আহত শতাধিক, আজ সকাল থেকে জেলায় জামায়াতের ৪৮ ঘন্টার হরতাল

কক্সবাজারে জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষ, গুলিতে নিহত ৪

কক্সবাজার শহরে পুলিশ ও র্যাবের সঙ্গে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সংঘর্ষে গতকাল শুক্রবার ৪ জন গুলিতে নিহত হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এদের মধ্যে একজন ছাত্রদল কর্মী, একজন শিবির কর্মী ও একজন দোকান কর্মচারী বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। নিহত পথচারীর বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি। তবে জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে সংঘর্ষে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সংঘর্ষে শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছে। এদের মধ্যে রাবার বুলেট ও ছররা গুলিতে আহত ৪৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষের আগে পুলিশ শহরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১৩০ জনকে আটক করেছে। ঘটনাস্থলে বিজিবি মোতায়েন করে অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। ঘটনার প্রতিবাদে আজ শনিবার সকাল থেকে কক্সবাজার জেলায় ৪৮ ঘন্টা হরতাল ডেকেছে জামায়াত। এর বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, নোয়াখালী, যশোর ও মৌলভীবাজারে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্তত ৩৮ জন আহত হয়েছে। আমাদের কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে আটক জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে ‘আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী মুক্তি পরিষদ’-এর ব্যানারে গতকাল জুমার নামাজের পর স্থানীয় হাশেমিয়া মাদ্রাসা মসজিদ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করার কর্মসূচি ছিল। খবর পেয়ে র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা আগে থেকেই ওই মসজিদ এলাকা ঘিরে রাখে। নামাজের পর যথারীতি জামায়াত-শিবির কর্মীরা মিছিল বের করতে চাইলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাধা দেয়। শেষ পর্যন্ত এ মিছিল ঠেকানো গেলেও বাস টার্মিনাল থেকে জামায়াত-শিবির কর্মীদের অন্য একটি মিছিল প্রায় এক মাইল পথ অতিক্রম করে হাশেমিয়া মাদ্রাসা গেটে এবং উত্তর রুমালিয়ারছড়া থেকে আরেকটি মিছিল একই স্থানে এলে র্যাব-পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেধে যায়। পুলিশ মিছিল লক্ষ্য করে প্রথমে কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। এ সময় জামায়াত-শিবির কর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুঁড়তে শুরু করলে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা গুলিবর্ষণ করে। এতে ঘটনাস্থলে তিনজন এবং হাসপাতালে নেয়ার পথে আরেকজন মারা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রাবার বুলেট ও ছররা গুলি ছোঁড়ে। সংঘর্ষে শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। এর মধ্যে ছররা ও রাবার বুলেটে আহত ৪৭ জনকে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতদের পরিচয়:নিহতদের মধ্যে তিন জনের লাশ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। তারা হলেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার হামিদ আলীর ছেলে আহমদ ছালেহ (৫০), শহরের দক্ষিণ রুমালিয়ারছড়ার করিমউল্লাহর ছেলে তোফায়েল আহমদ (২২) ও পথচারী নূরুল হক (৪৫)। আহমদ ছালেহ শহরের একটি দোকানে কাজ করতেন। তোফায়েল ছাত্রদল কর্মী বলে দাবি করেছেন জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক নেজাম উদ্দিন। এদিকে জামায়াত-শিবির নেতারাও তোফায়েলকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেন। তবে তোফায়েল দিনমজুর বলে দাবি করেছেন তার স্ত্রী কোহিনূর সুলতানা। নিহত অপরজন হলেন কক্সবাজার সদরের পিএমখালী ইউনিয়নের মো. ফারুক (২২)। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল জিএম রহিমুল্লাহ দাবি করেছেন ফারুক তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরের কর্মী। এছাড়া দোকান কর্মচারী আহমদ ছালেহকেও নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছেন জেলা জামায়াতের একাধিক নেতা। রাবার বুলেট ও ছররায় আহত চিকিত্সাধীনদের মধ্যে যাদের পরিচয় জানা গেছে তারা হলেন-চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার আবুল হাশেম (৫০), কক্সবাজার সদরের পিএমখালীর বজল করিম (৪০), মোস্তাফিজুর রহমান (৩৮), শহরের দক্ষিণ রুমালিয়ারছড়ার ফুলমত খাতুন (৫৫), কক্সবাজার সরকারি কলেজের ছাত্র আমির হোসেন (১৭), চকরিয়ার রিয়াজউদ্দিন (৩৫), খুরুস্কুলের মোহাম্মদ হোসাইন (৬০), সাইফুল ইসলাম (২৪), রঙ মিস্ত্রী আবদুস শুক্কুর (২০), স্কুল শিক্ষক নূরুল আলম (৩২), রংপুরের দিনমজুর সাইদুল ইসলাম (৪০)। এর বাইরেও আহত বেশ কয়েকজন শিবির কর্মী শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গোপনে চিকিত্সা নিচ্ছে বলে জানা যায়। ঘটনাস্থলে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যও