চাঁদপুর ও সাভারে দুই গৃহবধূকে পুড়িয়ে হত্যা!

শরীরের ৯২ ভাগ পোড়া নিয়ে গত তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা গেলেন দীপিকা আচার্য্য নামে এক গৃহবধূ। অভিযোগ মতে যৌতুকের দাবিতে গত ৩০ এপ্রিল চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে দীপিকার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয় তার স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এদিকে দীপিকার শরীরে আগুন দেওয়ার দুইদিন পর সাভারে এ ধরনের আরো একটি ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার বিকালে সাভার পৌরসভার কর্ণপাড়ায় স্বামীর বাড়িতে আফরোজা নামে আরেক গৃহবধূর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দগ্ধ আফরোজাকে ভর্তি করা হয় সাভার এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। শুক্রবার ভোরে তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার বিকালে রংপুরের মিঠাপুকুরের যাদবপুর গ্রামে স্বামী ওয়াসিম মিয়ার বাড়িতে গৃহবধূ তন্নী আক্তারের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দগ্ধ তন্নী রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। এসব ঘটনায় পুলিশ আফরোজার স্বামী নূরে আলম, দীপিকা আচার্য্যের স্বামী বিপুল আচার্য্য, ভাসুর সজল আচার্য্য, শাশুড়ি সন্ধ্যা রানী আচার্য্য এবং তন্নীর স্বামী ওয়াসিম মিয়াকে গ্রেফতার করেছে।

তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রাণ হারান গৃহবধূ দীপিকা আচার্য্য মনিকা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। চিকিত্সাধীন অবস্থায় দীপিকা পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি পাষণ্ড স্বামী ও তার পরিবারের নির্মমতার কথা বলেন। স্বামী বিপুল আচার্য্যের দেওয়া আগুনে পুড়ে যায়     তার শরীরের ৯২ ভাগ। দশ বছর পূর্বে পারিবারিকভাবে বিপুলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তার বাবার বাড়ি নরসিংদী জেলার মাধবদী পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডে। তাদের তিন বছরের এক কন্যা সন্তান রয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে হাজীগঞ্জ থানায় মামলা করেন গৃহবধূর ভাই অরবিন্দ আচার্য্য। অভিযোগে বলা হয়, গত ৩০ এপ্রিল দিবাগত রাতে স্বামী বিপুল আচার্য্য ও ভাসুর সজল আচার্য্য কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে দীপিকাকে হত্যার চেষ্টা করে। এই ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে দুর্ঘটনা বলে প্রচার করা হয়।

অরবিন্দ বলেন, মোবাইল ফোনে বোনের দুর্ঘটনার খবর শুনে ঢাকা মেডিক্যাল বার্ন ইউনিটে গিয়েছি। সেখানে দীপিকা জবানবন্দিতে বলেছেন, ‘মারধর করে তাকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় তার স্বামী ও ভাসুর।’ আগুন লাগানোর পূর্বে তাকে মেরে ফেলার জন্য মারধর করেছে। তার মাথা ও কপাল ফেটে গেছে। যে কক্ষে দীপিকাকে নির্যাতন করা হয়েছে, ওই কক্ষের দেয়ালে রক্তের দাগ রয়েছে।

অরবিন্দ আরো বলেন, ‘দীপিকার স্বামী বিপুল মাদকাসক্ত। তাদের পরিবারে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকতো। সে ঘরে বসেই ইয়াবা সেবন করতো। সজল ও বিপুলদের মূল্যবান একটি জায়গা আছে। কয়েক মাস যাবত্ ওই জায়গা বিক্রয়ের চেষ্টা করে আসছে সজল ও বিপুল। দীপিকা ওই জায়গা বিক্রিতে বাধা দিয়ে আসছিল। এছাড়া তাদের পারিবারিক কলহ ছিল দীর্ঘদিনের।’ শুক্রবার দুপুরে তার স্বামী, শাশুড়ি ও ভাসুরকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।

হাজীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আলমগীর হোসেন রনি আরো বলেন, সজলের স্ত্রী দীপা আচার্য্যকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। দীপিকার তিন বছরের সন্তানকে নিয়ে সে পালিয়ে গেছে।

