কাজী কাদের নেওয়াজ : শিশু সাহিত্যিক এবং আদর্শ শিক্ষক

বাদশাহ আলমগীরের পুত্রকে পড়ানোর দায়িত্ব ছিলো একজন মৌলভীর ওপরে। একদিন সকালে বাদশাহ আলমগীর দেখতে গেলেন ‘পুত্র কেমন শিক্ষা লাভ করছে?’ তিনি দেখলেন, বাদশাহ-পুত্র শিক্ষকের চরণে পানি ঢালছে। শিক্ষক তার চরণ ধুয়ে মুছে সাফ করছেন নিজ হাতে। বাদশাহকে দেখে শিক্ষক ভাবলেন, দিল্লীপতির পুত্রের হাতে সেবা নিয়েছি - আজ আর তার নিস্তার নেই। কিন্তু হঠাত্ করেই শিক্ষকের মনে হলো, শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার দিল্লীর পতি সে তো কোন ছার, ভয় করি না’ক, ধারি না’ক ধার, মনে আছে মোর বল বাদশাহ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল। না, শাস্ত্রের কথা শোনাতে হয়নি বাদশাহকে। বরং বাদশাহ তাকে অনেক বড় সম্মানে ভূষিত করেছেন। বাদশাহ-পুত্র শিক্ষাগুরুর চরণে পানি ঢেলেছে, কিন্তু নিজ হাতে চরণ ধুয়ে দেয়নি বলে বাদশাহ কষ্ট পেয়েছেন। শিক্ষক উচ্ছ্বাসভরে বলেছেন, “আজ হতে চির-উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির / সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।” শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকের মধ্যে যে সম্পর্ক এবং শিক্ষকের যে মর্যাদা তা নিয়ে এই কবিতাটি লিখেছেন একজন মহত্ এবং আদর্শ শিক্ষক কাজী কাদের নেওয়াজ। তিনি মামার বাড়ি মুর্শিদাবাদে ১৯০৯ এর ১৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেছেন। পিতার নিবাস বর্ধমানের মঙ্গলকোট গ্রামে। বহরমপুর কলেজ থেকে ইংরেজিতে সম্মানসহ বি.এ পাস করেছেন তিনি। কিছুদিন এম.এ ক্লাসে অধ্যয়ন করেন। ১৯৩২ এ বি.টি পাস করে কর্মজীবনের শুরু। কিছুদিন স্কুল সাব-ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব পালনের পর তিনি শিক্ষকতায় প্রবেশ করেন। দেশ বিভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন এবং নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক¬¬তায় যোগদান করেন। ১৯৫১ তে দিনাজপুর জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯৬৬ তে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি মাগুরা জেলার মুজদিয়া গ্রামে সপরিবারে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। নৈতিক মূল্যবোধ, মানবপ্রেম, পল্লী-প্রকৃতি, ধর্মীয় অনুশীলন তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়। ‘মরাল’ তাঁর একটি বহুল সমাদৃত কাব্যগ্রন্থ। শিশু-সাহিত্যিক কাজী কাদের নেওয়াজ গদ্য রচনাতেও কুশলী লেখক ছিলেন। ‘দাদুর বৈঠক’ শিশুদের জন্য লেখা গদ্য রচনা। ‘নীল কুমুদী’ কাব্য এবং ‘দুটি তীরে’ উপন্যাস তাঁর সমাদৃত গ্রন্থ। তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করেছেন। আত্মপ্রচার বিমুখ কবি কাজী কাদের নেওয়াজ একজন যথার্থই শিক্ষক ছিলেন। ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি লোকান্তরিত হয়েছেন। তাঁর সমস্ত রচনার মধ্যে ঐ একটি চরণই তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে চিরদিন। শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার / দিল্লীর পতি সে তো কোন্ ছার।