ন্যাটোর আফগানিস্তান ত্যাগের ঘোষণা
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৯:৩৪
ছাদে অলংকৃত ঝাড়বাতি। আলপনা আঁকা টেবিলে সাজানো অভিজাতদের নানা প্রকার সুস্বাদু খাবার। খাওয়ার পর পুরুষদের গান ও নাচ পরিবেশন। গানেও আছে ভিন্নতা। বাইরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একটা বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন এসব। পাত্র ইয়াদগারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা। এ ধরনের চিত্র হয়তো যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের খুব অল্প কয়েকটি স্থানে দেখা যেতে পারে। এই কাবুলেরই অনেক স্থানে মাটির তৈরি ঘরে কোনোভাবে খেয়ে পরে জীবনযাপন করছে অনেকে। তবে সম্প্রতি মধ্যবিত্তদের জীবনে নামতে বসেছে নানা দুর্গতি। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন দেশটির দোভাষীরা। এরা অর্থের বিনিময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশি সৈন্যদের সাহায্য করছেন। ন্যাটো সৈন্যরা চলে গেলে আর্থিক অবস্থা যেমন খারাপ হবে তেমনি জীবনও হুমকির সম্মুখীন হবে বলে ধারণা করছেন এসব দোভাষী।
২০০১ সালে তালেবানের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী দেশটির নিরাপত্তায় নিয়োজিত হয়। এরপর অনেকে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসে। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশি সেনাদের দোভাষী হিসেবে কাজ শুরু করে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু এখন ভালোভাবে বেঁচে থাকা তো দূরের কথা তাদের জীবনই হুমকির সম্মুখীন। কারণ বিদেশি সৈন্যরা আফগানিস্তান ছাড়বে ২০১৪ সালের মধ্যে। আর তখন হয়তো তালেবানরা এদের লক্ষ্য করে হামলা চালাবে। কারণ তালেবানদের কাছে এরা বিশ্বাসঘাতক বা দেশদ্রোহী হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ন্যাটো বাহিনীর কাছে পরিচিত আফগানিস্তানের বীর যোদ্ধা হিসেবে। পর্বত দিয়ে ঘেরা এই আধুনিক যুগে দেশটিতে অবকাঠামোখাত প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি। মাদক ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল দেশটির অর্থনীতি। শতকরা ৯০ ভাগ আফিম এই দেশ থেকে সরবরাহ করা হয়। যা থেকে বার্ষিক প্রায় ১শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়। ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০ লাখ। এর অনেক নাগরিকই শরণার্থী। ন্যাটো বাহিনী ২০১৩ সালের মাঝামাঝিতে আফগান বাহিনীর হাতে দেশটির নিরাপত্তা তুলে দেয়ার পরিকল্পনা করে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন এক লাখ ৩০ হাজার সৈন্য আফগানিস্তান ত্যাগ করবে। তবে আফগান সৈন্যদের প্রশিক্ষণদানকারী বিদেশি সৈন্যরা থাকবে।
তিন কোটি ২৪ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশটিতে ৭০ শতাংশ নাগরিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে যা সংখ্যায় আড়াই কোটি। প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ৪৯ বছর। বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৪১০ মার্কিন ডলার। তবে এগুলো কাবুলের মধ্যবিত্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে আছে বিউটি পার্লার, কুঞ্জপথ, নতুন টেলিভিশন স্টেশন, স্বাস্থ্য সুবিধা। যদিও উন্নত চিকিত্সার জন্য তাদের বিদেশ যেতে হয়। আধুনিক রেস্টুরেন্টে যেখানে ফ্রাইড চিকেন পাওয়া যায়, শিশুদের জন্মদিনের পার্টিও হোটেলে হয়। কাবুলে ৫ একর জমি জুড়ে রয়েছে বেসরকারি আমেরিকান ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস। এখানে আর্থিকভাবে সাবলম্বী পরিবারের ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার সুযোগ রয়েছে। একজন শিক্ষার্থীকে বছরে ৬ হাজার ডলার পরিশোধ করতে হয় আইন এবং অন্যান্য বিষয়ে ডিগ্রির জন্য।
