তরুণ লেখক প্রথম বই

তরুণ কবির প্রথম বইয়ে ধরা থাকে কার মুখ! অগুনতি স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে সঙ্গীত করে প্রথম বইয়ের মাধ্যমে তরুণ কবি হাজির হন পাঠকের কাছে। অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত তরুণ কবিদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত ৮ জনের কবিতাভাবনা ও পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ নিয়ে এই আয়োজন। তানভীর মাহমুদ জন্ম :৯ অক্টোবর ১৯৮০ প্রতিবিহার তানভীর মাহমুদ সংবেদ যা কিছু কবিতায় ধরা পড়ে সবই বাস্তব। কবিতাকে বিমূর্তায়ণ কিংবা প্রাত্যহিকতার নাম-পরিধির বাইরে দেখতে চেয়ে কিছু স্বতন্ত্র জগত্ ও তাদের নানা বিচ্ছুরণের ভেতর দিয়ে এক সঙ্গীতকে ধরতে পারা যায়। বিচ্ছুরণগুলো একই সাথে স্থিতি, সাম্য, তান, এনট্রপি, ইেকন্দ্রীকতা ও রূমময়তার ও অন্তঃশীলতার অজস্র জায়মান প্রবাহ বইয়ে চলে। এই স্রোতে একমুখীনতার বদলে বহুতল স্পর্শী ও অসংখ্য দিকে ধেয়ে চলা সত্তাগুলো একে অন্যের সাপেক্ষে একে অন্যকে ছেদ করে দেয় এবং স্বচ্ছ করে; কিংবা জন্ম দেয় অজন্ম প্রাণ ও রূপ। এর মাঝে আমরা পেয়ে যাই সঙ্গীতেরও কিছু উদ্ভাস—কখনো তা সরব মুখর; কখনো মুক, মৌনি যাপনকারী বা মৌনি বয়ানকারী, কখনো গুচ্ছ গুচ্ছ ডৌলের স্থাপত্যকে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় সে গেঁথে দেয়। ঝঙ্কার ও ধ্বনিমালার মাধুর্য থেকে হয়তো মৌনির ও ধ্যানের ধীর যাপনের দিকে যাবার সময় চোখ মেলে কবিতা দেখে নেয় একেকটি বাস্তবের একই সময়ে বহুমাত্রায় স্বতন্ত্র সব বিহার—যারা কখনো কোমল, কখনো অশোধিত, কখনো লাবনীর আলো ও আঁধার। এভাবেই গড়ে ওঠে ট্রেক্সাচার, বুনট ও ভাষা। এভাবেই কবিতা ধরে রাখে প্রতিবিহার। অথির শেরপা জন্ম :১১ জুলাই ১৯৮৩ কোকিলের রাগত স্বর অথির শেরপা ঐতিহ্য প্রকাশনী এই স্বনির্মিত পৃথিবীতে আছে অজস্র রং, আস্বাদন এবং সৌরভের আশ্চর্য কোরাস। আমার বেদনা-ঘোরগ্রস্ততা আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখে অনন্তকালের এক দায় থেকে। আমার রূপ থেকে যে প্রতিরূপ—উভয়কে মেলানোর চেষ্টাই চলতে থাকে নিরন্তর। কোনো রঙিন সিংহীর কেশরের সঙ্গে চামড়ার অচ্ছেদ্য সম্পর্কের মতো এই সাঁকোবন্ধ। আর তখন বুঝে যাই—আমারও নিস্তার নেই! আগুনের সূত্র মেনেই তবে জ্বালাতে হবে দেশলাই। দাহসৌন্দর্যের