কুষ্টিয়ার আবাদি জমি তামাকের দখলে!

কুষ্টিয়ার আবাদি জমির সিংহভাগই চলতি মৌসুমে তামাক চাষ হয়েছে। এ অঞ্চলে ব্যাপকহারে তামাক চাষ বেড়ে যাওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে বোরো ধানের আবাদ মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাছাড়া বিএডিসির সেচ স্কিমগুলোতে ব্যাপকহারে তামাক চাষ হচ্ছে। শুধুমাত্র দৌলতপুর উপজেলার প্রায় ৬৫ ভাগ জমিতে তামাকের আবাদ হচ্ছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রিফায়েতপুর, বিন্দিপাড়া, জয়ভোগা, বোয়ালিয়া, গোয়ালগ্রামসহ বিএডিসির প্রায় সবগুলো সেচ স্কিমের আওতাভুক্ত কৃষি জমিতে তামাকের চাষ ছাড়া অন্য কোনো ফসল দেখা যায়নি। বিগত বছরগুলোতে তামাক চাষে অধিক লাভবান হওয়ায় চাষিরা তামাক চাষে উত্সাহিত হচ্ছে। অন্য দিকে খাদ্যশস্য উত্পাদনের জমি অধিকহারে তামাক চাষে ব্যবহূত হওয়ায় এবার বোরোর উত্পাদন হবে ব্যাহত। তার ফলে কুষ্টিয়া খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল। দেশের অন্যতম তামাক উত্পাদনকারী অঞ্চলের মধ্যে কুষ্টিয়া অন্যতম। মাঠের পর মাঠ শুধু তামাকের চাষ হলেও এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই খোদ কৃষি অফিসে। তবে জেলা কৃষি সসপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুষ্টিয়া জেলায় সর্বমোট আবাদি জমির পরিমাণ ১ লক্ষ ১৫ হাজার ৯৭৮ হেক্টর। এর মধ্যে চলতি মৌসুমে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার ২৮৯ হেক্টর। ডাল জাতীয় ফসল ১৩ হাজার ৫৩৬ হেক্টর। তৈল জাতীয় ফসল ৫ হাজার ৭০৫ হেক্টর। সবজি ৬ হাজার ৭২০ হেক্টর। মসলা জাতীয় ১১ হাজার ২৬২ হেক্টর, আলু ২ হাজার ৬৪০ হেক্টর, মিষ্টি আলু ১১৫ হেক্টর, গম ১৫ হাজার ৬২৫ হেক্টর, ভুট্টা ৫ হাজার ১৯০ হেক্টর এবং ১৮ হাজার ৮৫০ হেক্টরে তামাক চাষ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও তামাক কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, তামাকের চাষ হয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার ২শ’ হেক্টর জমিতে। তামাক উত্পাদনকারী কোম্পানিগুলোর সাথে সম্পৃক্তদের সূত্রমতে, এ বছর কুষ্টিয়া অঞ্চলে আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানি প্রায় ৯ হাজার হেক্টর, ঢাকা টোব্যাকো ১৬ হাজার হেক্টর, জামিল টোব্যাকো ১২শ’ হেক্টর এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হচ্ছে। এছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে আরো ৯ হাজার হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হচ্ছে যা মোট আবাদি জমির প্রায় অর্ধেক। তাই এ বছর জেলার অর্ধেক জমিতে তামাক চাষের ফলে খাদ্যশস্য উত্পাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। সবচেয়ে বেশি তামাক চাষ হচ্ছে জেলার দৌলতপুর, মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলায়। অন্যদিকে কৃষকদের ভর্তুকির সার তামাক চাষে ব্যবহূত হচ্ছে বলে স্থানীয় কৃষকরা জানান। দৌলতপুর উপজেলায় ৩৩ হাজার হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হচ্ছে। রিফাইতপুর ইউনিয়নের হরিণগাছি গ্রামের কৃষক মজিবর রহমান জানান, বোরো আবাদ করলে সার, সেচ খরচই ওঠে না। তাই কয়েক বছর ধরে তিনি তামাক চাষ করছেন। এবার তিন বিঘা জমিতে তামাকের চাষ করছেন। প্রতি বিঘায় ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হবে এবং এক বিঘা জমির তামাক ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রয় হবে। একাধিক তামাক চাষি জানান, তামাক চাষে বীজ, সার, কীটনাশক ও পরিচর্যাসহ সকল ব্যয়ভার তামাক উত্পাদনকারী কোম্পানি বহন করার ফলে সাধারণ চাষিরা তামাক চাষে আসক্ত হয়ে পড়েছে। তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে পরিবেশ ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশ পরিবেশ ক্লাব কুষ্টিয়ার সভাপ্রধান গৌতম কুমার রায় বলেন, এমন একটা সময় আসবে যখন তামাক চাষের ফলে কুষ্টিয়ায় আর কোনো ফসল চাষ করা সম্ভব হবে না। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং খাদ্য জাতীয় ফসল উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এখনই তামাকের চাষ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। এ অঞ্চলে তামাক চাষ বৃদ্ধির ধারা যেভাবে ঊর্ধমুখী হচ্ছে, এর ফলে এ এলাকায় চরম খাদ্য সংকট দেখা দেবার পাশাপাশি পরিবেশের বিপর্যস্ত ঘটবে। লেখক: সাংবাদিক