পাকিস্তানে নিরাপত্তাহীনতায় সুশীল সমাজ

পাকিস্তানের সুশীল সমাজ ক্রমেই নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। বিশেষ করে ধর্মীয় মৌলবাদ, রাজনীতির দুষ্টচক্র ও সরকারের সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানে চরম ব্যর্থতা এ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এরই ফলশ্রুতিতে মারাত্মক জীবনের ঝুঁকিতে রয়েছেন মানবাধিকার কর্মী থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের অনেকেই। এ কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশটি এক নতুন সংকটে মোড় নিচ্ছে। বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায় গত ডিসেম্বরে যখন তালেবান জঙ্গিদের হামলায় পাঁচ পোলিও টিকাদান কর্মসূচির কর্মকর্তা নিহত হন। অত্যন্ত গর্হিত ও ন্যক্কারজনক এ ঘটনায় সারা বিশ্বে তখন নিন্দার ঝড় উঠে। দেশটিতে যে হারে জঙ্গি হামলা বেড়েছে তাতে অনেকেই বলছেন, সেখানে ক্রমেই সাধারণ মানুষের বসবাস অনুপযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ মালালা ইউসুফজাই। তার উপর তালেবান জঙ্গিরা যে বর্বর হামলা চালিয়েছে তা বিশ্বের সকল বিবেকবান মানুষের মনকেই নাড়া দিবে। অথচ তার কী অপরাধ ছিল। সে নারী শিক্ষার পক্ষে কথা বলেছিল-এটাই কি তার অপরাধ? হ্যাঁ, আর এ জন্যই তাকে টার্গেট করে জঙ্গিরা। হামলার পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে লন্ডনের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে জীবন মৃত্যুর সঙ্গে দিনের পর দিন পাঞ্জা লড়ে অবশেষে সে প্রাণে বেঁচে যায়। তার এই সাহসী কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সে নোবেল পুরস্কারে মনোনয়ন পেয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এই কিশোরীকে সত্যিকার অর্থে তালেবান জঙ্গিরা কি বেঁচে থাকতে দিবে? সে যদি আবার দেশে ফিরে আসে তাহলে আবার কি তালেবান জঙ্গিদের টার্গেটে সে পরিণত হবে না? যদি না হয় সে গ্যারান্টি কে দেবে? এতো গেল একজন মালালার কথা। এভাবে অসংখ্য মালালার অস্তিত্ব রয়েছে। এক মালালা হয়তো প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে সবার কাছে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু এরকম অসংখ্য মালালা রয়েছে যাদের পরিচয় আমরা জানি না বা আমাদের চর্মচক্ষুতে তা ধরা পড়ে না। তারপরেও দেশটিতে যে হারে তালেবান জঙ্গিরা সক্রিয় হয়ে উঠছে তাতে সকলের জীবনই আজ বিপন্ন তা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে না। সমপ্রতি বিবিসিতে প্রকাশিত ‘পাকিস্তান সিভিল সোসাইটি আন্ডার থ্রেট’ নামক এক নিবন্ধে তেমনই আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, গত ডিসেম্বরে পাঁচ পোলিও স্বাস্থ্য কর্মীকে জঙ্গিরা যেভাবে হত্যা করেছে তাতে সেখানে বসবাসরত সব বিদেশি সংস্থার কর্মকর্তা, কর্মচারীর জন্যই এটা একটা মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। এভাবে গত জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ১৯ জন পোলিও টিকাদান কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। আর তাদের এ ভয়ঙ্কর থাবা যে সময়ের সাথে সাথে একসময়ে গোটা সুশীল সমাজকে গ্রাস করবে সে আশঙ্কা বোধ হয় একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। সেদিনের সে ঘটনা ঘটেছিল দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী করাচিতে। এখানে পোলিও টিকা প্রদানকারী পাঁচ নারী কর্মীকে জঙ্গিরা গুলি করে হত্যা করে। নিহতরা জাতিসংঘের পোলিও নির্মূল প্রোগ্রামে কাজ করতেন বলে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা জানান। করাচির স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মকর্তারা জানান, দেশ জুড়ে তিন দিনের পোলিও টিকা খাওয়ানোর কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া একই মাসে পাকিস্তনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ছয় মহিলাসহ ৭ ত্রাণকর্মীকে তারা হত্যা করে। নিহতদের পাঁচ জনই ছিলেন শিক্ষক। স্থানীয় পুলিশ প্রশাশন জানায়, পাকিস্তানের উজালা দাতব্য সংস্থা পরিচালিত শিশুদের একটি কমিউনিটি সেন্টার থেকে ত্রাণকর্মীরা কাজ শেষে গাড়িতে করে বাড়ি ফেরার পথে এ হামলার শিকার হন। এ কারণে পাকিস্তানের দুই প্রদেশে (খাইবার পাখতুনখাওয়া ও সিন্ধু) টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ রয়েছে এবং তা কবে নাগাদ শুরু হবে সেটা অনিশ্চিত। ইসলামাবাদে বিবিসি প্রতিনিধি এলেম মকবুল বলেছেন, পাকিস্তানে এই প্রথম এনজিও কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটল। দুটি মোটর সাইকেলে করে চার জন হামলাকারী এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ঘটনার বিবরণে এটা স্পষ্ট যে, এখন তারা বিভিন্ন এনজিও এবং সুশীল সমাজের লোকজনকে ধরে ধরে টার্গেট করছে। তাদের এ হীন কর্মকাণ্ডের ফলে প্রায় প্রতিদিনই সেখানে কেউ না কেউ হামলার শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে। এতো গেল সামপ্রতিক সময়ে দেশটিতে জঙ্গি হামলায় মারা যাওয়ার কিছু চিত্র। এছাড়াও আরো অনেকে বর্তমানে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। রীতিমতো এখন তাদের রাতের ঘুম হারাম হওয়ার উপক্রম হয়েছে। পাকিস্তানে সমপ্রতি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং তার প্রতিনিধি আলি দাইয়ান হাসানের প্রতিবেদন নিয়ে সেদেশের সেনাবাহিনী এক অভিযোগ উত্থাপন করে। এতে ওই প্রতিবেদনকে ‘একঝুঁড়ি মিথ্যা এবং পক্ষপাতদুষ্ট প্রপাগান্ডা’ বলে অভিহিত করা হয়। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তখন মিডিয়ার কাছে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ দেশে সহিংসতার আগুন আরো জ্বালিয়ে দেয়ার পাঁয়তারা করছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ ধরনের মন্তব্যে তখন অনেকেই হতবাক হন। ২০১২ সালে ৪শ’রও বেশি শিয়া মুসলমানকে সুন্নী জঙ্গিরা হত্যা করে, যাদের অধিকাংশই বেলুচিস্তানের হাজারা কমিউনিটির অন্তর্গত। তারা এই শিয়া মুসলমানদেরকে ধরে ধরে টার্গেট করে হত্যা করেছে। এ বছরে কমপক্ষে ১শ’ শিয়া হাজারাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। দেশটিতে এখন তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছে যে, কখন তারা নতুন হামলার শিকার হয়। এছাড়া সরকারের তরফ থেকে বাস্তুচ্যুত অনেক হাজারা ত্রাণ না পাওয়ায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সমপ্রতি শিয়া হাজারা কমিউনিটি সরকারের বিরুদ্ধে তাদের নিরাপত্তার দাবিতে রাজপথে নামে। তাদের বক্তব্য সরকার তাদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা বলেন, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হলে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আর এর দায়-দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। শুধু তাই নয়, জঙ্গিদের এ নারকীয় তাণ্ডবে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ এবং কেন্দ্র শাসিত বিভিন্ন উপজাতীয় এলাকায় প্রায় ৮শ’ স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। সহিংসতার কারণে বেলুচিস্তানের কয়েকশ’ স্কুলের এখনও একই অবস্থা। শিক্ষকরা জঙ্গিদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এসব এলাকায় এনজিও পরিচালিত স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা কার্যক্রম কমিয়ে আনা হয়েছে। কেননা বিগত সময়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্য কর্মীকে হত্যা করায় নিরাপত্তার খাতিরে তারা এ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। ২০১২ সালের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে উপজাতীয় নারীদের নিয়ে কাজ এক কর্মীকে জঙ্গিরা হত্যা করে। তার নাম ফরিদা আফরিদি। তাকে জঙ্গিরা গুলি করে হত্যা করে। বিদেশি ত্রাণ কর্মীরাও এখানে নিরাপদ নয়। ২০১২ সালের এপ্রিলে খলিল দালে নামে রেডক্রসের এক ডাক্তারকে তারা হত্যা করে। প্রথমে তাকে অপহরণ করা হয়। এরপর তাকে হত্যা করা হয়। এ কারণে ওই বছরে ৬০ জন বিদেশি ত্রাণকর্মী পাকিস্তান ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। আর এসবই হয়েছে তাদের নিরাপত্তা হুমকির কারণে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে তা মে মাসের মধ্যেই হবে। কিন্তু এখনও সেখানে নানা রাজনৈতিক সংকট দানা বেধে আছে। কোন কোন দল নির্বাচন পিছানোর জন্য ইতিমধ্যেই কলকাঠি নাড়ানো শুরু করেছে। ক্ষমতাসীন দল এ জন্য অবশ্য অনেক অন্ধকারের শক্তিকে দায়ী করছে। তারা বলছে, এই চক্রটি নির্বাচন পিছানোর জন্য অতি সন্তোর্পণে নীল নকশা আঁটছে। যা হোক নির্বাচন যদি সামনে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে সুশীল সমাজই তার পর্যবেক্ষণে থাকবে যা এর আগের নির্বাচনগুলোতেও হয়েছিল। তবে দেশটিতে যে অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে, যেভাবে জঙ্গি হামলা রাতের ঘুমকে হারাম করে দিচ্ছে, এনজিও ত্রাণকর্মী, স্বাস্থ্য কর্মী, সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে তাতে কেউই আজ নিরাপদে বাহিরে পা ফেলতে পারছে না। এর জন্য পুরোপুরি রাষ্ট্রযন্ত্র তার দায় এড়াতে পারে না। এমন অবস্থায় সেখানে নতুন কোন সরকার আসলে তা সাধারণ মানুষের জন্য কতটা কল্যাণকর ও নিরাপত্তা বিধানে সক্ষম হবে সেদিকেই তাকিয়ে আছে অসংখ্য চোখ।