মাঝে খুলে যেতে দেখি শর্ষেফুলের বিস্তৃত মাঠ! আর আমার ছাঁচে আমি গড়ে উঠতে থাকি। আমি তো আসলে যাপন করি যৌথজীবন। পৃথিবীর দিন আর রাত্রির মতোন। নিজের কক্ষপথে ফেরার তাগাদাও পাই অন্ধ ঈশ্ব্বরের ন্যায়! মনের গহিন কোণে চলে ভাঙচুর, তৈরি হয় দ্বান্দ্বিক মুহূর্ত। হূদয়ের রক্তে তাই রঙিন করে দিতে মন চায় একেকটি অক্ষর! চিত্রকল্পের তরুণ রাজহাঁস! কবিতা এক গোলকধাঁধা। অনেক বাঁশিগলি ঘুরিয়ে—মাড়িয়ে তারপর সে আসে সুরের মঞ্জরী হয়ে ঝরে পড়তে। দীর্ঘক্ষণ থাকে তার রেশ। আর কান্তিময় এক দেবশিশুর আত্মাকে নিজের ভেতর প্রতিস্থাপন করি। বোদলেয়ারের সেই মেঘদলের সঙ্গে যদি দেখা হয়ে যায়! তাই দীর্ঘ এক প্রবাহের আঘাত-অভিঘাত আমাকে নিয়ে যায় ঘটনার চূড়ান্ত কেন্দ্রবিন্দুতে। আমার চেতন আর অবচেতনের ভেতর চিন্তার যে ডিনামাইট, তা-ই আমাকে লিখতে বাধ্য করে চলে—সকাল কি দুপুর, ভোর কি গভীর রাত। রাতের রানওয়েতে আগুনের ফুলকির মতো আশ্চর্য সুন্দর হেলিকপ্টারগুলোকে আমার বিচিত্র এক-একটি পাখি বলে ভ্রম হয়। কিংবা ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার পূর্বাভাস আমি আগে থেকে না পেলেও, ঘটনার পর মনে হয়—আরে, এ তো আমি ভিজ্যুয়ালি দেখেছিলাম! এই ধরতে না পারা বোধকেই ধরতে চাই আমি! সমস্ত ইন্দ্রিয়ের পেতে চাই চূড়ান্ত সাক্ষাত্। অতঃপর ফুটবে জানি কথা—কাঁটা ও গোলাপে। তালাশ তালুকদার জন্ম :৮ নভেম্বর ১৯৮৩ খড়ের কাঠামো তালাশ তালুকদার কুড়েঘর প্রকাশনী কবিতা সংজ্ঞায়িত করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমার কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান; তেমনি দূরত্ব তত্ত্ব, ইশতেহার থেকেও। ওসব যেনবা একেকটা ঘোলাটে আয়না, যার সামনে দাঁড়ালে আত্মাকে অস্পষ্টরূপে দেখা যায়। যা দেখে লোকে বলতে পারে, ওই যে অমুকের মতো ছেলেটা, নাক এর মতো, চোখ ওর মতো, ভ্রূযুগল ঠিক ঠিক ওর মতো! পা দুটি, ঠোঁট দুটি এই রকম মেলাতে মেলাতে প্রকৃতপক্ষে তার পরিচয়টাই বিমূর্ত করে ফেলি। তখন বোঝা যায়, বস্তু-পরিচয় নির্ণয়ে ‘বিমূর্ত’ শব্দটির ভূমিকা হ্রাস পেতে চলেছে। আর আমার দেখার যন্ত্রটি কেবলই বস্তুবাদের শিরা-উপশিরার ওপর আলো ফেলে। কেননা, আপনি যে আলোটুকু ফেলছেন, সেটা কোনো বস্তুর ওপর না পড়ে যদি অবস্তুগত কোনো শূন্যতায় পড়ে, তবে নিশ্চিত সে আলো অতল গহ্বরে মিইয়ে