চলছে উভয়পক্ষের প্রস্তুতি
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৮
একুশে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে যায় উভয়পক্ষেই অর্থাত্ একদিকে ছাত্র যুবসমাজ অন্যদিকে সরকার ও তার প্রশাসন। পূর্ববঙ্গের শীর্ষ প্রশাসনে তখন অবাঙালিদের প্রাধান্য। উচ্চাসনে বসা বাঙালি কর্মকর্তারাও তাদের হুকুমে চলেন। বাঙালির এ হীনমন্যতার ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন। হতে পারে শিক্ষায়, উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়া বাঙালি মুসলমান উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় অগ্রসর শিক্ষিত মুসলমানদের সামনে তাদের বাঙালিত্ব নিয়ে বড় একটা স্বস্তিবোধ করতেন না। তাছাড়া যে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান অর্জন তার শীর্ষ স্থানীয় কেন্দ্রীয় নেতারা সবাই অবাঙালি। জিন্নাহ, লিয়াকত, খালিকুজ্জামান, চুন্দ্রাগড়, গজনফর, নিশ্তার প্রমুখ সবাই।
অথচ ১৯৪৬-র ভোট বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাঙালি মুসলমানই লীগের একচেটিয়া বিজয় ও পাকিস্তান অর্জনের পথ সহজ করে দিয়েছিল। তাছাড়া প্রত্যক্ষ সংগ্রামে সংশ্লিষ্ট যে সাম্প্রদায়িক মহাহত্যাযজ্ঞ ভারত বিভাগ তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করেছিল তাও ঘটে বঙ্গদেশের রাজধানী কলকাতায়। সবপথের হিসাবেই পাকিস্তানের পথ তৈরি করে দিয়েছিল বাঙালি মুসলমান শিক্ষিত-অশিক্ষিত মিলে। এসব কিছু মিলে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের সমপর্যায়ের অবাঙালি মুসলমানের সামনে ছিল যুক্তিহীন হীনমন্যতা ও মানসিক দীনতা। অবশ্য বাঙালিত্বের প্রশ্নে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও সংকীর্ণতার বিষয়টাও সে সময় কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। সর্বোপরি পূর্বোক্ত ভারতীয় মুসলমানদের শিক্ষায় অগ্রসর অবস্থান পাকিস্তান রাজনীতি ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষেত্রে বাঙালির জন্য বিরূপ পরিবেশ তৈরি করেছিল। এর প্রতিফলন দেখা গেছে বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গের রাজনীতিতে ও প্রশাসনে। শুরুতে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রহমতউল্লা বিহারের মানুষ। তিনি ঢাকায় দাঙ্গা ঘটানোতে মত দেয়া ও বিহারীদের সুযোগ-সুবিধাদানে ছিলেন মুক্তহস্ত। পরিত্যক্ত দোকানপাট, জমি-বাস্তভিটা ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান বরাদ্দে এ প্রবণতা দেখা গেছে।
উর্দুভাষী বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন তার অধীনস্ত প্রশাসনকেই মান্য করে চলেছেন। যেমন দেখা গেছে, আটচল্লিশ সালে মার্চের ভাষা আন্দোলনের সময়। কোথায় চিফ সেক্রেটারিকে ডেকে পাঠাবেন সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য, তা না করে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী ছুটছেন চিফ সেক্রেটারির বাসায়। একই রকম ঘটনা দেখা গেছে পরবর্তী পর্বে অর্থাত্ বাহান্নের ভাষা আন্দোলনের সময়। চিফ সেক্রেটারি অবাঙালি আজিজ আহমদই যেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিধাতা অর্থাত্ আসল মুখ্যমন্ত্রী।
একুশের প্রস্তুতি লগ্নে তাই সরকার পক্ষে প্রেক্ষাপট তৈরি করে নুরুল আমিন সরকারের প্রশাসন। তারা ভালো চোখে দেখছেন না একুশের কর্মসূচি ঘিরে ছাত্র-যুবকদের তত্পরতা। এর মধ্যেই কথাটা বলে রাখা ভালো এবং তা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যে এ কাজে রাজনৈতিক নেতাদের বড় একটা সক্রিয় ভূমিকা দেখা যায়নি। যুবলীগের এবং ছাত্রাবাসগুলোর ছিল মুখ্য ভূমিকা। তারা যেমন ছাত্রাবাসের কক্ষে কক্ষে পোস্টার লিখে লাল বর্ণমালার ঢেউ তুলেছে, তেমনি বান্ডিল বান্ডিল ইস্তাহার ছেপে বিতরণ করেছে, ঢাকার বাইরে পাঠিয়েছে, ফেস্টুন তৈরি করেছে (তখন ব্যানারের প্রচলন একটু কম ছিল), যোগাযোগ করেছে ছাত্রাবাস থেকে ছাত্রাবাসে। তা না হলে বিশেষ দাবিতে ধর্মঘটরত মিটফোর্ড স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ছুটে যেতে হবে কেন? তাছাড়া মাঝে মধ্যে আমতলা-বেলতলায় ছাত্রসভা।
এসব দেখেই বোধ হয় আজিজ আহমদের প্রশাসন সতর্ক হয়। তাদের দিক থেকেও পাল্টা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হতে থাকে। প্রতিরোধ না বলে ‘আঘাত’ কথাটাই সঠিক। কারণ ছাত্ররা তো তাদের আঘাত করার কোনো কর্মসূচি নেয়নি। আগে বলেছি, আবারও বলি আমাদের কর্মসূচি ছিল শান্তিপূর্ণ পদ্ধতির। প্রশাসনিক তত্পরতার অংশ হিসাবে সরকার পক্ষে ছিল কিছু রদবদলের পরিকল্পনা। প্রবীণ বাঙালি ম্যাজিস্ট্রেটকে অন্যত্র বদলি করে বদমেজাজি তরুণ কোরাইশিকে ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে ঢাকায় আনা হল। এ সবই চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদের চিন্তাভাবনা। বাঙালি ছাত্রদের আন্দোলন বন্ধ করতে অবাঙালি প্রশাসক আমদানি। এসব ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের সঙ্গে নীতিগতভাবে আলোচনাও নাকি প্রয়োজনবোধ করেননি প্রতাপশালী চিফ সেক্রেটারি।
অর্থাত্ প্রস্তুতি উভয়পক্ষেই একুশে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে। নুরুল আমিন ও তার প্রশাসন দমননীতিতে বিশ্বাসী। সেভাবেই ছক সাজানো। সাজানো পুলিশ প্রশাসনও। অন্যদিকে সরকার সমর্থক মুসলিম ছাত্রলীগকেও তৈরি রাখা হচ্ছে যাতে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা যায়। কিন্তু ওদের কাঁটা ছিল ঠুনকো, দুর্বল- ছাত্রজনভিত্তিহীন। অন্যদিকে বাংলা ভাষার পক্ষে ছাত্রসমাজ তখন প্রায় একাট্টা। এভাবেই একুশের প্রস্তুতি পর্ব নিজস্ব নিয়মে তৈরি হতে থাকে, পক্ষ-প্রতিপক্ষ হিসাবে।
লেখক: ভাষাসংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক