার ঘেঁষে বেড করে মৌসুমি ফুলের গাছ আর তার শখের গোলাপ বাগান। গাছপালার দিকে তাকালে মনেটা ভরে যায় আরেফিন সাহেবের। স্কুলের পরে এই গাছপালা নিয়েই সময় কাটে তার। অন্যদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে বারান্দায় চেয়ার টেনে অনেকক্ষণ বসে থাকেন আরেফিন সাহেব। গাছপালার বুনো গন্ধ নেন বুক ভরে। পাখিদের ডাকাডাকি শোনেন। কিন্তু এখন এই অন্ধকার বারান্দা থেকে বাগানটার দিকে তাকাতে আবারও সেই ভয়ের অনুভূতি কাঁপিয়ে দেয় আরেফিন সাহেবকে। চল্লিশ বছর আগের একটা ঘটনা। তখন কত হবে তাঁর বয়স? বড়জোর বারো। সময়টা ছিল ১৯৭১ সাল। তারপর হু হু করে সময় পার হয়ে গেছে। মনের জমিতে আরও অনেক ঘটনা ছায়া ফেলেছে। সেই স্মৃতি আবার মুছে গেছে অন্য ঘটনাপ্রবাহের তোড়ে। সেই সময় ঘটনাটা কিছুদিন তাঁকে তাড়া করে ফিরেছিল। ভয়ও পেয়েছিলেন খুব। তারপর আস্তে আস্তে থিতিয়ে গেছে। সব ভুলে গেছেন আরেফিন সাহেব। অন্তত ঘটনার স্মৃতিটা মনে পড়ার আগ পর্যন্ত আরেফিন সাহেব তা-ই ভেবেছিলেন। কিন্তু ভুল, ভীষণ ভুল ভেবেছিলেন। বাড়ির সব চেয়ে পুরোনো আমগাছের তলায় কাল বিকেলে সেই দিনটার স্মৃতি একটা পাগলের মতো মাথার ওপর দুই হাত তুলে ছুটে এসে সামনে দাঁড়িয়েছে। কালু মাটি খুঁড়ছিল অনেকক্ষণ ধরে। নতুন লাগানো লাউগাছের গোড়ায় মাটি দেওয়ার কথা ভাবছিলেন অনেকদিন ধরে। কালুকে বলে রেখেছিলেন মাটি খোঁড়ার কথা। অনেকটা খোঁড়ার পর টং করে শব্দটা হয়। শক্ত একটা কিছুতে কোদালের মাথাটা লেগেছিল। আর তারপরই কোদালে তোলা মাটির সঙ্গে উঠে আসে সেই সাদা আতঙ্ক। কোনো একজন মানুষের একটি আঙুলের হাড়। কালু মাটি সরিয়ে তুলে এনেছিল হাড়টা। ‘মামুজি, এইটা কী দেখেন তো, মানুষের হাড্ডি বইলা মনে হয়?’ কালুর প্রশ্ন শুনে হাড়টার দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য বোকা হয়ে যান তিনি। এক ঝটকায় চল্লিশ বছর আগের স্মৃতি সামনে এসে দাঁড়ায়। কালু ভয় পেয়ে সদ্য খোঁড়া গর্তের কিনারা থেকে সরে এসে তাঁর পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। কাঁপা গলায় আবার প্রশ্ন করেছিল, ‘মামুজি, এইখানে মানুষের হাড্ডি আইল কই থেইক্যা?’ আরেফিন সাহেবের স্মৃতি ততক্ষণে অবলুপ্ত কৌটোর ঢাকনা সরিয়ে একের পর এক দৃশ্য পাঠাতে শুরু করেছে। আরেফিন সাহেবের হঠাত্ মনে হয়েছিল ভীষণ শীত করছে। গায়ের চাদর আর কানঢাকা টুপির ফাঁক দিয়ে হু হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া ভেতরে ঢুকে তাকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ কালুর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। কালু ভয়ে হাড়ের টুকরোটা আবার ফেলে দিয়েছিল গর্তের ভেতরে। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে আরেফিন সাহেব তাকিয়েছিলেন কালুর দিকে। শুকিয়ে যাওয়া খসখসে গলায় বলেছিলেন, এখানে মানুষের হাড় আসবে কোত্থেকে! কালু তার কথাটা মেনে নিতে পারেনি। ভয় পাওয়া গলায় তর্ক করেছিল। ‘না মামুজি, এইটা মাইনষের হাড্ডি। আমি চিনি। ভিতরে মনে হয় আরও আছে।’ কালুর সঙ্গে আর তর্ক করার মতো অবস্থায় ছিলেন না আরেফিন সাহেব। গর্তটা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে দ্রুত পায়ে বাসায় চলে এসেছিলেন। চুপ করে অনেকক্ষণ বসে ছিলেন বসার ঘরের বারান্দায়। কালু গর্তটা বন্ধ করে সন্ধ্যাবেলা আবার এসেছিল তাঁর কাছে। আরেফিন সাহেব তখন প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ী বসার ঘরে একটা চেয়ারে বসেছিলেন। সামনে নিচু টেবিলের ওপর চায়ের কাপ আর ছড়ানো দৈনিক পত্রিকা। পড়ছিলে না আরেফিন সাহেব, তাকিয়েছিলেন। কাজ শেষ করে কালু চলে যাবে। আরেফিন সাহেব বিষয়টা নিয়ে আর কোনো কথা বলেননি কালুর সঙ্গে। পকেট থেকে একশ টাকা বের করে কালুর হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছেন ঘটনাটা নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা না করতে। এসব নিয়ে কথা বললে কালুরও বিপদ হতে পারে। কালু কি কথাটা কাউকে বলে দেবে? বারবার প্রশ্নটা তাঁর মনের পুকুরে ছোঁ মেরেছে আর বারবার ভয়ে চমকে উঠেছেন আর ভয়ে ভেতরে ভেতরে সিঁটিয়ে গেছেন। একজন মানুষের মুখ তাঁর মনের পর্দায় ফুটে উঠেছে। এই মানুষটাকে ছোটবেলা থেকে ভয় পান আরেফিন সাহেব। ২. ‘তোমার কী হয়েছে, বলো তো?’ নাস্তা সামনে নিয়ে টেবিলে বসেছিলেন আরেফিন সাহেব। হঠাত্ রাহেলার প্রশ্ন শুনে চমকে তাকান। রাহেলা চায়ের কাপ টেবিলে নামিয়ে রেখে সামনের চেয়ারটা টেনে বসে। আরেফিন সাহেব প্রশ্নটা শুনে একটু থতোমত খেয়ে যান। তাড়াতাড়ি রুটি আর আলুভাজা মুখে দিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলেন, কী হবে! বিকেলে স্কুলে একটা জরুরি মিটিং আছে, সেটার কথা ভাবছিলাম। রাহেলা চায়ের ওপর তখনও ভেসে থাকা দুধের সর একটা চামচে তুলে নিতে নিতে বলে, তুমি খামোখা কথা ঘোরাচ্ছ। আমি বুঝতে পারছি, তোমার কিছু একটা হয়েছে। চায়ের কাপটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে আরেফিন সাহেব কিছুটা অসহায় দৃষ্টিতে তাকান স্ত্রীর দিকে। রাহেলাকে ঘটনাটা বলতে চান না আরেফিন সাহেব। কী দরকার নিজের মাথার ভেতরে ধীরে ধীরে দীর্ঘ হওয়া ভয়ের সাপটাকে রাহেলার গায়ে জড়িয়ে দেওয়ার? রাহেলা এসব সহ্য করতে পারবে না। তিনি কি নিজেই পারছেন ঘটনাটার সেই স্মৃতির চাপ সহ্য করতে? বারবার মনে হচ্ছে, কী দরকার ছিল কালুকে ডেকে এনে লাউ গাছের জন্য নতুন মাটি জোগাড় করার। ওই জায়গাটা খুঁড়তে না হলে তো ওই হাড়টা উঠে আসত না। মনে পড়ে যেত না সেই ভয়ংকর স্মৃতি। এত দিনে সব ভুলে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কাল বিকেলের পরে নির্ভুলভাবে প্রত্যেকটা দৃশ্য মনে পড়ে যাচ্ছে। ভেসে উঠছে একজন মানুষের মুখ। ‘কী ভাবছ, বললে না?’ রাহেলার প্রশ্নে আরেফিন সাহেবের চিন্তার স্রোত ধাক্কা খায়। এক চুমুকে ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া চা গলায় ঢেলে দিয়ে তাকান স্ত্রীর দিকে। অন্যমনস্ক গলায় বলেন, বললাম তো মিটিং নিয়ে ভাবছি। এমপি সাহেব আসবেন। কী বলবে, কে জানে? কথাটা বলে উঠে পড়েন আরেফিন সাহেব। বেলা হয়ে যাচ্ছে, স্কুলের জন্য তৈরি হতে হবে। দুপুর পর্যন্ত মোটামুটি ভালোই ছিলেন। ক্লাসের ব্যস্ততা, টিচার্স রুমে প্রতিদিনের আড্ডায় ঘটনাটার কথা প্রায় ভুলতে বসেছিলেন আরেফিন সাহেব। ঝামেলা বাঁধাল ফোনটা এসে। ফোন করেছে একটা টিভি চ্যানেলের স্থানীয় প্রতিনিধি সাইফুল। বুকের ভেতরে ধক করে আরেফিন সাহেবের। সাইফুলের হঠাত্ ফোন করার অর্থ হচ্ছে খবরটা ছড়িয়েছে। কালু কথাটা চেপে রাখতে পারেনি। ‘স্যার কি ব্যস্ত? একটু কথা ছিল আপনার সাথে।’ একটু চাপা গলায় কথা বলে সাইফুল। আরেফিন সাহেব বসে ছিলেন টিচার্স রুমে। ফোনটা হাতে নিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে বারান্দায় চলে আসেন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলেন, একটু ব্যস্ত, কেন? ‘একটা খবর শুনলাম স্যার, আপনার বাসার উঠানে মাটি খুঁড়তে গিয়ে না কি মানুষের হাড় পাওয়া গেছে, দৈনিক সকালবেলার এক রিপোর্টার কোত্থেকে শুনে আমাকে বলছিল। আমি তো শুনে অবাক। তাই ফোন করলাম।’ সাইফুলের কথা শুনে আরেফিন সাহেবের শরীর এক ঝটকায় ঠাণ্ডা হয়ে যায়। যা ভয় পেয়েছিলেন, তা-ই হয়েছে। এরা জেনে গেছে। এদের এখনই ঠ্যাকাতে না পারলে সাংঘাতিক বিপদ হবে। আরেফিন সাহেব শরীরের ভেতরের কাঁপুনি থামাতে এক হাতে বারান্দার গ্রিল চেপে ধরেন শক্ত করে। গলা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে বলেন, আমার বাসায় মানুষের হাড়! কী বলছ এসব, সাইফুল? ‘আমিও তো সে জন্য ফোন করলাম। পত্রিকার এইসব ফক্কড় মার্কা রিপোর্টাররা কখন কী বলে, তার ঠিক নেই। তাই ভাবলাম আপনাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করি।’ হঠাত্ পেটের ভেতরটা গুলিয়ে ওঠে আরেফিন সাহেবের। মনে হয়, সকালের ঠাণ্ডা চা বের হয়ে আসবে গলা দিয়ে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলেন, যতসব ফালতু কথা। তোমাদের পত্রিকার লোকেরা কোথায় কী শুনে এসে... যত্তসব বাজে কথা। আমার বাসায় মানুষের হাড় আসবে কোত্থেকে? সাইফুল হাসে। আরেফিন সাহেব লাইন কেটে দিয়ে কপালের ঘাম মোছেন। জানুয়ারি মাসের তীব্র ঠাণ্ডায় তাঁর কপালে ঘাম দেখা দিচ্ছে। ফোনটা পাঞ্জাবির পকেটে রেখে টিচার্স রুমের দরজায় দাঁড়াতেই মুখোমুখি হন আলিম সাহেবের। সকুলের আরবি শিক্ষক। আলিম সাহেব তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলেন, আরেফিন সাহেব, কী হয়েছে আপনার? চেহারাটা এ রকম লাগছে কেন, শরীর খারাপ? নিজেকে সামলে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন আরেফিন সাহেব। ফ্যাকাশে হাসি হেসে বলেন, না, না। মাথাটা হঠাত্ ঘুরে উঠল। মনে হয় ব্লাড সুগারটা নেমে গেছে। আলিম সাহেবের অনুসন্ধানী দৃষ্টি আবারও ঘুরে আসে আরেফিন সাহেবের মুখের ওপর। ‘খুব খারাপ কথা, হঠাত্ এভাবে সুগার ফল করা... আপনি রাজ্জাককে শরবত বানিয়ে দিতে বলেন। চিনি খেলে ভালো লাগবে। সকালে মনে হয় ভালো করে খেয়ে বের হননি।’ এত কথা শুনতে ভালো লাগছিল না আরেফিন সাহেবের। কিন্তু আলিম সাহেব নাছোড়বান্দা লোক। হাঁকডাক করে গোটা টিচার্স রুম মুহূর্তেই গরম করে ফেললেন। পিওন রাজ্জাককে বলা হলো শরবত বানাতে। সবাই মিলে আরেফিন সাহেবকে ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দেয়। চেয়ারে বসে পকেট থেকে রুমাল বের করে বারবার মুখ মোছেন আরেফিন সাহেব। তাঁর মাথায় একটাই চিন্তা, স্কুল থেকে বের হয়ে সাইফুলকে ফোন করতে হবে। খবরটা নিয়ে প্রেসক্লাবে আলোচনা শুরু হওয়ার আগে থামাতে হবে। সাংবাদিকরা যদি তাঁর বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়, তাহলে সর্বনাশের আর কিছু বাকি থাকবে না। কালু কাউকে না কাউকে কথাটা বলেছে। কালুর কথার সূত্র ধরে কেউ যদি গর্তটা আবার খুঁড়ে দেখতে চায়, তাহলে... আর কিছু ভাবতে পারেন না আরেফিন সাহেব। ১৯৭১ সালের শেষ দিকে এক সন্ধ্যাবেলা এই জায়গাটায় দুজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হয়েছিল। হ্যাঁ, জ্যান্ত কবর। দূরে একটা আম গাছের তলায় জমে থাকা ঝুপসি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ঘটনাটা দেখেছিলেন তিনি। সদ্য খোঁড়া গর্তের পাশে চোখ-মুখ বাঁধা দুজন মানুষের অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পান আরেফিন সাহেব। বন্দুক হাতে কয়েকজন লোক কথা বলছে। মাঝে মাঝে টর্চ জ্বলে উঠে আবার নিভে যাচ্ছে। গর্ত খোঁড়া হয়ে গেলে অন্ধকার থেকে একটা ভারী কণ্ঠ নির্দেশ দেয় দুই মুক্তিযোদ্ধাকে জ্যান্ত মাটিচাপা দিয়ে দিতে। কণ্ঠস্বরটা শুনে সেদিন ভয়ে কেঁপে উঠেছিলেন আরেফিন সাহেব। মানুষটা আর কেউ নয়, তাঁর বড় চাচা রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার মুশতাক আলী। দুই বছর আগে সরকারের মন্ত্রী হয়েছে। ‘স্যার, শরবত আনছি।’ পিওন রাজ্জাকের গলা শুনে চমকে চোখ খুলে তাকান আরেফিন সাহেব। আরও কয়েকজন টিচার উদ্বিগ্ন মুখে চারপাশে ভিড় করে আছে। পাশ থেকে আলিম সাহেব বলেন, নেন, শরবতটা খেয়ে সোজা বাসায় চলে যান। আপনাকে অনেক অসুস্থ মনে হচ্ছে। গলার ভেতরটা শুকিয়ে শিরিষ কাগজের মতো হয়ে গেছে। রাজ্জাকের হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে এক টানে খালি করে দেন আরেফিন সাহেব। পেটের ভেতরটা আবারও গুলিয়ে ওঠে। আরফিন সাহেব কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেন না। রুমাল দিয়ে আবারও মুখ মুছে ভারি পা টেনে টেনে টিচার্স রুম থেকে বের হয়ে আসেন। এখন তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়া দরকার। বাসার সামনে ‘সংবাদপত্র’ লেখা একটা মটরসাইকেল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয়টা একটা বড় ব্যাঙের মতো থপথপিয়ে এগিয়ে আসে। ওরা তাহলে এসে গেছে! ফেরার পথে আবারও সাইফুল ফোন