যাবে। আমি মানি, শরীরের উপস্থিতি খুব জরুরি, সঙ্গে তার গন্ধটাও। বন্যার মতো হু হু করে জল এলেও পাত্রতে ঠিক পরিষ্কার জলটিকেই জায়গা দেওয়ার চেষ্টা করি। কাজী বর্ণাঢ্য জন্ম :৩ জানুয়ারি ১৯৮৪ আমার ছাদের নিচে তোমার আকাশ কাজী বর্ণাঢ্য প্লাটফর্ম মানুষের মধ্যে কবিত্বে ঘোর থাকলেও কবি তাঁর কর্মছাপে, চিন্তা-ভাবনার প্রয়োগ ও প্রকাশে দলচ্যুত, স্বতন্ত্র। কেবল গ্রহণযোগ্য কাব্যভাষা নয়, কবিতা কবির আদর্শ চর্চা যা মানব জীবনাচরণে পেরেকবিদ্ধ হয়ে একঘেয়ে দৃশ্যে কাব্যময়তা আনে। কবিকে যদি প্রকৌশলী ভাবি, আর কবিতা যদি হয় একটি বাড়ি তাহলে কবিকে আলাদাভাবে বোঝা অনেক সহজ। বাংলা কবিতার চর্যাট্রেনে চড়ে আজকের প্ল্যাটফর্মে এলে যা দাঁড়ায়; একটা শূন্যতাকে পূরণ করে প্রকৌশলী যেমন নানা উপাদানে বাড়ি তৈরি করেন, কবিতাও তা-ই। জীবনের পাঠ ও অভিজ্ঞতা ছেঁকে যে উন্মাদনা প্রকাশের ভাব অস্থির করে তোল তা-ই ভাবনা। ভাবনাকে শব্দ দিয়ে উপমা, উেপ্রক্ষা, ছন্দ, মতাদর্শ রসকলা দিয়ে যে ব্যঞ্জনা তৈরি করে, তা কবিতার শরীর। কবিতার প্রাণ হলো সময়। সময় কবিকে ভিন্ন করে তোলে, অগ্রসর করে তোলে। সাইয়েদ জামিল জন্ম :১৫ মে ১৯৮৬ রাষ্ট্রবিরোধী গিটার সাইয়েদ জামিল গদ্যপদ্য আমার বিশ্বাস, কবির কোনো ব্যক্তিগত জীবন হয় না। ফলে, আমার কোনো ব্যক্তিগত জীবন নেই। যা আমার তা আসলে সবার। আমি অকপটে আমার জীবনের কথা, আমার অনুভূতি ও দর্শনের কথা বলে যেতে পারি। ‘রাষ্ট্রবিরোধী গিটার’ আমার প্রথম বই। আমার এক-একটা লেখা আসলে আমার জীবনের এক-একটা ছেঁড়া পৃষ্ঠা। আমি এর ইংরেজি নাম রেখেছি The Distune Obstinate—এর অর্থ বিশ্রী সুরের ঘাড়ত্যাড়া। বাংলাটা আসলে ইংরেজির মতো মজবুত হলো না। আমি জানি আমার গলায় সুর নেই। আমি অসুর বংশের প্রতিনিধি। তাই বলে কোরাসে গলা মিলিয়ে আমি আমার নিজস্বতাকে হত্যা করতে পারি না। ফলে যে গান আমি ছাড়া আর কেউ গাইতে পারে না। সন্ধ্যার সিঁড়িতে বসে এখন আপনাকে বাজাতে হবে এই গিটার। গ্যাব্রিয়েল সুমন জন্ম :২৪ মার্চ ১৯৮৪ হাওয়াকাঠের ঘোড়া গ্যাব্রিয়েল সুমন ঐতিহ্য প্রকাশনী ঘোরগ্রস্ততা ঠিক কোন গোত্রের পাখি, আমার জানা নাই। পাখি না হয়ে হতে পারে কোনো উড়ালবর্তী মেঘ—যার জন্য কোথাও কোনো রাজ্য নির্ধারিত নেই। কিংবা হতে পারে, নির্ধারিত সীমানার বাইরে সে কাউকে চেনে না; কিছুকেই চেনে না। অনির্ধারিত