বেসরকারি খাতে নতুন প্রজন্ম উন্নতি লাভ করছে। হাজ সাইফুল্লাহ (৪২) যার তিনটি ওষুধের দোকান আছে এবং বড় ধরনের ভবন তৈরির কাজ চলছে কাবুলের জালালাবাদ এবং মাজার-ই-শরীফে। সাইফুল্লাহ বলেন, আমি তাদের মধ্যে একজন যে বিভিন্ন ব্যবসায় এক মিলিয়নের বেশি ডলার বিনিয়োগ করেছে। তার বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছাড়বে না। সত্যি কথা বলতে কি আমি ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তিত নই। কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এদেশে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। তারা তাদের বিনিয়োগ ব্যর্থ করে ফিরে যাবে না।
অনেকেই ভীত হচ্ছে যে আবার যদি তালেবান রীতিনীতি কাবুলে প্রয়োগ করা হয় তাহলে কী হবে। যেমন নির্দিষ্টভাবে মালালাই ইসাকজাই এর কথা বলা যায়। তিনি ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি বাস করেন কাবুলের মাইকোরাইওনের একটি উন্নত এ্যাপার্টমেন্টে। যেখানে বিলবোর্ডে এনার্জি ড্রিংকের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। সেলফোন, ব্যায়ামাগার, বেসরকারি স্কুল এবং এয়ারলাইনের বিজ্ঞাপন স্থানটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তিনিও বিশ্বাস করেন না আফগান বাহিনীর ওপর নির্ভর করে দেশ ত্যাগ করবে যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটো বাহিনী। ইসাকজাই যদি সত্যিই আমেরিকা চলে যায়, তাহলে শতভাগ নিশ্চিত যে আমি সাবেক এমপি এবং রাজনীতিবিদ হিসেবে এখানে থাকতে পারবো না। নতুন প্রজন্মের অনেকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চাকরি করে মাসিক ৫ হাজার ডলার আয় করেন। কিন্তু ক্রমেই এসব ফান্ড সরকারের আয়ত্তে যাওয়ায় তাদের আয়ও কমছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ৫ হাজারের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বেতন বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করা হয়। পশ্চিমা কর্মকর্তারা মনে করছেন, গত ১০ বছরে যারা পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এসেছে তারা চলে গেলে বেতন কমে যাবে। অর্থনীতির গতি মন্থর হবে।
ভবিষ্যতে তালেবানরা ক্ষমতায় আসলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খারাপ হতে পারে এই আশঙ্কায় আফগানের ধনিরা তাদের দ্বিতীয় বাড়ি বিদেশে করে রেখেছে। আফগান দোভাষী যারা ব্রিটিশদের জন্য কাজ করতে গিয়ে যুদ্ধ এবং বিপদের সম্মুখীন হয় তারা মনে করছে, তাদের ত্যাগ করা হচ্ছে। আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল জন অ্যালেন বলেন, তাদের দেখাশোনা করাটা আমাদের দায়িত্ব। আব্দুল নামের এক দোভাষী তালেবানদের হামলার ভয়ে লুকিয়ে আছেন। তিনি ন্যাটোর একজন বিশ্বস্ত দোভাষী। নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার জন্য তাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। তাকে চিঠিতে তালেবানরা হুমকি দিয়েছে এবং গোয়েন্দাগিরির জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকেও এই বার্তা দেখিয়েছেন এবং আশ্রয়ের প্রার্থনা করলেও সেটি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি জানি না কি ধরনের প্রমাণ দেখালে তারা এটি বিশ্বাস করবে। হয়তো আমি মরে গেলে বিশ্বাস করবে। নাজ নামের একজন জানান, তিনি যখন বাড়ি ফিরে যান তখন অত্যন্ত গোপনে যান। কারণ তার ভয় হয় যে, তার প্রতিবেশী এবং আত্মীয়স্বজনরা টের পায় যে তিনি কী কাজ করছেন। জাহ নামে একজন জানান, স্থানীয়রা তাকে কাফের বলে সম্বোধন করে। কেউই বিশ্বাস করে না যে, আফগান সেনাবাহিনী কিংবা পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দেবে বা দিতে সমর্থ হবে। তারা তো নিজেদেরই রক্ষা করতে পারে না।
৬শ’র বেশি আফগান দোভাষী বিদেশি অফিসের জন্য কাজ করেন। এদের ২০ জনের বেশি ইতোমধ্যে নিহত হয়েছেন। পশ্চিমা বিশ্বের কর্মকর্তারা বলছেন,তারা হুমকির বিষয়টি জেনেই চাকরিতে যোগ দিয়েছে এবং স্বাক্ষর করেছে। এ কারণে তাদের মাসে ১৫শত ডলার পারিশ্রমিক দেয়া হয়, যা আফগানিস্তানে একটি ভালো মানের পারিশ্রমিক। অধিকাংশ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো তাদের দোভাষীদের আশ্রয় দিতে বিশেষ কর্মসূিচ চালু করেছে। কিন্তু ব্রিটেন করেনি। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দেশটি তাদের দোভাষীদের ত্যাগ করবে না এবং তাদের আশ্রয়ের বিষয়টি পর্যায়ক্রমে বিবেচনা করা হবে।