বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দশ বছর সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন গত এক বছর দুই মাস। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিজন সেলে চিকিত্সাধীন আছেন। তাকে কারাগার থেকে এখনি বেরুতে গেলে অন্তত: চারটি মামলায় জামিন পেতে হবে। তার জামিন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কিছুদিন ধরে আলোচনা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে শর্ত সাপেক্ষ তার প্যারোলে জামিনের ব্যাপারে আগ্রহ দেখানোর পর বেগম জিয়া প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে উন্নত চিকিত্সা করাতে সম্মত হননি। অত:পর দলের ৫ জন সংসদ সদস্য শপথ নিয়ে সংসদে গিয়ে তার জামিনের বাধা অপসারণের দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তারা লিখিতভাবেও আবেদন করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির ৫ এমপির শপথ গ্রহণের পর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে, বেগম জিয়ার জামিনে মুক্তির শর্তে এটা করা হয়েছে। তবে এই শর্ত সাপেক্ষ বিএনপি সংসদে গেছে এমন কথা প্রকাশ্যে অস্বীকার করছেন বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসাবে সংসদে গেছেন।
দুই দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে গিয়ে সেখানকার আওয়ামীলীগ নেতাদের উদ্দেশ্যে ফোনে দেয়া বক্তব্যে বেগম জিয়ার জামিনের প্রসঙ্গটি উঠে আসে। খালেদা জিয়ার চিকিত্সা ও জামিন নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে বিএনপিতে চলছে তোলপাড়। ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে এই ফোনালাপ। বিএনপির নেতারা গতকাল এনিয়ে নানা রকম বক্তব্য দিয়েছেন।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়া প্যারোলে সম্মত নন। আমরা তার জামিন চাই। খালেদা জিয়াও বলেছেন তার মামলা জামিনযোগ্য সাধারণ মামলা। সরকার জামিনে হস্তক্ষেপ না করলে এমনিতেই জামিন হয়ে যাবে। কিন্তু সরকার বাধা দিচ্ছে জামিনে।
এদিকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, বেগম খালেদা জিয়া কোনো দিন আপোষ করবেন না। তিনি তার জামিন বা মুক্তির জন্য তার ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করবেন না। প্যারোলের তো প্রশ্নই আসে না।
চার মামলায় জামিন পেলে মিলবে কারামুক্তি
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারামুক্তি পেতে হলে চারটি মামলায় জামিন পেতে হবে। ওই চারটি মামলার মধ্যে দুটি দুর্নীতির মামলা রয়েছে। যে দুটি মামলায় তিনি ১৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত। অন্য দুটি মামলা মানহানির অভিযোগে দায়েরকৃত। এদিকে অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা ৫ বছরের পরিবর্তে ১০ বছর বৃদ্ধি করে রায় দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। আপিলে তার জামিন চাওয়া হয়েছে। যদিও ওই আপিল শুনানির জন্য এখনো আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে উত্থাপন করা হয়নি। তবে বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল জানান, যথা শিগগিরই জামিন আবেদনটি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে পেশ করা হবে। তিনি বলেন, বিএনপির এমপিদের সংসদে যোগ দেয়া ও খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে মানুষের মধ্যে যে গুঞ্জন রয়েছে তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাত বছরের সাজার বিরুদ্ধে আপিল শুনানির জন্য ৩০ এপ্রিল গ্রহণ করেছে হাইকোর্ট। ওই আপিলে তিনি জামিন চেয়েছেন। হাইকোর্ট জামিন না দিয়ে মামলার নিম্ন আদালতের নথি তলব করেছে। হাইকোর্ট বলে, যেহেতু অন্য মামলায় সাজা বৃদ্ধি হয়েছে এবং সেটাতে জামিন নাই এ কারণে এ মামলায় জামিন আবেদন শুনানির এখন আর্জেন্সি দেখছি না। আমরা সাত বছরের মামলায় সবসময় জামিন যে দেই না তা তো নয়। আগে রেকর্ড আসুক তখন জামিনের বিষয়টি দেখব।
আইনজীবীরা মনে করছেন, অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় নিম্ন আদালতের নথি আসার পর হাইকোর্ট খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছিল। তেমনি এ মামলার নথি পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালত তার জামিনের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
এই দুটি মামলা ছাড়াও আরো দুটি মানহানির মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। তবে গ্রেফতারি পরোয়ানা সংক্রান্ত তামিল প্রতিবেদন না আসায় জামিন আবেদনের শুনানি করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নানা কারণে সরকার অস্বস্তিতে ছিল। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদে যোগ দেওয়ায় সরকারের সেই অস্বস্তি অনেকটাই দূর হয়েছে। এখন দেশে যাতে স্বস্তির পরিবেশ বজায় থাকে সেজন্য সরকার সেই চেষ্টা করবে বলে আমার মনে হয়।
প্রসঙ্গত খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহ, হত্যা, নাশকতা ও মানহানির মামলা উল্লেখযোগ্য।