সেইসব মেঘ ও পাখিরা আমার বন্ধু হয়ে গেল। ‘তিন দু-গুনে ছয়’-এর বাইরে এসব মেঘ ও পাখিদেরকে দেখি—অনির্ধারিত নির্লিপ্ততায়। সম্ভবত তখন বৃষ্টি হচ্ছিল কিংবা হচ্ছিল না। বৃষ্টি হলে কাগজের নৌকার মৃত্যু-সম্ভাবনা এগিয়ে আসে। এসব সম্ভাবনাও জমিয়ে রাখি মনঘরে—ব্যক্তিগত ডাকবাক্সের গোপন তাকে। এ শুধু অনুভূতির লেখ্য রূপমাত্র। সে বা তারা—নিজে ভেজে না; অন্যকে ভিজতে সাহায্য করে কি না, আমি জানি না। বৃষ্টি হলে আমার ব্যক্তিগত জলজ আধারগুলি হয়ে যায় পাখিসমাবেশ। অচিন্ত্য চয়ন জন্ম :৬ আগস্ট ১৯৮৬ ঘুম খুনের ডাকঘর অচিন্ত্য চয়ন গদ্যপদ্য প্রকাশনী দূরে কোনো স্বপ্নের মূর্তি দেখা! কবিতা তার প্রতিফলন। ভাবনার শরীর থেকে প্রতিফলনের নেশায় বুদ হয়ে, যুগল বৃক্ষ ঘুমের বদলে ছায়া দেয়। কবিতারা সাঁতার কাটতে কাটতে প্রেমিকা হয়ে যায়। আর প্রেমিকার নামে সহনশীল বেদনার কথা, বোধের কথা, ইতিহাসের কথা, সকল ধোঁয়াশার ছায়া একজন কবিকে দহন করে। আর এই দহনের আকাশে মেঘ, পরে বৃষ্টি—অবশেষে কবিতা। কবিতার প্রসববেদনা পেতেই কবিতার পেছনে ছুটা। কবিতা খুঁজি অদৃশ্য দৃষ্টির ছায়ায়। পাগলামির চূড়ান্ত পর্যায়ে মেঘ বৃষ্টি দেয়, বৃষ্টির পাঁজর থেকে কুঁড়িয়ে নিই কবিতার শরীর। কবিতা! মাঝে মাঝে প্রথম রমণীর স্পর্শ মনে হয়। আবার বেদনাও—কবিতা রূপবতী, তবে বহুরূপী। বহুরূপী সমগ্রই ‘ঘুম খুনের ডাকঘর’। অরবিন্দ চক্রবর্তী জন্ম :১১ আগস্ট ১৯৮৬ ছায়া কর্মশালা অরবিন্দ চক্রবর্তী কবি প্রকাশনী ‘ছায়া কর্মশালা’ আমার প্রথম কবিতার বই। কেন ছায়া কর্মশালা? এ প্রসঙ্গে বলব, নিশ্চয়ই আলোকরশ্মিও আমার হাসি-তামাশা-ক্রোধ-কান্নার সঙ্গে গোয়েন্দা কর্মকর্তা হয়ে চাকরিরত। সে বেডরুম থেকে শুরু করে পায়ে পায়ে সর্বব্যাপী প্রত্যক্ষদর্শী এবং আমরা জনৈক ছায়াকে কেন্দ্র করেই দেয়ালে আদর ঘষে দিই আর ঘরভর্তি জ্বলে ওঠে চাঁদ। এই যে নিজের সঙ্গে নিজের খুনসুঁটি এবং স্বপ্ন নামক এক আত্মঘাতীর পিছু পিছু ছুটে চলা কুস্তি কুস্তি খেলা—এ হচ্ছে আমার দৈনিক অনুশীলন, ব্যায়াম অথবা কর্মশালা। এ নিয়েই আমার কবিতা। কৃতজ্ঞতা তার প্রতি যে আমাকে কবিতা লেখাতে বাধ্য করেছে, সেই অথই সমুদ্রকে বলি—যেতে পারি না ছায়া, পাঠালাম; প্রসন্ন হও শ্রীমতি। এ শহরে রাত্রি নেমে আসে রমণীদের হাতে! এ শহরে রাত্রি নেমে আসে রমণীদের হাতে কড়ি ভরানোর স্বপ্ন নিয়ে