করেছিল। কালুকে মনে মনে বাপ-মা তুলে গাল দেন আরেফিন সাহেব। পাশের বাঁশবাগান থেকে প্যান্টের জিপার লাগাতে লাগাতে বের হয়ে আসে সাইফুল। এক গাল হেসে বলে, আগেই চলে এলাম স্যার। খবরটা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। সাইফুলের দিকে ভালো করে তাকাতে পারেন না আরেফিন সাহেব। একটা ফ্যাকাশে হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলেন, মিডিয়ার লোকদের আর কোনো কাজ নেই মনে হয়। কে কী বলল, তা-ই শুনে তোমরাও পাগল হয়ে গেলে। আমার এখানে মানুষের হাড় আসবে কোত্থেকে? ‘আমিও তো তাই বলেছি স্যার, কিন্তু এরা খবরটা শুনে উত্তেজিত। জায়গাটা দেখতে চায়। আমি সে জন্য আগেই চলে এলাম।’ আরেফিন সাহেবের মনে, হয় এবার হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়বেন তিনি। সাংবাদিকরা এখানে এলে ব্যাপারটা আর চাপা থাকবে না। এত বছর আগের সবকিছু বের হয়ে আসবে। কালু বলেছিল নিচে আরও হাড় আছে। মাটির নিচে সেই দুজন মানুষের হাড়গোড়ের কতটা অবশিষ্ট আছে, কিছুই জানেন না আরেফিন সাহেব। কিন্তু এটা জানেন, এ ব্যাপারে পত্রিকায় খবর ছাপা হলে মুশতাক আলী তাঁকে ছাড়বে না। এই জেলার মানুষ এখনো এই লোকটাকে আড়ালে ‘খুইন্যা মোশতাক’ বলে ডাকে। ভয়ংকর মানুষ এই মোশতাক আলী। তাদের পরিবারের সবাই এখনো এই লোকের ভয়ে এক ঘাটে পানি খায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উধাও হয়ে গিয়েছিল এই লোক। তারপর ফিরে এসে আবার জাঁকিয়ে বসেছিল। নতুন রাজনৈতিক দলে ভিড়ে ভোল পাল্টে ফেলেছিল চোখের পলকে। ভয় দেখিয়ে নিজের ভাইদের অনেক জায়গাজমি দখল করে আবার নিজের সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। কাঠ-খড় পুড়িয়ে মন্ত্রী হয়েছে। নিজের সমস্যা হলে ভাতিজা আরেফিন আলীকে খুন করে ফেলতেও হাত কাঁপবে না মানুষটার। ‘স্যার, চলেন জায়গাটা একবার দেখি।’ সাইফুলের কথায় আবারও চমকে ওঠেন আরেফিন সাহেব। বোকা বোকা গলায় বলেন, জায়গাটা দেখবে মানে... তুমি বিশ্বাস কর, ওখানে মানুষের হাড়গোড় সত্যি সত্যি আছে? ‘বলা যায় না স্যার। দিনকাল ভালো না। যদি কেউ কাউকে খুন করে এখানে পুঁতে রেখে যায়? তখন তো বিপদে পড়বেন আপনি।’ সাইফুলের মুখে খুন শব্দটা শুনে নিজেই কয়েক পা পিছিয়ে যান আরেফিন আহমেদ। সেই সন্ধ্যায় চোখ-মুখ বাঁধা দুটি মানুষের মূর্তি এক লাফে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। আহত, ক্লান্ত দুজন মুক্তিযোদ্ধা কিছুটা বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মোশতাক আলীর নির্দেশ শুনে ওরা স্থির ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল। বন্দুকের বাঁট দিয়ে কয়েকজন আবারও মারছিল তাদের। গর্তের ভেতরে নামিয়ে দেওয়ার পরেও ওই দুজন মানুষ একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। দৃশ্যগুলি সিনেমার রিলের মতো তাঁর মনের পর্দায় একের পর এক ফুটে উঠতে থাকে। গর্তের ভেতরে ঝুপঝুপ করে