নারীরাই আন্দোলনের প্রাণ
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪৯
শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর এখন সবচেয়ে বেশি সরব তরুণ তথা বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি নিয়ে তরুণ প্রজন্মের চেতনা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বে। এই আন্দোলনের সাথে সারা দেশ একাত্ম হয়েছে বহু আগেই। শাহবাগে বহমান এই আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশের লক্ষ্যে যে যখন পারছে তাদের কাজের মধ্যে সময় বের করে নিচ্ছে। সকালে ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি হলে রাত যত বাড়ছে সাথে সাথে বাড়ছে অফিস কর্মীদের সংখ্যা। যে কিশোর-কিশোরী জীবনে স্লোগান দেয়নি তারাও নানা পোস্টার এঁকে বসে যাচ্ছে স্লোগান দিতে। সকলের মুখে এক স্লোগান ‘এক দফা এক দাবি, ফাঁসি ফাঁসি’। সারাদিন-রাত স্লোগান দিয়েও তাদের মধ্যে নেই কোন ক্লান্তি। বার বার শাহবাগ থেকে বের হচ্ছে মশাল মিছিল। স্লোগান, মশাল মিছিলসহ সব ধরনের কর্মসূচিতে নারীদের অবস্থান সুদৃঢ়। লাকি আক্তারের মত অনেকেই হয়ে উঠছে সংগ্রামের প্রতীক। ছোট ছোট স্কুল ছাত্রীরা যখন মুষ্টিবদ্ধ হাতে বলছে জয় বাংলা, দাবি জানাচ্ছে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি। তখন সেই ঢেউ ছুঁয়ে যাচ্ছে বৃদ্ধ, যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণী সকলের মনকে। সকলকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে এক নতুন দেশের যেখানে সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না, রাজাকার থাকবে না। শাহবাগের প্রাঙ্গণের রণক্ষেত্র বহুদিন জমে থাকা মানব মনের ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। কথা হচ্ছিল স্কুলছাত্রী সিফাতের সাথে। তারা সবাই স্কুল থেকে দল বেঁধে এসেছে।
সিফাত বলেন ‘এটি আমার জীবনে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, কিন্ত এটি আমাদের জন্য দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। তারা নানা প্লাকার্ডে নিজেদের দাবি-কাদের মোল্লার ফাঁসি লিখে এসেছে। তালে তালে চলছিল স্লোগান। প্রত্যেকের মাথায় বাঁধা রয়েছে স্লোগান লেখা ব্যান্ড, যাতে লেখা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই। আমরা জীবনেও স্লোগান দেইনি কখনও ভাবিওনি যে আমরা দিব। শাহবাগের এই সমাবেশ আমাদের জীবনে এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে। আমরা এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সামিয়া বলছিলেন, ‘আমি সারাদিন ধরেই এই প্রাঙ্গণে। বিভিন্ন সময় যোগ দিচ্ছি নানা গ্রুপে। বিভিন্ন ছোট ছোট ভাগে ভাগ হয়ে চলছে স্লোগানের যে ধারা তাতে কোন ভিন্নতা নেই। আমি অন্য বিভাগের হলেও মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে বসে স্লোগান দিয়ে আসলাম। মনে হল আমরা সবাই এক পথের পথিক। আমাদের সবার এক দাবি এবং শাহবাগের এই মোহনা-ই আমাদের ঠিকানা। যে যখন আমাদের আশ-পাশ দিয়ে যাচ্ছে স্লোগানের সাথে যোগ দিচ্ছে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সর্বোচ্চ সময় এখানে থাকার চেষ্টা করছি।’ এভাবেই শাহবাগে একজন যাচ্ছে তো একজন আসছে ও মানুষের বহমান ধারা চলছেই। সন্ধ্যার দিকে রাবেয়া, রাজিব, কবিরসহ আরও কয়েকজন একসাথে এসেছে অফিস থেকে। তারা সবাই একই ব্যাংকে চাকরি করে। সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত অফিস করে এসেছে শাহবাগ প্রাঙ্গণে। লাকি আক্তারের স্লোগান তাদের মন থেকে দূর করে দিয়েছে সব ক্লান্তি। এসময় সবার দিকে তাকিয়ে পাঁচ টাকা করে শ’খানেক বাদামের প্যাকেট কিনে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া শুরু করল তারা। লাখ লাখ মানুষকে তো আর তাদের পক্ষ থেকে দেয়া সম্ভব নয়, তবু সারাদিন পরিশ্রম করে যারা এখানে রয়েছে তাদের জন্য ও নিজেদের জন্য সামান্য কিছু করার ইচ্ছা থেকেই এই বিতরণ। এতে নেই কোন লাভ, নেই কোন লোভ। রাবেয়া বলল, এসময় তাদের কাছে ঘুরে ঘুরে আসা শুরু করল বিস্কিট। কে কাকে দিচ্ছে কিছুই তারা জানে না। এসব একটু খেয়েই অফিস শেষে নিজ মনের দাবি প্রকাশে স্লোগান দেবার শক্তি পেল তারা। প্রকাশ করা শুরু করল নিজ মনের দাবি, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি।
যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে একমত প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী ফেসবুক গ্রুপ ‘শাহবাগ প্রবাসে’। তারা চার লাখ ৭৮ হাজার ৬৮৩ টাকা সংগ্রহ করেছে এই উদ্দেশ্যে। শাহবাগ প্রবাসে এই ফেসবুক গ্রুপের উদ্যোক্তাদের মধ্যে রয়েছে সালমিন সুলতানা, রেজওয়ান করিম, ইশতিয়াক রাউফ, বায়জীদ গণি প্রমুখ। যুক্তরাষ্ট্রের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয়েছে বিক্ষোভ সমাবেশের। দেশ থেকে বহু দূরে থেকেও তাদের মন যে পড়ে রয়েছে শাহবাগে এসব তারই প্রমাণ। তাছাড়া অস্ট্রেলিয়া, দিল্লী, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, কানাডা, ইউরোপের লন্ডন, জার্মানি, ভিয়েনাসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাঙালিরা শাহবাগ চত্বরে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে সমাবেশ করেছে। এসব সমাবেশে নারীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।