যেভাবে করবেন বিষমুক্ত গুড় উত্পাদন
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪২
বাজারে সোনালি, হালকা লাল, চকচকে, উজ্জ্বল সাদাটে গুড় দেখে সবাই আকৃষ্ট হয়। কিন্তু এই গুড়েই যে হাইড্রোজ নামক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ আছে তা আমরা অনেকেই জানি না। আখ, খেজুর, তাল ও গোলপাতার রসের গুড়ের রঙ হাইড্রোজ দিয়ে আকর্ষণীয় সোনালি করা হয়। হাইড্রোজ দেয়া গুড় স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। হাইড্রোজ ছাড়া স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সহজেই কম খরচে ঢেঁড়স, শিমুল, বনঢেঁড়স ও ঘৃতকুমারীর রস দিয়ে গুড় পরিষ্কার করা যায়। এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট।
দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য বার্ষিক প্রায় ২০ লাখ টন চিনি/গুড় প্রয়োজন। কিন্তু দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ লাখ টন গুড় ও ১ থেকে ১.৫ লাখ টন চিনি উত্পাদন হয়। দেশে উত্পাদিত আখের প্রায় ৫০ ভাগেরও অধিক গুড় উত্পাদনে ব্যবহূত হয়। খেজুর ও তালের রস থেকে প্রতি বছর প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ লাখ টন গুড় উত্পাদন হয়।
আখের জাত:দানাদার গুড় উত্পাদনের জন্য পরিপূর্ণ পরিপক্ব আখ প্রয়োজন। জাতগুলো হল- ঈশ্বরদী ১৬, ঈশ্বরদী ২৬, ঈশ্বরদী ৩০, ঈশ্বরদী ৩৩, ঈশ্বরদী ৩৮। প্রচলিত আখ মাড়াইকলের রস আহরণ ক্ষমতা ৪৫ থেকে ৫০ ভাগ। বাংলাদেশে ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত উন্নত আখ মাড়াইকলের রস আহরণ ক্ষমতা প্রায় ৬০ ভাগ।
হাইড্রোজের ক্ষতিকর প্রভাব:হাইড্রোজ খাদ্যে ব্যবহারের অনুমতি নেই। এটা পেপার মিল, বস্ত্রমিল এবং তৈরি বস্ত্রের রঙ করার জন্য ব্যবহূত হয়। অধিকাংশ এলাকার গুড় প্রস্তুতকারীরা ফুটন্ত রসে হাইড্রোজ ব্যবহার করে। ফলে হাইড্রোজের ক্ষতিকর
মাত্রা পুরোটাই যৌগ হিসেবে গুড়ে থেকে যায়। এতে মানবদেহে ক্যান্সার, আমাশয়, অন্ত্রের প্রদাহ সৃষ্টি করে। হাইড্রোজ দেয়া গুড়ের স্বাদ ও গন্ধ ভিন্ন, গুড় দানা হয় না, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না। এসব সমস্যা দূর করার জন্য ভেষজ নির্যাস ব্যবহার করা প্রয়োজন।
গুড় পরিশোধনে ভেষজ নির্যাস তৈরি ও প্রয়োগ: বিভিন্ন করণে গুড় পরিশোধন করা কঠিন। কারণগুলো হল- রোগ ও পোকা আক্রান্ত আখ, অপরিপক্ব বা অধিক পরিপক্ব আখ, রসে অধিকমাত্রায় গ্লুকোজ ও ফ্রুকটোজ, আখের জাত, রস জ্বাল দেয়ার ভুল পদ্ধতি ইত্যাদি। এসব কারণে উন্নতমানের দানাদার গুড় উত্পাদন সম্ভব হয় না। তাই রস পরিশোধনের জন্য
ঢেঁড়স গাছের কাণ্ড বা শিমুল গাছের শিকড় বা বন ঢেঁড়সের কাণ্ড বা ঘৃতকুমারীর রস ব্যবহার করা হয়। ৫০০ গ্রাম বন ঢেঁড়স গাছের কাণ্ডের সবুজ অংশ ছোট ছোট টুকরো করে কেটে ও থেঁতলিয়ে ২ থেকে ২.৫ লিটার পানির মধ্যে দু’হাতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ঘষলে ২ থেকে ৩ লিটার নির্যাস তৈরি হয়। ১৮৫ থেকে ২২৫ কেজি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন কড়াই বা প্যানের আখের রস পরিশোধন করার জন্য ২ থেকে ৩ লিটার বন ঢেঁড়সের নির্যাস লাগে। অর্থাত্ প্রতি কেজি রসে ১৫ থেকে ২৫ গ্রাম নির্যাস দিতে হয়। অথবা ঘৃতকুমারীর উপরের সবুজ খোসা ছুরি দিয়ে তুলে ভেতরের পিচ্ছিল নির্যাস বের করতে হয়। প্রতি কেজি আখের রসে ১০ থেকে ১৫ গ্রাম এই নির্যাস দিতে হয়। প্যান বা কড়াইয়ে আখের রস জ্বাল দিলে প্রচুর গাদ ওঠে। এই গাদ ছাকনা দিয়ে তুলতে হবে। এর পর বন ঢেঁড়সের রস অথবা ঘৃতকুমারীর রস কড়াইয়ে ফুটন্ত আখের রসে মিশিয়ে আশানুরূপ রস পরিশোধন করা যায়। এই ভেষজ নির্যাস মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর তো নয়ই বরং উপকারী। কারণ এই নির্যাসে প্রোটিনজাতীয় পদার্থ থাকে। গাছ থেকে বাকল আলাদা করে বলের মত গোল করে পেচিয়েও সরাসরি ফুটন্ত আখের রসে ব্যবহার করা যায়। রস ঘনীভূত হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত বাকল কড়াইয়ের উপ্তত্ত রসের মধ্যে কিছু সময় পরপর নাড়া দিতে হবে। এতে আখের রসে বিদ্যমান ময়লা নির্যাসের সাথে জমাট হয়ে দ্বিতীয়বার গাদে পরিণত হয়ে ভেসে উঠবে যা ছাকনা দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। রস ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রসের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় রস হাতল দিয়ে ঘন ঘন নাড়তে হবে এবং চুলার আগুন কমাতে হবে। কাঁচের গ্লাসের পরিষ্কার ঠাণ্ডা পানিতে গরম একটু রস ঢেলে দিলে যদি জমাট বাঁধে তাহলে বুঝতে হবে রসের জ্বাল সম্পন্ন হয়েছে। চুলা থেকে রসের কড়াই নামিয়ে একটু ঠাণ্ডা করে ছাঁচে বা পাত্রে ঢেলে দিলে রস জমাট বেঁধে দানাদার গুড় তৈরি হবে। এই গুড়ের রস উজ্জ্বল সোনালি হলুদ হয়। হাইড্রোজ দেয়া গুড়ে হাইড্রোজের গন্ধ থাকে এবং রঙ হালকা সাদাটে বা অনুজ্জ্বল সোনালি হয়।
স্বাস্থ্যসম্মত গুড় উত্পাদনের জন্য গুড় প্রস্তুতকারীদের কাছে ভেষজ নির্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। হাইড্রোজ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইন প্রয়োগ করতে হবে। খাদ্য ভেজাল বিরোধী অভিযানের মধ্যে গুড়ও অন্তর্ভুক্ত করা। বাজারের হাইড্রোজ মিশ্রিত গুড় বিক্রেতাদের জরিমানা করতে হবে।
লেখক: কৃষি প্রাবন্ধিক ও কলেজ শিক্ষক