সাভারে পুড়িয়ে গৃহবধূকে হত্যার অভিযোগ

সাভারে পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে এক গৃহবধূকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ এনে সাভার মডেল থানায় ৫ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করা হলে পুলিশ নিহতের স্বামী নুরে আলমকে গ্রেফতার করেছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকালে সাভার পৌর এলাকার কর্ণপাড়া মহল্লায় স্বামীর বাড়িতে অগ্নিদগ্ধ হন গৃহবধূ আফরোজা আক্তার ওরফে হাসিনা (৩৫)। এ সময় স্থানীয়দের সহায়তায় পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে নিবির পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিত্সাধীন অবস্থায় গতকাল শুক্রবার ভোরে তার মৃত্যু হয়। নিহত গৃহবধূ আফরোজা মানিকগঞ্জ জেলার সদর থানার পুটাইল গ্রামের আব্দুল জলিলের মেয়ে। সে স্বামী নুরে আলমের সাথে সাভারের কর্ণপাড়া এলাকায় শ্বশুর বাড়িতে থাকত। সিফাত নামের ওই দম্পতির দশ বছরের একটি ছেলে রয়েছে।

সাভার এনাম মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের চিকিত্সক ডা. রিজাউল হক বলেন, বৃহস্পতিবার বিকালে আফরোজা নামে এক নারী ৯৫ শতাংশ দগ্ধ অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি হন। সেখানে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ২৪ ঘণ্টা না হতেই শুক্রবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত আফরোজার মা রাফেজা বেগম জানান, প্রায় ১৩ বছর আগে পারিবারিকভাবেই কর্ণপাড়া এলাকার নুরে আলমের সাথে তার মেয়ের বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পর তারা জানতে পারে নুরে আলম মাদকাসক্ত। বিয়ের পর তার মেয়ে নুরে আলমকে নেশা করতে বাঁধা দিলে তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। নেশা করার প্রতিবাদ করায় আফরোজা ও  তার শাশুড়ির মধ্যে বাকবিতণ্ডা হতো। এ নিয়ে স্বামী এবং শাশুড়ি মিলে আমার মেয়েকে মারধরসহ নানাভাবে নির্যাতন করত। তিনি অভিযোগ করেন, স্বামী নুরে আলম ও তার পরিবারের লোকজন পরিকল্পিতভাবে তার মেয়ে আফরোজাকে হত্যার উদ্দেশে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। 

অপর দিকে, নিহতের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের দাবি, আফরোজার স্বামী নুরে আলম আড়াই বছর ধরে অসুস্থ। ঘটনার সময় সে দ্বিতীয় তলা বাড়ির নিচ তলায় মায়ের কক্ষে অবস্থান করছিল। আফরোজার চিত্কার শুনে পরিবার ও প্রতিবেশীরা ছুটে এসে দেখে দ্বিতীয় তলার বারান্দায় সারা শরীরে আগুন নিয়ে আফরোজা চিত্কার করছে। এসময় দ্রুত তার শরীরের আগুন নিভিয়ে উদ্ধার করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।  

সাভার মডেল থানার ওসি এএফএম সায়েদ বলেন, গৃহবধূর মরদেহটি ময়না তদন্তের জন্য রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

মিঠাপুকুরে গৃহবধূকে হত্যার চেষ্টা

মিঠাপুকুর (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, যৌতুকের টাকা না দেওয়ায় গৃহবধূ তন্নী আক্তারের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়েছে স্বামী ওয়াসিম মিয়া ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। প্রায় শতভাগ পোড়া শরীর নিয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মৃত্যুর সাথে লড়ছেন ওই গৃহবধূ। এ ঘটনায় গতকাল শুক্রবার সকালে ওয়াসিমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, উপজেলার কাফ্রিখাল ইউনিয়নের খোর্দ্দ মহদীপুর যাদবপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে তন্নীকে নির্যাতন করে আসছে স্বামী ও শ্বশুড়বাড়ির লোকজন। সম্প্রতি, বাবার বাড়ি থেকে এক লাখ টাকা আনতে চাপ দেয় তন্নীকে। কিন্তু গরিব বাবার সংসার থেকে টাকা আনতে অস্বীকৃতি জানালে বৃহস্পতিবার বিকালে তন্নীকে বেধড়ক মারপিট করা হয়। এরপর তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয় স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন। এ ঘটনায় ওই গৃহবধূর চাচা আবদুল মতিন মিঠাপুকুর থানায় মামলা করেছেন।