ওবামার মধ্যপ্রাচ্য সফর মার্চে

গত দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থার জন্য ফিলিস্তিন-ইসরাইল একে অপরকে দোষারোপ করছে। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ত না হওয়াকেও দায়ী করে তারা। সেই প্রেক্ষিতে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য সফরে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য সফর করবেন তিনি। তবে ওবামার এই সফরে শান্তি প্রক্রিয়ায় তেমন কোনো অগ্রগতি হবে বলে মনে করছে না দুই পক্ষ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সফরে শান্তি প্রক্রিয়া বিষয়ে সামান্য আলোচনা হতে পারে। সফরে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে থাকা পশ্চিম তীরের কিছু অংশ ফিলিস্তিনের নিয়ন্ত্রণে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। ইসরাইল কিছু ফিলিস্তিন বন্দিকে মুক্তি দিতে পারে। এছাড়া জাতিসংঘে নতুন অবস্থানের মাধ্যমে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যাওয়ার চেষ্টা থেকে ফিলিস্তিনকে বিরত রাখার শর্তে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন বন্ধ করার পরিকল্পনার বিষয়টি জানাতে পারে ইসরাইল। মিসর ও ইসরাইলে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল সি. কার্জার বলেন, এ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমাদের একই সঙ্গে চার-পাঁচটি বিষয়ে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। যাতে করে কেউ বলতে না পারে এ শান্তি প্রক্রিয়ায় আমাদের ভূমিকার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হোয়াইট হাউস শান্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যাশার পরিমাণটা কমই রাখতে চাইছে। তারা বলতে চাইছে, প্রেসিডেন্ট শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য নতুন কোনো পদক্ষেপ নিয়ে আসছেন না। কেউ কেউ মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা আগামী ২০ মার্চ সফরে যাবেন। এ সফরে তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে আলোচনা করবেন। হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠনিকভাবে কিছু না জানালেও বলা হচ্ছে, ওবামা জেরুজালেমে দুই দিন থাকার পরিকল্পনা করছেন। ইসরাইলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করবেন তিনি। এছাড়া ইসরাইলের পার্লামেন্ট বা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বক্তৃতা দেবেন। পশ্চিম তীরে সংক্ষিপ্ত সফরে সাক্ষাত্ হতে পারে ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে। ইসরাইলে গত মাসের নির্বাচনের পর সরকার গঠনে বড় বেগ পেতে হয়েছে নেতানিয়াহুকে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ও অভ্যন্তরিণ রাজনৈতিক বিভক্তির মুখে চাপে আছে আব্বাসের সরকারও। দুই সরকারের অবস্থা যখন নাজুক ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্য সফরে আসছেন ওবামা। নেতানিয়াহু ও ওবামা প্রশাসনের মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছিলো। বিশেষ করে ইসরাইলের বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখা ও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের উপায় নিয়ে মতবিরোধ চলে আসছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থা নাজুক হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুনভাবে শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে আসছেন। অচল শান্তি প্রক্রিয়াকে চালুর লক্ষ্য নিয়ে নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে ইসরাইল সফর করলেও তার ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে তিনি ইসরাইল সফর করেননি। মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশ ভ্রমণ করলেও মিত্র ইসরাইলে ওবামা সফরের সময় পায়নি এমন সমালোচনাও শুনতে হয়েছে তাকে। সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মিট রমনি তার প্রচারণায় এ অভিযোগ তুলেছিলেন। তাই হয়তো বদনাম ঘোচাতে ওবামার এ সফর। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের চারজন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় থাকাকালে ইসরাইল সফর করছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জেই কারনে বলেন, ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদ ও ইরাইলের নতুন সরকার দুই পক্ষের সম্পর্ককে জোরদার করা ও এগিয়ে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এমনটা মনে করছে ইসরাইলের প্রশাসনও। তারা বলছে, দুই পক্ষের সম্পর্ক ও অংশীদারিত্ব জোরদার করার ক্ষেত্রে ওবামার সফর সুযোগ করে দেবে। তবে এতে ফিলিস্তিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে মনে হচ্ছে না। আব্বাসের একজন ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা মোহাম্মদ শাতাইহে বলেন, প্রেসিডেন্ট ওবামার আসাটা যথেষ্ট নয়। তিনি কী নিয়ে আসছেন আমরা সেটা দেখার জন্য অপেক্ষায় আছি। বিশ্লেষকরা বলছেন, বারাক ওবামার এ সফরে শান্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে দৃঢ় কোনো ভূমিকা বা পদক্ষেপ আশা করা হচ্ছে না। তবে এ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামা আলোচনা করবেন। যাতে তিনি সবাইকে দেখাতে পারেন এ বিষয়টি থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে রাখছেন না। ওবামা মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা ডেনিস রস বলেন, হতে পারে প্রেসিডেন্ট ওবামা এ সফরের মাধ্যমে একই প্রধানমন্ত্রীর সাথে নতুন করে শুরু করছেন তবে নতুন সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্কের শুরু। শান্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জনের সম্ভাবনা না থাকলেও ওবামার এ সফরকে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিন। জেরুজালেমে মার্কিন কনসাল জেনারেল মাইকেল র্যাটনের সঙ্গে বৈঠকের পর ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সফরকে স্বাগত জানাই। এছাড়া ফিলিস্তিন-ইসরাইলের মধ্যকার শান্তি প্রক্রিয়ার বরফ গলাতে তার প্রচষ্টোকেও স্বাগত জানাই। ঐ বৈঠকে মার্কিন কনসাল শান্তি আলোচনা শুরুর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার কথা আব্বাসকে অবহিত করেন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওবামার এ সফরের এজেন্ডোয় ইরান ও সিরিয়ার বিষয় থাকবে। এ দুটি দেশ মধ্য প্রাচ্যে বিস্তর সংঘাতের জন্য হুমকি বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি সিরিয়ায় বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এ কারণে হেজবুল্লাহ হামলা চালাতে পারে এমন ভীতিও রয়েছে ইসরাইলের। গত সপ্তাহে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট সিমন পেরেজ পার্লামেন্টে এক বক্তৃতায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানের এ হুমকির ইতি টানতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এটা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে আমি বিশ্বাস করি। ওয়াশিংটনে ইসরাইলের সাবেক প্রতিনিধি যোরাম এটিনজার মনে করছেন ওবামার ইসরাইল সফর ইরানের জন্য একটি সতর্ক বার্তা।