অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর নতুন সম্ভাবনা

অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর নতুন সম্ভাবনা দেখছে ইউরোপ ও আমেরিকা। আর তা হলো ট্রান্স-আটলান্টিক ফ্রি ট্রেড জোট গঠন। সোজা কথায় আটলান্টিক মহাসাগরের এ পারের সাথে ওপারের একটা যৌথ ও নিবিড় অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হতে যাচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রতিনিধি সভায় ‘স্টেট অব ইউনিয়ন’ ভাষণে অনেকটা আকস্মিকভাবেই এ ব্যাপারে আলোচনা শুরুর ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ধারণা করা হচ্ছে, এ দুই অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে আলোচনা সফল হলে দুই এলাকা হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবাধ বাণিজ্য অঞ্চল। বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরোর বাণিজ্য হবে। তৈরি হবে কয়েক লাখ কর্মসংস্থান। এমনটাই স্বপ্ন দেখছে ইউরোপ। তাই আমেরিকার প্রস্তাবকে বড় সুযোগ হিসেবে দেখে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ২০০৯ সালের শুরু থেকেই চরম আর্থিক সংকটে পড়ে গ্রিস, ইতালিসহ ইউরোজোনের ১৭টি দেশ। এরপর থেকে আর কোন অর্থবছরেই আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি তারা। সর্বশেষ গেলো বছরেও ইউরোজোনের এক শতাংশ প্রবৃদ্ধিও অর্জিত হয়নি। উল্টো তা নেমে আসে ঋণাত্মকের কোঠায়। ২০১২’র শেষ তিনমাসে ঐ ১৭ জাতির প্রবৃদ্ধি মাইনাস শূন্য দশমিক ছয় শতাংশ। মন্দার পর থেকেই ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে ইউরোজোনের। নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করতে থাকে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠান। লোকসান এড়াতে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই বেছে নেয় চাকরি ছাটাইয়ের পথ। বাড়তে থাকে বেকারত্ব। অন্যদিকে, সরকারও প্রণোদনা বরাদ্দ দিয়ে কোন মতে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে দেশের প্রধান প্রধান শিল্প ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। পর্যাপ্ত প্রণোদনা অর্থ যোগাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফের শরণাপন্ন হয় তারা। কিন্তু মন্দাগ্রস্ত দেশগুলোকে ঋণ দিতে ব্যয় সংকোচনের কঠিন শর্ত আরোপ করে ইইউ ও আইএমএফ। এতে বাধ সাধে সাধারণ জনগণ। আন্দোলন ও সহিংস বিক্ষোভের মুখে গ্রিস ও ইতালিসহ কয়েকটি দেশে সরকার পরিবর্তনও হয় কয়েক দফায়। এই হচ্ছে, ইউরোপের নাজুক অর্থনীতির চক্র। আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থাও ইউরোপের প্রায় কাছাকাছি। ২০১২ সালের শেষ তিনমাসে এ দেশেরও মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসে শূন্যেরও নিচে। উল্লেখ্য, সময়ে আমেরিকার জিডিপি মাইনাস শূন্য দশমিক এক শতাংশ। অর্থাত্ ইউরোজোনের মতো এ দেশটিও এখন রপ্তানির চেয়ে বেশি আমদানি নির্ভর। এ অবস্থায় দুই অঞ্চলের মধ্যে অবাধ বাণিজ্য চুক্তি হলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট বিপ্লব হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জোসে ম্যানুয়েল বারোসো গত বুধবার ব্রাসেলসে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন উচ্চাশা ব্যক্ত করে বলেন, চুক্তি হলে তারা গড়ে তুলবেন বিশ্বের সর্ববৃহত্ শুল্কমুক্ত উদার বাণিজ্য অঞ্চল। শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষির বিভিন্ন খাত নির্দিষ্টকরণ এবং এসব খাতে দু’পক্ষের সংকট ও সম্ভাবনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে ইউএস ও ইইউ ওয়ার্কিং গ্রুপ। খোলামেলা ও বিস্তারিত আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে যৌথ বাজার ব্যবস্থাপনা, আমদানি শুল্কসহ অন্যান্য বাণিজ্য বাধা অপসারণ ইত্যাদি। তবে কয়েকটি খাত আলোচনার বাইরেই থেকে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ইউরোপ কখনোই যুক্তরাষ্ট্রে উত্পাদিত শস্য বা সেদেশের পশুর মাংস আমদানি করতে চাইবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে যুক্তরাষ্ট্র একটি মডেল। ইউনাইটেড স্টেটসের মতো ইউরোপকে ইউনাইটেড করা যায় কি-না, এমন ধারণা নিয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিভিন্ন ধাপে গঠিত হয়েছে আজকের এই ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সেই মডেল দেশই এখন অর্থনৈতিকভাবে জোটবদ্ধ হতে যাচ্ছে ইইউ-এর সাথে। অর্থনীতিতে দু’পক্ষের নানা সংকট-সম্ভাবনার পাশাপাশি রাজনৈতিক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ও এড়াচ্ছে না যৌথ আলোচনায়। তাই বাকি বিশ্বে আমেরিকা ও ইউরোপেরই দাপট দেখা যাবে অদূর ভবিষ্যতে- এমন ধারণাই বা অত্যুক্তি কিসে!