আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (সংশোধন) বিল পাস

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের যে কোন রায়ের বিরুদ্ধে সরকার, বাদী এবং বিবাদীর আপিলের সমান সুযোগ রেখে গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধনী) বিল-২০১৩ পাস হয়েছে। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এ সময় সংসদে উপস্থিত সকল সংসদ সদস্য টেবিল চাপড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা তখন সংসদে উপস্থিত ছিলেন। তরুণ প্রজন্মের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে উত্থাপিত প্রধান দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাস হয়। পাস হওয়া সংশোধিত আইনটিকে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা (retrospective effect) দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে তা কার্যকর হবে। একই সঙ্গে এই বিলে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত যে কোন সংগঠনকেও বিচারের আওতায় আনার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস (সংশোধনী) বিল ২০১৩ পাস হওয়ার পর এই ট্রাইব্যুনালের যে কোন রায়ের বিরুদ্ধে সরকার, বাদী এবং বিবাদী পক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবে। তবে গত বুধবার বিলটি সংসদে উত্থাপনের সময় বলা হয়েছিল যে, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার, দণ্ডিত ব্যক্তি ও যে কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আপিল করতে পারবে। পরে বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হলে তারা আপিলের বিষয়ে কিছু সুপারিশের কথা উল্লেখ করে। তাদের সুপারিশে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আপিল করার ক্ষমতা বাদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। এছাড়া বিলটিতে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করার কথা বলা হয়েছে। বিলটি পাস হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে চলতি সপ্তাহেই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার সম্ভাবনা রয়েছে। বিলটি পাস হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীসহ মহাজোটের সকল সংসদ সদস্য প্রায় এক মিনিট টেবিল চাপড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে বিকাল সাড়ে ৪টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। বিএনপি-জামায়াতের সংসদ সদস্যরা ছাড়া মহাজোটের প্রায় সব সংসদ সদস্য অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বিলের ৩ ধারায় দুটি সংশোধনী এনে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠন হিসেবে জামায়াতেরও বিচারের প্রস্তাব দিলে মহাজোটের সকল সংসদ সদস্য টেবিল চাপড়িয়ে তাতে সমর্থন জানান। পাস হওয়া বিলের ২১ (২) উপধারায় বলা হয়েছে, সরকার অথবা বাদী বা বিবাদী পক্ষ ট্রাইব্যুনালের রায়ের খালাস কিংবা যে কোনো দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবে। এছাড়া ২১ (৫) উপধারা অনুযায়ী, আপিল করার সময় আপিলকারীকে তার সপক্ষের সমুদয় দলিল, দস্তাবেজ, ডকুমেন্ট সর্বোচ্চ আদালতে দাখিল করতে হবে। বিলের ২১ (৩) উপধারায় বলা হয়েছে, রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে উভয়পক্ষকে আপিল করতে হবে। বিলের ২১ (৪) উপধারায় আপিল দায়েরের ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে। সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সংসদে পাস হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) আইনটি রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের অনুমোদনের জন্য দ্রুত বঙ্গভবনে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর সেটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে। অপর একটি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইনটির গেজেট হাতে পাওয়ার পরপরই কাদের মোল্লার রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করবে সরকার। একইসঙ্গে সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীসহ যুদ্ধাপরাধের সাথে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন অন্যান্য দলকেও বিচারের আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু করা হবে। উল্লেখ্য, গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আবদুল কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ৬টি অভিযোগের একটিতে তাকে খালাস দেয়া হয়। ওই রায় ঘোষণার দিন থেকেই কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে শাহবাগসহ সারাদেশে দেশের তরুণ সমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। স্বল্পতম সময়ে এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সবাই যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে রাজপথে নামলে সরকার বিদ্যমান আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনীর সিদ্ধান্ত নেয়। বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ বিলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব নাগরিককে আইনের সমান আশ্রয় লাভের যে অধিকার দেয়া হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ক্ষেত্রে ২১ (২) ধারায় তা প্রতিফলিত হয়নি। সে জন্য ট্রাইব্যুনালের বিচারের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে আইনে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ কারণে ২১ ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির আপিলের জন্য ২১ (১) উপধারায় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন প্রণীত হয়। এ আইনের অধীনে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ২০১০ সালে শুরু হয়। উল্লেখ্য, সংসদে অনুপস্থিত থাকলেও ইতোপূর্বে সংসদে উত্থাপিত প্রায় প্রতিটি বিলেরই বিরোধিতা করে বিএনপি-জামায়াতের একাধিক সংসদ সদস্য জনমত যাচাই-বাছাই ও সংশোধনী প্রস্তাব দিয়েছিল। রবিবার সংসদে পাস হওয়া ওয়াকফ (সম্পত্তি হস্তান্তর ও উন্নয়ন) বিশেষ বিধান বিলেও বিএনপির ১২ জন্য সংসদ সদস্য জনমত যাচাই-বাছাই ও সংশোধনীর প্রস্তাব দেয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে পাস হওয়া আলোচিত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) বিলে বিএনপির কোন সংসদ সদস্য বিরোধিতা করে কোন জনমত যাচাই-বাছাই বা সংশোধনী প্রস্তাব আনেননি। ওয়াকফ সম্পত্তি বিশেষ বিধান বিল পাস আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) বিল ছাড়াও গতকাল জাতীয় সংসদে ওয়াকফ (সম্পত্তি হস্তান্তর ও উন্নয়ন) বিশেষ বিধান বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. শাহজাহান মিয়া বিলটি পাসের জন্য প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিলটি পাসের ফলে ওয়াকফ সম্পত্তির অপদখল হ্রাস পাবে, হস্তান্তরের পদ্ধতি অধিকতর স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে এবং আধুনিক ও উন্নততর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যাপক উন্নয়ন সাধন ও আয় বর্ধণ সম্ভব হবে।