উন্নয়ন প্রকল্পে হাকালুকিকে বাদ দেয়া উচিত নয়

হাওরের জন্মলগ্ন থেকে আমার পূর্ব প্রজন্ম হাওর পারে বসবাস করছেন, তারও আগে থেকেই একই স্থানের বাসিন্দা হিসেবে আমরা আছি। আমার নাড়ী-অস্তিত্বের শেকড় প্রোথিত এই হাওরের এঁটেল-পলি-বালি মাটিতে। হাওর নিয়ে ভাবি, কখনো লিখি সর্বোপরি হাওর উন্নয়ন কর্মী হিসেবে নিজেকে যুক্ত রাখতে পারলে ধন্য হই। একজন হাওর সন্তান হিসেবে বুঝি অপরাপর হাওর সন্তানদের দুঃখ-বেদনা — কী যাতনা থাকতে পারে। তাদের অসুবিধা, সমস্যা, নানামুখি চাওয়া-পাওয়া, হিসাব-নিকাশের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা আছে। নেতিবাচক ধারণাও কম নেই। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে হাওর বিষয়ক আমার একটি উপস্থাপনা ছিল, দেখেছি শিক্ষিত উচ্চ পর্যায়ের লোকগুলো হাওর সম্পর্কে কেমনতর ভোঁতা ধারণা পোষণ করেন। স্বাধীনতার আগে থেকেই হাওর উন্নয়নের জন্য নানা স্থানে ব্যক্তি ও সমষ্টি পর্যায়ে চিন্তা-ভাবনা চলে আসছে। স্বাধীনতা উত্তরকালে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হাওর উন্নয়নের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যদিও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বর্তমান সরকার হাওর উন্নয়নের জন্য ২০ বছরব্যাপী বাস্তবায়নযোগ্য (২০১৩-২০৩২ সন) প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। গত ৩০ এপ্রিল ২০১২ তারিখে একনেকের সভায় বর্ণিত অর্থ মঞ্জুর করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই হাওরাঞ্চলের বাসিন্দা উন্নয়নের জন্য অর্থের সমবণ্টন প্রত্যাশা করেন, প্রয়োজনানুরূপ অর্থপ্রাপ্তি সবারই কাম্য। এ পরিকল্পনায় সিলেট, প্রধানত মৌলভীবাজার জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ অঞ্চলে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত মাছ-পাখির অভয়াশ্রম বাইক্কা বিল, যা হাইল হাওরে অবস্থিত। হাওরটি হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের ২+২=৪টি উপজেলায় অবস্থিত। মৌলভীবাজারের কাওয়াদীঘি ও করাইয়া বিখ্যাত হাওর। বৃহত্তম হাওর হাকালুকি প্রধানত মৌলভীবাজার এবং সিলেট জেলার ৪+৪=৮টি উপজেলায় বিস্তৃত। ঐ এলাকার বাসিন্দাগণ নিজেদের অঞ্চলকে হাওর উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য নানা ব্যানারে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছেন। হাওর রক্ষা সংগ্রাম কমিটি, বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন গ্রুপ, হাওর বাঁচাও কৃষি বাঁচাও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ ছাড়াও রাজনৈতিক দল/প্লাটফরম সিপিবি, গণতন্ত্রী পার্টি, বাসদ কৃষকপার্টি,ক্ষেতমজুর সমিতি এ বিষয়ে একাত্ম হয়েছে। তাদের অধিকার রয়েছে দাবি আদায়ের পথ তৈরি করে নেওয়ার। সরকারের উচিত স্পষ্ট করে বলা কী কারণে ঐ জেলার হাওরাঞ্চলকে বর্তমান প্রকল্প থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। যত যুক্তিই দেখানো হোক না কেন বৃহত্ হাওরাঞ্চলকে পাশ কাটিয়ে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। খোঁজ-খবর নিয়ে জেনেছি, সারা দুনিয়ায় এর চেয়ে বড় হাওর নেই। সেই হাকালুকিকে বাদ দেয়া সমীচিন মনে করি না। মৌলভীবাজার জেলার জনগণের উত্থাপিত দাবির প্রতি একাত্মতা জানাই, সেইসঙ্গে সরকারের নীতি নির্ধারক হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বিনীত আরজ— হাকালুকিসহ মৌলভীবাজারের হাওর বিলগুলোকে প্রকল্পভুক্ত করার ব্যবস্থা নিন। যেন কোনো অবস্থাতেই আঞ্চলিক বৈষম্যের চিত্র ফুটে না ওঠে। নেত্রকোণা