ঠোঁটে বাহারী প্রসাধনী বলে যায় নেশার কথা বলার ছায়াগুলো দৃশ্যায়িত করে তাদের চরিত্র বাঁধা থাকে বিকেল সূর্যের হাতে হাত বুকে বুক নিম্নাঙ্গের নিশ্বাস বিনিময় হয় দৃষ্টির ভাষা থেকে রাতের ছায়াগুলো প্রবাসী হয় নানা পুরুষের দেশে থাকার জন্য শহর কিনেছে শরীরের আলোপ্রস্থানে জীবননগরে বাজে শিশিরবাদ্য শশ্মানে রেখে বাড়ি ফেরে স্মৃতির শহর নিয়ে যাওয়া দূষিত বাতাস তীর ছোড়ে আত্মার বুকে অনেক স্বপ্ন নিয়ে চাঁদের বাজার থেকে কেনা যৌবনপত্র ভেঙে পড়ে শহরের গলিতে! হুইল চেয়ারে বসা মেঘগুলো কেঁদে ওঠে ঘুমের তালে হুইল চেয়ারে বসা মেঘগুলো কেঁদে ওঠে ঘুমের তালে—বৃষ্টি দিতে পারে না তার পঙ্গুত্বর ভারে—বয়সী মেঘ বসে বসে পাঠ করে পুরোনো বৃষ্টির যৌবন—রাতের গভীরে মেঘেরা সঙ্গম করে তারার সাথে... হঠাত্ কেন বৃষ্টি হয়—মেঘের চরিত্র পাঠ করে বোঝা যায় গোপন সূত্রের কাহিনি, মেঘ-তারা শুয়ে থাকে অন্ধকারে—গোসলের সময় দুজনের শরীরে বেজে ওঠে ঘণ্ট—অন্ধকারে কৃষক পুজোয় মেতে ওঠে গোসলের নামে— বরফসম্প্রদায় আমার একটি নাম দিন হিস্ট্রি মহাশয়, বরফসম্প্রদায় থেকে এসেছি বলে কি আমাকে ডাকা হবে না অতল? দারুণ ইঁচিকদানা-সকাল দৈনিক পাতায় সুসমাচার ছাপা হলেও আপনি আমাকে তুমি বলে আর তুই আমাকে সরলরেখা ডাকে। ভ্রুকুটি টের পেলেও হজমস্বার্থে তাকে দিই রঙসমৃদ্ধ ঘুমের প্রেসক্রিপশন। গাছের ডালেই বেকুব দোলে হাওয়া হাওয়া আদর। আমি বলি চিকিত্সা, কেউ কয় ব্যান্ডেজ। অথচ সিলমোহর নিয়ে ঘোরে আমার যত মায়াখুনি রোদ। তবে যদি ছায়ার অ্যাকুরিয়ামে ডুবিয়ে দিই শীতঝালাই চাকু—মাছ-চরিত্র যাদের, অ্যামিবা ঝাঁকে যান। আমি বাপু বানরপুত্র—সমুদ্র তলদেশে গড়ি আগুন-ইন্ডাস্ট্রি। ছায়া কর্মশালা আমার ছায়ার সঙ্গে মার্শাল কর্মশালা যাদের—প্রত্যেককে পা-তালুমুখর কুংফু থাপ্পড়। সূর্যসিটে ভিআইপি যারা সাকুরায় মদগাছ আঁক সকলকে স্বপ্ন-চিবানো থুতু। আর খুব করে ইমামতিতে মত্তদের রইল জিন্দা-মুর্দার দোয়া-দরুদ। আমাদের পায়ে পায়ে উড়ে যাওয়া আগামীকাল মানেই রেসলারের উড়ালচুমুতে রক্তাক্ত পরশুকাল। বলা ভালো, আমি জনপ্রিয় গোয়েন্দা জ্যোতিষ, চলছি করতল রোদের পর্ণমোচী রেখায়, সার্কাসদড়িতে নদী রেখে রেখে। হাতি বিষয়ক কর্মশালা আমার যে বন্ধু তার গার্লফ্রেন্ডকে হাতির বাচ্চা গিফট করতে চেয়েছিল সে এখন কুর্মিটোলায় ভেড়া চরায়। তার