যুদ্ধাপরাধ এবং তারুণ্য :জাতি কি জাগবে না?
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:০৪
প্রাণপণে সরাবো জঞ্জাল। কবি সুকান্ত লিখেছিলেন। একটি শিশুর জন্মমুহূর্তের বাঁচার অধিকারের ঘোষণা ছিল কবিতার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। মানুষ মাত্রই যা বলতে পারে, তাই কবি সুকান্ত বলেছিলেন। তিনি প্রাণপণে জঞ্জাল সরাতে চেয়েছিলেন। এখন শাহবাগ স্কয়ারে যা ঘটছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সারা বাংলার গণমানুষের যে চৈতন্য তরুণ প্রজন্মের স্বত:স্ফূর্ত সদাচরণের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাকে একটি শিশুর জন্মমুহূর্তের উচ্চারণের সাথেই তুলনা করা যায়। ধীরে ধীরে তরুণ প্রজন্ম প্রশিক্ষিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তাদেরকে জানানো হয়নি। মহাজোটের এবারকার আওয়ামী নেতৃত্বাধীন সরকারও প্রকৃত ইতিহাস সাধারণ মানুষের সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরতে পারেনি। তরুণ প্রজন্ম নিজ দায়িত্বে ইতিহাস সন্ধান করেছে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের সূত্রপাতের সাথে সাথে। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি ও মিডিয়াতে যেসব আলাপ-আলোচনা হয়েছে তাতে তরুণ প্রজন্ম উত্সাহিত হয়েছে এবং দারুণ উদ্দীপনায় মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সন্ধান করেছে। তারা ভালভাবেই জেনে গেছে যে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সারা বাংলা একাত্ম হয়েছিল। সবাই যার যার মত করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। হিসেব পেয়েছে যে, শতকরা পাঁচ জন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে এবং তার চেয়েও কম সংখ্যক বদলোক রাজাকার আলবদর আলশামস হয়েছে। শান্তি কমিটির সদস্য হয়ে লুটপাটে অংশ নিয়েছে জামাতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের রাজনীতিকরা। লুটপাট করা সম্পত্তি ব্যবহার করে তারা যথেষ্ট ধনবান হয়েছে এবং সমাজে ধনীলোক হিসেবে জীবনযাপন করছে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু না হলে তাদের অপরাধের বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যেত।
তরুণ প্রজন্ম যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছে। তারা তাদের আবেগ-উচ্ছ্বাস প্রকাশের একটা সুযোগ খুঁজছিল। আওয়ামী লীগ তার প্লাটফরম তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু হঠাত্ করেই যেন সুযোগ মিলে গেছে। শাহবাগ স্কয়ারে দেশ প্রেমিকদের মিলন মেলা বসেছে। আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের সবকটি দল সমর্থন দিচ্ছে। বামপন্থি দলগুলোও সমর্থন দিচ্ছে। মনে করা হচ্ছে যে, মুক্তিযুদ্ধের সকল সপক্ষশক্তি এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে সমর্থন দিচ্ছেই শুধু নয়, এই আন্দোলন সৃষ্টির পটভূমিও তারাই তৈরি করেছে। এটি হওয়া খুবই সম্ভব যে, আওয়ামী লীগের গোপন নির্দেশনায় এবং গোপন নেতৃত্বে এরকম একটা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠবে। কিন্তু বিষয়টি আওয়ামী লীগের জন্য সুনামের হবে না। এমনকি তাদের প্রথাসিদ্ধ রাজনৈতিক আচরণের মধ্যেই পড়ে না। অনেকটা সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে গোপন যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মত ঘটনা।
আওয়ামী লীগ সরকারকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাকে এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে নিপতিত হতে হবে কেন? কেন পূর্বাহ্নেই তরুণ সমাজকে উপলব্ধিতে নেয়া হয়নি? কেন এমন জাতীয় প্রচারণা শুধু শাহবাগ কেন্দ্রিক নয়, দেশব্যাপী অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আমিসহ অনেকেই বারবার করে এ বিষয়টি বলেছি। নিছক যুদ্ধাপরাধীর বিচার এবং ফাঁসিই বড় কথা নয়, দেশের মানুষ যেন উপলব্ধি করে যে, দেশে একদিন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, অগণিত মানুষ মারা গিয়েছিল এবং অসংখ্য মীরজাফর পাক হানাদারদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছিল। তারা খুনজখম, লুটতরাজ করেছিল। ঘরে আগুন দিয়েছিল এবং অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জত নষ্ট করেছিল। ট্রাইবুনাল তৈরি হয়েছে, কিন্তু ট্রাইবুনালের চেহারাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন নেই। এমনকি যে আইনে ট্রাইবুনালে বিচার কাজ চলছে সে আইনও ত্রুটিপূর্ণ। বিচার শুরুর আগেই আমি কয়েকটা লেখায় বলেছিলাম আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে যুদ্ধাপরাধীরা দিব্যি বেরিয়ে যাবে। তাদের লেজটাকেও ধরা যাবে না। যুদ্ধাপরাধের বিচার কিংবা মানবতা বিরোধীদের বিচারের জন্য যেমন ধরনের আইনের প্রয়োজন তেমন ধরনের আইন তৈরি করা হয়নি। বেশকিছু আইন বিশেষজ্ঞ সে সময় সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন যে, আইন অত্যন্ত আধুনিক ও যুগোপযোগী হয়েছে। কিন্তু কখনই আইনের দুর্বল দিকগুলো নিয়ে আলোচনায় বসা হয়নি। সব সময়েই আইনের দুর্বলতাগুলি ঢেকে রাখা হয়েছিল।
সে সময়ে অনেক আইন প্রণেতাই এ ধরনের আইনের পক্ষে সাফাই গেয়েছিল। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অনেকেই লিখিতভাবে এবং বিভিন্ন টকশোতে আইনের প্রশংসাই করেছিল। হয় তারা আইনের অন্তর্নিহিত দর্শন বোঝেন না, নতুবা তারা জ্ঞানপাপী। নইলে আইনের এত বড় দুর্বলতা তারা দেখতে পাননি কেন। শুধু শব্দের পর শব্দ বসালেই আইন হয় না। আইনকে জীবন দিতে হয়, প্রাণবন্ত করত হয়। আর যুদ্ধাপরাধীর বিচারের আইন কখনই প্রচলিত আইন অনুযায়ী হয় না। এটিকে হতে হয় আবিষ্কারধর্মী এবং মানসধর্মানুসারী। মানসধর্মানুসারীরা কখনই সাবজেকটিভ নয়। তথাকথিত আইনবেত্তারা অবজেকটিভ করতে গিয়ে মূল জাতীয় মানস পরিপন্থী আইন তৈরি করেছে। এদের মধ্যে অনেকেই আইনবিদ হিসেবে মারাত্মক অহংকারী। তারা তাদের প্রথাসিদ্ধ আইনের চশমা চোখে লাগিয়ে তাদের প্রণীত আইনকে দেখেছেন এবং তাদের ভালোও লেগেছে। এমনটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। যারা তিরিশ-চল্লিশ বছর ধরে যে জাতীয় আইন নিয়ে ন্যায়ান্যায় করেছেন তারা সেই আইনের সামাজিক দর্শনের বাইরে যেতে পারবেন না। তাদের রক্তেমাংসে, বোধে ও ভাবে, তাদের জীবনাচরণে ঐ আইনের ফ্লেভার থাকবেই। কার্যত হয়েছেও তাই। এটি তাদের আবিষ্কারধর্মিতা না থাকার কারণেই সম্ভবত। তবে বাজারে যে কথা উঠেছে যে, অনেক টাকার বিনিময়ে ট্রাইবুনালের আইন ও রায়কে ইচ্ছামত গতিপথ পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটাও মিথ্যে নাও হতে পারে। ঘটনা যাই হোক না কেন, শেখ হাসিনাকেই দায়-দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনীর ব্যবস্থা করতে হবে এবং আইনে একটি বিশেষ অপশন রাখতে হবে যেন ভবিষ্যতের আইনকে জাতীয় মানসের সাথে সঙ্গতি রেখে সংশোধন করা যায়। সময় নেইই বলা যায়। তবে একটি নিঃশ্বাস নেয়ার সময় আছে।
তরুণ প্রজন্ম জেগেছে। যে আন্দোলন স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছে বাংলাদেশের সবখানে তার সাথেই থাকতে হবে আওয়ামী লীগকে। যদি তারা ব্যর্থ হয় তবে দেশবাসী আওয়ামী ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে নেবে। আওয়ামী লীগের ভেটেরানেরা অনেকেই যথেষ্ট অহংকারী এবং আত্মম্ভরী। তাদের অহংকার ও আত্মম্ভরিতার কারণে তারা অনেকেই গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এবার যদি তরুণ প্রজন্মের উদ্যম ও ঐকান্তিকতার সাথে একাত্ম হয়ে তাদের গণবিচ্ছিন্নতা কমাতে পারে তবে এই আন্দোলনই তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেবে। সারা বাংলায় শহরে-গ্রামে একই জাতীয় ‘দাবিময়’ আন্দোলন তৈরি করা এখন তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব। তরুণদের আন্দোলন যথেষ্ট এলাস্টিক। নেতৃত্ব ইচ্ছা করলেই তিন প্রজন্মকে একসূত্রে গেঁথে ফেলতে পারে। যদি নবীন মানসকে ঠিকমত এ্যাড্রেস করতে ব্যর্থ হয় তবে আগামী নির্বাচনে তার কুফল পড়বেই। তাই যথেষ্ট সাহস ও বুদ্ধিমত্তার সাথে শাহবাগ স্কয়ারকে দেশময় করতে হবে। বুঝতে হবে যে, তরুণ প্রজন্ম ক্ষেপে গেলে রক্ষা নেই।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক