রাজীবের জানাজায় লাখো মানুষের ঢল
বুকে শোক চোখে আগুন
আসিফুর রহমান সাগর, মুন্না রায়হান ও মাহবুব রনি
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৫
রাজীবের মৃত্যুর সীমাহীন শোক শক্তিতে পরিণত করলো শাহবাগ আন্দোলনের তরুণযোদ্ধারা। লাখো মানুষ রাজীবের লাশ ছুঁয়ে শপথ নিলেন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর না করে তারা ঘরে ফিরে যাবেন না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনালালিত তরুণ যোদ্ধারা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি নিয়ে বারো দিন আগে রাস্তায় নেমে আসে। গড়ে ওঠে শাহবাগ আন্দোলন। সেই শাহবাগ আন্দোলনকে ঘিরে রক্ত ঝরলো শুক্রবার রাতে।
তরুণ প্রজন্ম রাজীব হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকার ঘোষণা করে। এ জন্য প্রতিটি পাড়া মহল্লায় জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীর তালিকা তৈরির জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়। মঞ্চ থেকে বলা হয়, আমরা যদি সঠিক তালিকা তৈরি করতে পারি, তাহলে রাজীব হত্যার উপযুক্ত প্রতিশোধ নেয়া যাবে। গতকাল শনিবার বিকাল সাড়ে পাঁচটায় রাজীবের লাশ শাহবাগে প্রজন্ম চত্বরে পৌঁছালে সবার চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তার বন্ধুরা, অচেনা তরুণ সহযোদ্ধাদের কাছেও রাজীব হয়ে ওঠে প্রেরণার প্রতীক। কান্না, শোক একাকার হয়ে যায়। সবাই সেই শোককে প্রতিবাদের শক্তিতে পরিণত করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন করার শপথ নেন।
শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে রাজীবের নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় তার বাবা ডা.নাজিম উদ্দিন আন্দোলনরত তরুণদের উদ্দেশে বলেন, রাজীবের মৃত্যু হয়নি। রাজীব এই শাহবাগেই আছে। তরুণদের বলছি, যাদের জন্য রাজীবের প্রাণ গেলো- সেই যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এখন তোমাদের দায়িত্ব। আমার রাজীব সেই অর্জনের মধ্যে বেঁচে থাকবে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ব্লগার প্রকৌশলী রাজীব হায়দারের হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড় নিয়েছে আন্দোলনের। শাহবাগের আন্দোলন যে অমূলক কোন বিষয় ছিলো না- এ হত্যাকাণ্ড সেটাই প্রমাণ করলো। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে তরুণদের যে আন্দোলন- তার ভয়াবহতাকে সামনে নিয়ে এলো রাজীবের মৃত্যু। রাজীবের মৃত্যু জামায়াত-শিবিরের নৃশংসতাকে নতুন করে তুলে ধরলো দেশের মানুষের সামনে।
গণজাগরণ মঞ্চ থেকে আন্দোলনের নেতারা বলছেন, আমাদের শরীরে এক ফোঁটা রক্ত থাকতে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর না করে আমরা প্রজন্ম চত্বর ছেড়ে ঘরে ফিরে যাবো না। জামায়াত-শিবির মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ শহীদের রক্ত নিয়েছে। শুক্রবার রাতে আমাদেরই সহকর্মী রাজীবকে জবাই করেছে। কিন্তু তারা জানে না এ প্রজন্ম চত্বর থেকে হাজার হাজার রাজীব জন্ম নিয়েছে। মৌলবাদী শক্তি কতজনকে নিশ্চিহ্ন করবে!
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, আমাদের পথ সহজ হবে না তা আমরা জানতাম। তাই ব্লগার প্রকৌশলী আহম্মেদ রাজীব হায়দার শোভন হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার শপথ নিয়েছে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকারীরা। তারা আরো বলেন, শহীদ রাজীব ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত তরুণ প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি। তাকে হত্যা করে জামায়াত-শিবির তাদের স্বাধীনতাবিরোধী পুরনো খুনি রাজাকার চরিত্র নতুন করে উন্মোচন করেছে। এদের প্রতিরোধে সমাজের সর্বস্তরে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
জানাজায় সজীব ওয়াজেদ জয়
গতকাল রাজীবের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তার জানাজায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতি সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি এ সময় রাজীবের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা জানান। জয়ের সঙ্গে জালাযায় আরো অংশ নেন নসরুল হামিদ বিপু এমপি, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবহান গোলাপ ও মাহবুবুল হক শাকিল প্রমুখ।
এক কাতারে লাখো মানুষ
ব্লগার রাজীব তার কলমে ভর করে লড়াই করেছেন সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। সেই রাজীবের হত্যার জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করেছেন তার পরিবার এবং ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক। গতকাল বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে রাজীবের মরদেহ শাহবাগে আনা হয়। প্রজন্ম চত্বরের মূল কেন্দে তার মরদেহ রেখে বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে জানাজা নামাজ শুরু হয়। এ নামাজে অংশ নেয় লাখো মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে রূপসী বাংলা হোটেল, কাঁটাবন মোড় থেকে মত্স্য ভবন পর্যন্ত মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে রাজীবের জানাজা নামাজ আদায় করেন। নামাজের ইমামতি করেন ড. সৈয়দ এমদাদ উদ্দীন। জানাজার আগে এবং পরে উপস্থিত অনেকেই চোখে অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি। শোকে ও ক্ষোভে ফেটে পড়েন উপস্থিত জনতা। মুক্তিযোদ্ধারা পতাকা উড়িয়ে রাজীবের প্রতি সম্মান জানান। তার মরদেহে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ ীয় কমান্ড কাউন্সিল।
এদিকে গতকাল মিরপুরে রাজীবের বাড়ি সংলগ্ন স্থানীয় মসজিদে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আজ রবিবার কাপাসিয়ায় জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হবে।
‘রাজীবের শপথ, শোধ নিবোই’
প্রজন্ম চত্বরের সক্রিয় কর্মী ব্লগার রাজীবের মৃত্যুতে শোকাহত তরুণরা প্রতিশোধের শপথ গ্রহণ করেছেন। শোককে তারা শক্তিতে পরিণত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। রাজীব হত্যার বিচার এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা।
গতকাল বিকালে রাজীবের জানাজার পর ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার বলেন, রাজীবকে ছুঁয়ে শপথ করছি, রাজীব হায়দার হত্যার সুষ্ঠু বিচারের জন্য আমরা আজীবন লড়াই চালিয়ে যাবো।
তিনি বলেন, আমাদের সহযোদ্ধার লাশ আমাদের কাঁধে। আমরা তাকে হারিয়েছি। কিন্তু তিনি প্রেরণা হয়ে থাকবেন আমাদের সাথে। রাজীব এমন একজন যোদ্ধা ছিলেন, যাকে কোনোদিন ফোন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মসূচিতে আসতে বলতে হতো না। মেসেজ বা যেকোনোভাবে খবর পেলেই তিনি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতেন।
ইমরান বলেন, এ হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যেতে পারি না। জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি বাস্তবায়ন করে তবে ঘরে ফিরব। তাহলেই আমাদের এ সহযোদ্ধার আত্মা শান্তি পাবে।
ইমরানের বক্তব্যের সাথে হাত উঁচিয়ে এবং হ্যাঁ-সূচক রায় দিয়ে জনতা সমর্থন জানায়। এছাড়া গতকাল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আন্দোলনরত এবং আন্দোলনের সাথে সংহতি জানানো ব্যক্তিদের কণ্ঠে একই প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
একাত্মতা প্রকাশ অব্যাহত
গতকাল প্রজন্ম চত্বরে এসে রাজীবের প্রতি শ্রদ্ধা জানান নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, এ্যাটর্নী জেনারেল মাহবুবে আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ, ট্রেজারার ড. কামাল উদ্দিন, প্রক্টর ড. আমজাদ আলী, কবি অধ্যাপক আব্দুস সামাদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, আসাদুজ্জামান নূর, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনিসুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, সাবেক বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট আনোয়ার পারভেজ চৌধুরী প্রমুখ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ বলেন, তরুণ প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছে, তা অভূতপূর্ব। রামেন্দু মজুমদার বলেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে হবে। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর আন্দোলনের সাথে একাত্মতা জানিয়ে বলেন, রাজীব বুকের রক্ত দিয়ে আমাদের পথ দেখিয়ে গেছেন। আমাদের দাবি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সে পথ থেকে সরে যাওয়া যাবে না।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনিসুল হক বলেন, স্বাধীনতার পর গত ৪২ বছরে আমরা যা করতে পারিনি বর্তমান তরুণ প্রজন্ম তা করে দেখিয়েছে। রাজাকারদের কোন স্থান নেই এদেশে। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে।
চলমান আন্দোলনের সাথে বিজিএমইএ সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন একাত্মতা ঘোষণা করে বলেন, রাজাকারদের ফাঁসি চাই। রাজীব হায়দারের রক্ত বৃথা যেতে পারে না।
নিহত রাজীবের শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারিনি। এখন এই উদ্যোগ নিয়েছে তরুণ প্রজন্ম।
আজ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে
পতাকা উত্তোলন
প্রজন্ম চত্বরের সাথে সংহতি রেখে আজ রবিবার সকাল দশটায় স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাসহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একযোগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার আহবান জানানো হয়েছে। গত শুক্রবার জাগরণ সমাবেশ থেকে এ ঘোষণা দেয়া হয়। এ লক্ষে প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রস্তুতি রয়েছে বলেও জানা গেছে। এর আগে প্রজন্ম চত্বরের আহবানে সারা দেশ তিন মিনিটের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করেন দেশবাসী।
স্লোগানে রাজীবকে স্মরণ
শাহবাগ আন্দোলনে শুরু থেকেই আন্দোলনের প্রধান ভাষায় পরিণত হয়েছে স্লোগানে। ব্লগার-প্রকৌশলী রাজীব হায়দার (থাবা বাবা) হত্যার পর স্লোগান পেয়েছে নতুন ভাষা। গতকাল আন্দোলনরতরা স্লোগান তোলেন- ‘এক রাজীব লোকান্তরে, লক্ষ রাজীব শাহবাগে’, ‘দিয়েছিতো রক্ত, আরো দেবো রক্ত, রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘খুন হয়েছে রাজীব ভাই, জামায়াত শিবির রক্ষা নাই’, ‘শাহবাগের মোহনা, তোমার আমার ঠিকানা’, ‘রাজীব ভাইয়ের স্মরণে ভয় করি না মরণে’, ‘রাজীব ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেত দেব না’, ‘অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার কর, করতে হবে...’। এছাড়া কালো ব্যাজ পরে জনতা রাজীবের মৃত্যুতে শোক জানান।
নিরাপত্তা জোরদার
গত শুক্রবার রাতে রাজীবের মৃত্যুর পর শাহবাগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হয়েছে। শাহবাগের চার প্রবেশপথে মেটাল ডিটেক্টরসহ নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট নানা ধরনের সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়। গতকাল সকাল থেকে তল্লাশি করা হচ্ছে সন্দেভাজনদের। সন্দেহভাজনদের দেহ ও সঙ্গে থাকা ব্যাগ তল্লাশি করা হচ্ছে। শাহবাগের বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি-ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। রূপসী বাংলা হোটেল মোড় ও আজিজ সুপার মার্কেটের মোড়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার সামনের প্রবেশপথে বসানো হয়েছে আর্চওয়ে। শাহবাগ স্কোয়ারে আগত নাগরিকদের লাইনে দাঁড়িয়ে সমাবেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
রমনা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার সৈয়দ নূরুল ইসলাম বলেন, সমাবেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আন্দোলন শুরুর দিন থেকেই আমরা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছি। বর্তমানেও পুরো চত্বর নিরাপত্তা চাদরে রয়েছে। অস্থায়ী সাব-কন্ট্রোল রুম থেকে গোটা এলাকা কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।