সৌভাগ্য এই, আমি তাকে ভেড়ার মাহুত বলে ডাকি। আর, দি লায়ন সার্কাসে আমি যে হাতিটিকে ফুটবল খেলতে দেখেছিলাম সে কিন্তু কালোমানিকের নাম কখনও শোনেনি। ম্যারাদোনা সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা ছিল না। তাকে কেবল কলাগাছ-বিষয়ক ধারণার ভেতর ডুবে থাকতেই দেখা যেত। এ কথা সত্য, মরে যাওয়া হাতি আমি কখনও দেখিনি। অথচ বরই গাছের নিচ দিয়ে যেতে হাতিও ভূতের ভয় পায়। আমি, এলিফ্যান্ট রোডে ইতোপূর্বে বাঘের দুধের চা খেয়েছি। এবার গেলে হাতির দুধের চা খাব নিশ্চই। হেমন্ত ধারণা মাত্র মহাকাশে, কাল যে যুবকটি আত্মহত্যা করলো, সে আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের ভোকাল। ওই তো, তাঁরই বন্ধু, অন্ধ গিটারিস্ট, চিকিত্সার অযোগ্য উন্মাদ, এখন বসেছে এসে সন্ধ্যার সিঁড়িতে। বলি তাঁকে, জ্যামিং হবে না আর। হেমন্ত ধারণা মাত্র। তথাপি, প্রতিদিন ভোরবেলা, মগজে ভেতর, বেহালা বাজায় এক নিঃসঙ্গ মহিলা। আর, বাবলা ফুলের মতো মঞ্জুরিত হলুদ আত্মা তাঁর কিছুটা কুয়াশা কাতর। পাখি ও পোস্টঅফিস আমি একটি ব্ল্যাকবোর্ডকে সাদা চকের লোভ দেখিয়ে ভুলে গেছি আমার ডাস্টারজীবন। সুন্দরবনে জারুল গাছে বসন্তবৌরি এসে হাওয়ায় মেলায় গলা। কাদা, দাগ, ময়লার মতো কত কিছু মুছে দিতে জানতে হয়, কত কিছু মুছে যায় জলে—বাতাসে—আগুনে। রোদের মতো একটি জঘন্য কাগজ হাতে আমি কেন খুঁজে চলেছি পাখি ও নদীদের যৌথ পেন্সিল স্কেচ! আর কবে হাওয়াকল এসে দাঁড়াবে আমাদের ঘুমশালায়? ঘুমমুদ্রাগুলি কবুতরের কার্নিশে ফেলে রাখা আমার বায়বীয় ঘুমমুদ্রাগুলি ক্রমশই ঘাসচড়ুইয়ের দখলে চলে যাচ্ছে। দেয়ালঘoরি বুকের ভেতর এক বসন্তকালীন লেবুবাগান। ঘুমপাখিরা জেঁকে বসেছে সেই ঘ্রাণবতী জলের শহর। প্রাচীন লৌহনগরী আর পাহাড়ের পাদদেশে একলা পড়ে আছে ভূমিকম্প পরিমাপক যন্ত্র—যার গায়ে নগ্ন দেবীদের প্রতিলিপি; অঘোষিত নাচমুদ্রা। পেতলের দেবীদের ঋতুমতী হবার প্রসঙ্গে আমার কিছু জানার নেই। এসব রাতে তবু সাদা অক্ষরে লেখা কামুক রাত্রির ভাষা; ইরেজার দিয়ে মুছে ফেলবার পর—ব্যক্তিগত ঘুমকে কালো কাগজের টুকরোর মতো ছিঁড়ে ফেলা ভালো। সময় এইতো এইভাবে আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আগামীকাল আবারও আসছি বলে আরেকটি দিন তার হাঁটুর কাপড় জড়াতে জড়াতে চলে গেল। রোজ এভাবেই যায় যায় বুকের ভেতর