উ ত্ত র কো রি য়া র প রী ক্ষা মূ ল ক বি স্ফো র ণ
বাড়ছে পরমাণু উত্তাপ
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৯:৩৫
ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যবর্তী দিনটি যদি হয় ভালোবাসার, তবে তার দিন দুই আগের কর্মকাণ্ড ছিল ধ্বংসের। পথ দেখাল উত্তর কোরিয়া। তার প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা হুমকি দিল দক্ষিণ কোরিয়াও। কাকতালীয়ভাবে গত সপ্তাহেই পাকিস্তানের অতি মাত্রায় পরমাণু-প্রীতির কথাও জানাল ওয়াশিংটন।
জানুয়ারিতে হুমকি দিয়েছিল উত্তর কোরিয়া— আবার তারা পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাবে। কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখতে তারা দুই সপ্তাহের বেশি অপেক্ষা করেনি। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের পরমাণু বিস্ফোরণ প্রসঙ্গে উত্তর কোরিয়ার জাতীয় সংবাদ সংস্থা ‘কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি’ (কেসিএনএ) জানিয়েছে, গত তিনটি পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের মধ্যে এ বারের অস্ত্রটিই সবচেয়ে ছোট, হাল্কা ও বিধ্বংসী। ইতিমধ্যেই উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রাগারে থাকা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে পিয়ংইয়ং সহজেই নিশানা করতে পারবে শত্রুদের।
এ বিস্ফোরণের প্রথম আঁচ পায় দক্ষিণ কোরিয়া, মাটির কম্পনে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের যন্ত্রে ধরা পড়ে রিখটার স্কেলে সে কম্পনের তীব্রতা ৪ দশমিক ৯। অচিরেই বুঝতে পারা যায়, সে কম্পন মানুষের হাতে তৈরি। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সারা বিশ্ব বুঝতে পারে, কিলজুর মাটির তলায় গোপন কেন্দ্রে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে পিয়ংইয়ং। এই নিয়ে তিন বার।
পিয়ংইয়ং থেকে কম্পনের রাজনৈতিক অভিঘাত এসে পৌঁছেছে ওয়াশিংটনেও। কেসিএনএ-র এই দাবিকে মোটেই হাল্কাভাবে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। কেননা, ৫০-এর দশকে কোরিয়া যুদ্ধের পর উত্তর কোরিয়া আমেরিকাকেই নিজেদের এক নম্বর শত্রু মনে করে। এর আগে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উেক্ষপণের পর পিয়ংইয়ং জানিয়েছিল, তাদের এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লায় এবার ওয়াশিংটনও চলে এল। ফলে মঙ্গলবারের পরীক্ষার পর কেসিএনএ যে ‘শত্রুদের টার্গেট’ করার কথা বলেছে তা যে আমেরিকাকে লক্ষ্য করেই, বুঝতে দেরি হয়নি ওবামা প্রশাসনের।
তবে শুধু আমেরিকাই নয়, বিরক্ত উত্তর কোরিয়ার অন্যতম বন্ধু চীনও। এর আগে উপগ্রহ কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ থেকে পরমাণু গবেষণা— সব ক্ষেত্রেই সারা বিশ্ব যখন উত্তর কোরিয়ার বিরোধিতা করেছিল, একমাত্র চীনই ছিল কিং জং উনের পাশে। বেইজিং জানিয়েছে, এর ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চড়বে অস্বস্তির পারদ। জাপান থেকে চীন, ফ্রান্স থেকে ব্রিটেন, আমেরিকা থেকে রাশিয়া— বলা যায় সমালোচনায় সামিল সকলেই। এমন একটি পদক্ষেপের জন্য কিম জং উন সরকারের নিন্দা করেছে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)।
উত্তর কোরিয়ার এ বিস্ফোরণের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে কোরিয়া প্রসঙ্গে ওবামা প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বললেন, ‘এই পরীক্ষার ফলে আন্তর্জাতিক মহলে উত্তর কোরিয়া আরো কোণঠাসা হয়ে পড়বে। তাদের কার্যকলাপে বিশ্বশান্তি বিঘ্নিত হলে, আমেরিকা চুপ থাকবে না।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তৃতার কিছু সময় আগে জাতিসংঘের তরফে নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। সেখানে বলা হয়, এই বিস্ফোরণ একটা সতর্কবার্তা। এর ফলে গোটা দুনিয়ায় অস্থিরতা বাড়বে।