শিবিরের ইটপাটকেলে আহত হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেলেও পুলিশের পক্ষ থেকে আহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। কক্সবাজার ফুয়াদ আল খতিব হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শাহ আলম জানান, বিকাল ৩টা পর্যন্ত তাদের হাসপাতালে দুজনের লাশ আনা হয়েছে। এছাড়াও অন্তত ৩০ জন আহতকে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। এদিকে ফুয়াদ আল খতীব হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, হাসপাতালে ৩ জনের লাশ রয়েছে। এদের মধ্যে একজন নারী। তবে ডা. শাহ আলম অবশ্য দুজনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছেন। লাশ দুটি বিকাল পৌনে চারটার দিকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার আজাদ মিয়া ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের জানান, পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুঁড়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, ঘটনার পর রুমালিয়ারছড়া এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বর্তমানে শহরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শহরের অধিকাংশ দোকানপাট ও অফিস-আদালত বন্ধ রয়েছে। আতংকে জনগণের চলাফেরা ও যানবাহন চলাচল একেবারে কমে গেছে। গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় পুলিশ বা অন্য কোনো পক্ষ থেকে মামলা দায়ের হয়নি। রাজশাহী অফিস জানায়, শুক্রবার জুমার পর নগরীর কাদিরগঞ্জ এলাকায় ‘উলামায়ে মাশায়েখ পরিষদে’র ব্যানারে জামায়াত-শিবিরের একটি মিছিল থেকে পুলিশের উপর হামলা চালানো হয়েছে। এ সময় পুলিশ পাল্টা প্রতিরোধ করলে সংঘর্ষে পুলিশ ও পথচারীসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের প্রাথমিক চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালে জামায়াত-শিবির কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে তিনটি হাতবোমার (ককটেল) বিস্ফোরণ ঘটায়। সংঘর্ষের পর পুলিশ আটজনকে আটক করেছে। এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রা.বি) নারিকেল বাড়িয়া ক্যাম্পাসে গোপন বৈঠক থেকে শুক্রবার সকালে ৩ ছাত্রশিবির কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। আটক শিবির কর্মীদের থানা হেফাজতে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে পুলিশ তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি। চৌমুহনী সংবাদদাতা জানান, শুক্রবার জুমার নামাজের পর মসজিদ থেকে কয়েকশ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী বের হয়ে পুলিশের উপর হামলা করলে দুই পুলিশ আহত হয়। পরে পুলিশ জামায়াত-শিবির কর্মীদের বাধা দিলে পুলিশের চার কর্মকর্তাসহ ৮ জন এবং জামায়াত-শিবিরের ৭ জন আহত হয়। বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ায় জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব বেশি বাড়েনি। আমাদের চট্টগ্রাম অফিস জানায়, নগরীর চকবাজার এলাকায় শুক্রবার বিকালে জামায়াত কর্মীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে ৫ জন আহত হয়েছে। গতকাল কক্সবাজারে জামায়াত কর্মী হত্যার বিচার দাবি করে বিকালে নগরীর চকবাজার তেলিপট্টি এলাকায় জামায়াতের শ’খানেক কর্মী মিছিল বের করার চেষ্টা করে। পুলিশ মিছিলকারীদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ বেধে যায়। মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে একপর্যায়ে পুলিশ ২ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। পুলিশ নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে ঘটনাস্থল থেকে ২ জামায়াত কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। যশোর অফিস জানায়, বসুন্দিয়া এলাকায় জামায়াত-শিবিরের মিছিল থেকে হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। তারা হলেন বসুন্দিয়া পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মিজানুর ও এএসআই খালেদুর। শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে যশোর-খুলনা মহাসড়কের বসুন্দিয়া বাসস্ট্যান্ডে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ওই এলাকা থেকে এক শিবির কর্মীকে আটক করেছে। আটক মাহমুদুল হাসান (৩০) যশোর সদর উপজেলার পদ্মবিলা গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে। মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ বাজারে শুক্রবার বিকালে পুলিশের সাথে জামায়াত-শিবির কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ঘটে। এতে ৪ পুলিশ সদস্য এবং ২ পথচারীসহ ৬ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় একজনকে আটক করেছে পুলিশ। কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, গতকাল শুক্রবার কুমিল্লা মহানগরীতে জামায়াত-শিবিরের বিক্ষোভ মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৭ রাউন্ড রাবার বুলেটের গুলি ছুঁড়ে। এ সময় পুলিশ জামায়াত-শিবিরের ৮ নেতা-কর্মীকে আটক করেছে।