মাটি ফেলার আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পান আরেফিন সাহেব। দল বেঁধে এসেছিল সাংবাদিকরা। জায়গাটা ঘুরে দেখে সবাই চলে যাবার পরেও অনেক্ষণ বাইরের বারান্দায় বসে থাকেন আরেফিন সাহেব। সাইফুল বারবার বলছিল অন্য কোনো প্রাণীর হাড় থাকার সম্ভাবনার কথা। সারাক্ষণ ভয়ে কাঁটা হয়ে ছিলেন। মনে হচ্ছিল ভয়ের সেই বড় ব্যাঙটা একটু দূরে বসে কুতকুতে চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। সাইফুলের কথায় শুধু মাথা নেড়ে গেছেন। কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না তিনি। এখনো মনে হচ্ছে ব্যাঙটা বসে আছে সামনে। সবুজ মাথাটা নাড়ছে একটু একটু। ব্যাঙের গায়ে অনেকদিন আগের পুরোনো শ্যাওলা আর মাটি। কবরের মাটি। সামনের রাস্তা থেকে শীতের হওয়া ছুটে এসে কাঁপিয়ে দিয়ে যায় তাঁকে। আরেফিন সাহেব বুঝতে পারেন, ভয় তাড়া করে ফিরছে তাঁকে। মোশতাক আলীর ভয়। এই জেলাশহরে সামান্য স্কুলমাস্টার তিনি। চাচা দখল করে নেওয়ার পর যেটুকু সামান্য জমিজমা ছিল, সেখানে একটা একতলা বাড়ি তৈরি করেছেন। তাঁদের শেষ আশ্রয়। মোশতাক আলীর এই ঘটনা এখন জানাজানি হলে প্রাণ হারানোর সঙ্গে সঙ্গে এই বাড়িটাও হারাতে পারেন তিনি। এই জেলায় নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার জন্য খুনে বাহিনী তৈরি করেছে মোশতাক আলী। লোক দিয়ে তাঁকেও একটা গর্তে ফেলে মাটিচাপা দিয়ে দেওয়া কোনো ব্যাপার না মোশতাক আলীর জন্য। চেয়ার থেকে ওঠার শক্তিটাও অর্জন করতে পারেন না আরেফিন সাহেব। ভয়টা তাঁকে বারবার ঠেলতে ঠেলতে সেই গর্তটার পাশে নিয়ে যাচ্ছে। দুজন জীবন্ত মানুষের ওপর মাটি ফেলার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন তিনি। ওই দুজন মানুষ কিন্তু সেদিন একটুও ভয় পায়নি। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের জন্য খোঁড়া কবরের পাশে। দম বন্ধ হয়ে আসে আরেফিন সাহেবের। এত বছর আগের একটা ঘটনা এভাবে ফিরে এসে তাঁর সব শান্তি লণ্ডভণ্ড করে দেবে, ভাবতেও পারেননি তিনি। ‘তোমার ফোন, বড় চাচা।’ রাহেলার হাতে ধরা মোবাইল ফোনটাকে একটা সাপের মতো মনে হয় আরেফিন সাহেবের। মনে হয়, এখনই সব নিশ্বাস বের হয়ে যাবে শরীর থেকে। আর ফিরে আসবে না। খবরটা তাহলে মোশতাক আলীর কানে পৌঁছে গেছে। এবার কী করবেন তিনি? ‘আশ্চর্য, ধরছ না কেন। চাচা জরুরি কথা বলবে তোমার সাথে।’ ফোনটা সামনে ধরে হাত নাড়ায় রাহেলা। ক্রমশ ভারী হয়ে আসা হাতটা তুলে ফোন ধরেন আরেফিন সাহেব। ও-পাশ থেকে সেই ভারী আর খসখসে কণ্ঠস্বর ভেসে আসে— ‘হ্যালো আরেফিন, কেমন আছিস?’ কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা খুঁজে পান না আরেফিন সাহেব। শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটের ওপর জিভটা বুলিয়ে অনেক কষ্টে বলেন, জি, ভালো। আপনি...? মোশতাক আলীর ভারী কণ্ঠস্বরে চাপা পড়ে যায় তাঁর কথা। ‘তোর বাসায় এসব কী হচ্ছে? আমাকে একজন ফোনে জানাল। সাংবাদিকরা এসেছিল কেন?’ বুকের ভেতরে হাঁচড়-পাচড় করে কথা খোঁজেন আরেফিন সাহেব। ‘জি চাচা, ওরা আসলে একটা খবর পেয়ে... আমিও ঠিক বুঝতে পারিনি। গতকাল বিকেলে মাটি খুঁড়তে গিয়ে...’ কথা শেষ করতে পারেন না আরেফিন সাহেব। তার আগে আবার কথা বলেন মোশতাক আলী। ‘এত বছর পরে এসব নিয়ে কোনো কথা হোক, আমি চাই না। তুই সাংবাদিকদের বুঝিয়ে বলে দে, ওইসব কুকুরের হাড্ডি। তোরা ওখানে বসে শুধু ফালতু ঝামেলা বাঁধাচ্ছিস। এসবের মানে বুঝতে পারিস? কোনো ঝামেলা হলে আমি কাউকে ছাড়ব না।’ রাহেলা তাঁর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে আছে বোকার মতো। আরেফিন সাহেব শুকিয়ে যাওয়া গলা পরিষ্কার করেন কোনোমতে। ‘ঠিক আছে চাচা, আমি বলে দেব।’ ‘দেখিস, আমাকে আবার যেন তোর বাসায় পোলাপান পাঠাতে না হয়। এসব নিয়ে কোনো কথা হলে আমি...’ কথাটা শেষ করে না মোশতাক আলী। ফোনটা কেটে যায়। রাহেলার দিকে বোকার মতো তাকান আরেফিন আলী। ‘কী হয়েছে, চাচা কী বলল?’ রাহেলা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে। ‘কিছু না।’ ‘কিছু না মানে! তোমার চোখ-মুখ বলছে সাংঘাতিক কিছু একটা হয়েছে। একটু আগে সাংবাদিকরা এসেছিল কেন?’ সেই সবুজ রঙের ব্যাঙটা আরও কাছে এগিয়ে আসে। ব্যাঙের শরীর থেকে অনেক আগের পুরোনো মাটির ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এসে লাগে আরেফিন সাহেবের। অনেক কষ্টে ঠোঁট নাড়ান তিনি। ‘বললাম তো, কিছু হয়নি। তুমি যাও।’ আরেফিন সাহেবের চোখের সামনে এক সন্ধ্যাবেলা দুটি মানুষের অবয়ব আবার ফিরে আসে। গর্তের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। কেউ বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করতেই একজন ধপ করে গর্তের ভেতরে পড়ে যায়। তারপর আরেকজনকে টেনে ফেলে দেওয়া হলো ভেতরে। এবার মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে। পাথরে তৈরি দুজন মানুষ শুয়ে আছে গর্তের ভেতরে। চমকে বাস্তবে ফিরে আসেন আরেফিন সাহেব। এত সাহস কোথায় পেয়েছিল দুজন মানুষ? কীসের জোরে এভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যায়? দেশের জন্য ভালোবাসা? কথাটা ভাবতেই কেউ যেন চেয়ার থেকে ঠেলে দাঁড় করিয়ে দেয় আরেফিন সাহেবকে। এতক্ষণ ধরে ক্রমাগত এগিয়ে আসা সবুজ ব্যাঙটা থমকে যায়। আরেফিন সাহেবের মাথার ভেতরে একটা প্রশ্ন ধোঁয়ার মতো দ্রুত ছড়িয়ে যেতে থাকে, এত সাহস মানুষ কোথায় পায়? জীবন তুচ্ছ হযে যায় কখন মানুষের কাছে? উঠে দাঁড়িয়ে রাহেলার দিকে তাকান আরেফিন সাহেব। তারপর বারান্দা থেকে পা বাড়ান বাইরের দিকে। রাহেলা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে আবার। ‘এখন আবার কোথায় যাচ্ছ তুমি?’ ঘুরে তাকান আরেফিন সাহেব। আস্তে করে বলেন, সাইফুলের বাসায় যাচ্ছি। ওকে কয়েকটা কথা বলার আছে আমার। কথাটা বলে রাস্তায় নামেন আরেফিন সাহেব। সবুজ ব্যাঙটাকে চোখের সামনে আর দেখতে পান না তিনি।