পরমাণু পরীক্ষায় তৈরি অস্থিরতার ইঙ্গিত পেতে খুব বেশি দেরি হয়নি বিশ্ববাসীর। উত্তর কোরিয়ার পরীক্ষার পরদিন ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ করে উত্তর কোরিয়াকে সরাসরি হুমকি দেয় দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে, ৮০০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে এমন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তাড়াতাড়িই তৈরি করে ফেলবে তারা, যার পাল্লায় পড়বে গোটা উত্তর কোরিয়া। শুধু ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উদ্যোগই নয়, সেনা সতর্কতাও জারি করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা সম্পর্কে মুখ না খুললেও তার লক্ষ্য কে তা জানাতে ভুলেনি সিউল প্রশাসন। ক্ষেপণাস্ত্রটির পরীক্ষার একটি ভিডিও-ও প্রকাশ করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তাতে বিশদে দেখানো হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্রটির শক্তি। কেমন করে নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি, ভিডিওটিতে দেখানো হয়েছে তা-ও। পরীক্ষার সাফল্যে উত্ফুল্ল প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মুখপাত্র কিম মিন-সিওক জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়ার যে কোনো প্রান্তে পৌঁছনোর মতো শক্তি রয়েছে এটির। তার কথায় ‘নিখুঁত লক্ষ্যে উত্তর কোরিয়ার নেতাদের অফিসে আক্রমণ চালানো যাবে ক্ষেপণাস্ত্রটি দিয়ে।’ গত এক মাসে পর পর ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উেক্ষপণ করেছে পিয়ংইয়ং। তাই চাপ কাটাতেই এ বার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে সিউল পাল্টা হুমকি দিতে চাইল বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল। তবে এটাও শোনা যাচ্ছে, এপ্রিল থেকেই নাকি এই ক্ষেপণাস্ত্রটির পরীক্ষা চালাচ্ছিল তারা। সেটারই তড়িঘড়ি উেক্ষপণ করা হয়েছে।
১৯৫০-’৫৩ সালের দুই কোরিয়ার যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে এখনো শেষ হয়নি। দুই পক্ষই অস্ত্র সংবরণ করে রয়েছে মাত্র। সীমা লঙ্ঘন করে যাতে পিয়ংইয়াংয়ের বাহিনী না হানা দিতে পারে দক্ষিণ দিকে তার জন্য অন্তত ৩০ হাজার মার্কিন সৈন্য এখনো রয়েছে কোরীয় উপদ্বীপে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল এর আগে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল উত্তর কোরিয়ার ওপর। কয়েক মাস আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২ লাখ ৪০ হাজার টন খাদ্য সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয় উত্তর কোরিয়া কেবল ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের জন্য; কিন্তু তবুও থামেনি কিম-এর ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের নেশা। মার্কিন পরমাণু বিজ্ঞানী সিগফ্রিড হেকার জানিয়েছেন, অভিজ্ঞতা আর উপগ্রহ ছবির বিশ্লেষণ করে তিনি দেখেছেন গত কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় জ্বালানির ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে কোরিয়া। সিগফ্রিডের হিসেব বলছে, দেশে যে পরিমাণ প্লুটোনিয়াম রয়েছে, তাতে অন্তত চার থেকে আটটি শক্তিশালী বোমা তৈরি করা সম্ভব।
এদিকে গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, নিজেদের উন্নতি ঘটানোর চেয়েও পরমাণু অস্ত্র ভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ করাই মূল উদ্দেশ্য পাকিস্তানের। মার্কিন আইন প্রনেতাদের সঙ্গে এক আলোচনায় এমনই কথা জানান আমেরিকার ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সি’র গবেষক ফ্র্যাঙ্ক হফম্যান। তিনি জানান, এই মুহূর্তে ভারতের অর্থনীতি পাকিস্তানের অর্থনীতির চেয়ে অন্তত ১৬ গুণ বড়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে ভারতীয় লগ্নির পরিমাণও বাড়ছে প্রতিদিন। ফলে, এই দেশগুলিতে বাড়ছে ভারতের প্রভাবও। এতেই শঙ্কা বাড়ছে পাকিস্তানের। দেশেব সাধারণ মানুষের কাছে তাই ক্রমাগত ভারতবিরোধী মন্তব্য করে তাদের উত্তেজিত করে পাকিস্তানের ক্রমশ ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি ও অন্যান্য অবস্থা থেকে পাক জনগণের নজর ঘুরিয়ে রাখতে চায় জারদারির সরকার। অর্থনৈতিক ও অন্যান্য একাধিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করলে করাচিসহ পাকিস্তানের দক্ষিণ দিকের একাধিক শহরের চেহারাই বদলে যেত। অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি করে ফেলতে পারত তারা; কিন্তু সে পথে না হেঁটে কেবল পরমাণু অস্ত্র ছাড়া অন্য কিছু আর ভাবতেই পারছে না পাকিস্তান।