রবিশস্য নেড়ে আর আমার নক্ষত্রগুলো টিনের চালে বৃষ্টির মতো ঝমঝম করে মুখ থুবড়ে পড়ে। যে পড়তে জানে ফিশারিজ থেকে টুপ করে নৌকোর গলুইয়ে সে উঠে পড়ে এবং দেখে মাটির জাহাজ সেও জল ফেঁড়ে যেতে যেতে শূন্য হয়ে আসছে। নীলকুঠি আমাদের সংসার জোড়াতালি দেয়া। যেনবা মিনিবাসের ফাটা লুকিং গ্লাস এখানে-ওখানে স্কচটেপ লাগিয়ে লাইফ সাপোর্ট নিয়ে বেঁচেবর্তে আছে কোনোমতো অথবা পুডিং মারা টিনের চাল, ক্রমাগত ঝড়, রৌদ্রতাপ সইতে পাঁজর মেলে বসে থাকে। কিংবা নীলচাষের মতো আমাদেরও সংসার বিভিন্ন এনজিও সমিতির লোকেদের চা জ্বাল করে খাওয়াতে আমাদের হাড়হাড্ডিগুলোই চারকোল বনে গেছে। ঘর পৃথিবীর ভাঁজে ভাঁজে প্রণয়ের রক্ত যে রক্ত পান করে পাখি ভুলে যায় ঘরবুনন রক্ত :এক ফোটা ভৌগোলিক প্রতিবিম্ব ভ্রুণ ছড়িয়ে গজে উঠুক প্রণয়শস্য পৃথিবীকে একটা দুচালা ঘর বানিয়ে আমিও ঘুমাবো। এক আকাশ ধোঁয়া মাথায় আগুন ধরে গেছে অর্থহীন পুড়ে পুড়ে পৃথিবী তিন ভাগে কাত্ এক আকাশ ধোঁয়া সর্বস্তর বিচরণ করে দেখেছি— কোথাও কোনো নদীমাতৃক আচরণ নেই। রংধনুজ্যামিতি মানুষের ছায়া পড়ে, ছায়ারও ছায়া পড়ে গোপনে... পাখির বুকে মেঘদেশের গোপন সূর্যাস্ত! ছায়ার ভেতর হাত গলিয়ে মানুষের হূিপণ্ডটা খুঁজি মানুষ নিজেই যখন ছায়া হয়ে যায়—ছায়ার ছায়াও যায় গুটিয়ে! আমার হাতে ছিল সাজানো, ঘর কেবল উড়ে উড়ে, কেঁপে কেঁপে দূরে সরে গেছে মালিপাখি বিউটিশিয়ান, তার ঠোঁটে অলঙ্করণ হতো মুখ একদা... গন্তব্যের অনুবাদ মাঝে মাঝে গন্তব্যের অনুবাদই সবচেয়ে কঠিন হয়ে পড়ে... কোথায় অপেক্ষার সেই বিশাল মনোভূমি? এক পা দু-পা করে কয়েক কিলোমিটারের নাম হাঁটা—এর বেশি হলেই ভ্রমণ... যেটুক আমি এর বেশি হলেই অজস্র শুক্রাণুর হত্যা! আর উন্মাদ—অস্থির শহরে আত্মহত্যার পর বিকলাঙ্গপ্রবণতা এর ভেতর কী করে একটি দ্রুতশ্বাসকে আমি চূড়ান্ত গোলপোস্টে পাঠাতে পারি? তুমি কি পৌঁছাতে পারবে কখনো বটফলের মতো হূদয়ে? দূরত্ব কি নৈকট্যের দুরারোগ্য ব্যাধি? না কি জলপাই বালিকার রহস্যময় হাসি... প্রতিবিহার অগ্নি-ফলা, উল্কার স্মৃতি ঠিকরে ফোটে জীবন। বীক্ষায় কালো হয় চোখ, বিভা ঢলমান। সমুদ্র, যৌবন তার, এই নোনা নীড় প্রতিবিহারের। ফোটে সিন্ধুর কেলাস। হীরা আমার শ্রুতির পিঠে ঘণ্টাধ্বনির ওপর এক ছাদ সেখানে আজ রাতে তারাশিশুদের সাথে কথা বলে একগুচ্ছ বোগেনভিলিয়া।