স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল

দিন যতই গড়াচ্ছে আন্দোলনের তীব্রতা ততই বাড়ছে। শাহবাগ আন্দোলনের গণজাগরণ মঞ্চের ডাক ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। শাহবাগের স্ফূলিঙ্গ এখন রীতিমত দাবানল। গণজাগরণ মঞ্চ সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নিচ্ছে এ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। ইতিমধ্যেই প্রতিটি জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছে গণজাগরণ মঞ্চ। সেইসব মঞ্চের সঙ্গে মূল মঞ্চের সমন্বয় সাধনের জন্যই এ উদ্যোগ বলে জানা গেছে। সংহতি প্রকাশ করতে এসে বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী সংহতি জানিয়ে বলেন, তুষের আগুন থেকে দাবানল জ্বলে উঠেছে। দুই সপ্তাহ ধরে তরুণরা সারাদেশে যে আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়েছে, এটা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমাদের জয় হবেই। তিনি বলেন, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম দেশদ্রোহের মামলা মাথায় নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। শহীদ জননীর সেই অপমানের শোধ এ প্রজন্ম নেবেই নেবে। তারুণ্যের প্রত্যয় দেখে সে বিশ্বাস জন্মেছে। যুদ্ধাপরাধের ফাঁসি ও জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন আন্দোলনের সংগঠকরা। দেশের বিভাগীয় শহর ও জেলাগুলোতে এ মঞ্চ তৈরি করতে ইতিমধ্যে তারা আলোচনা করেছেন এবং নীতিগত সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কী প্রক্রিয়ায় এবং এর রূপরেখা কী হবে, তা এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরতরা। এ প্রসঙ্গে ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহবায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের দাবি দেশের সকল মানুষের দাবি। সব শ্রেণির মানুষ আমাদের আন্দোলন ও দাবির প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জনগণের মধ্যে নতুন করে জাগ্রত হয়েছে, শানিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে গণজাগরণ মঞ্চের আদলে আন্দোলন হচ্ছে। এগুলোকে আরো সুসংহত করতে হবে। এছাড়া বিভাগীয় এবং জেলা শহরে গণজাগরণ মঞ্চ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা বিষয়টি আলোচনা করেছি। সকলের মতামতের ভিত্তিতে এর রূপরেখা তৈরি করা হবে। তিনি আরো বলেন, আন্দোলনটি যদিও আমরা শুরু করেছিলাম তবে এখন এটি জনগণের নিয়ন্ত্রণে। আমরা কয়েকটি ছাত্র-সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠনের সমন্বয়ে সহযোগী ভূমিকা পালন করছি মাত্র। জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি হোসাইন আহমেদ তফছির বলেন, বিভাগীয় এবং জেলা পর্যায়ে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তবে পুরো বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। শিগগিরই এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ঢাবিতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে চিরনিদ্রার দেশে শান্ত যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে শ্লোগানরত অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া কার্টুনিস্ট ও নাট্যপরিচালক তারিকুল ইসলাম শান্তর দ্বিতীয় জানাজা গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। বেলা ১১টায় জানাজা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ট্রেজারার অধ্যাপক কামাল উদ্দিন, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, গাজী রাকায়েত, ঝুনা চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি প্রমুখ জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। এর আগে গত সোমবার সন্ধ্যায় পশ্চিম নাখালপাড়া রেলগেট মসজিদে শান্তর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সোমবার বিকালে প্রজন্ম চত্বরে শ্লোগানরত অবস্থায় হূদরোগে আক্রান্ত হন শান্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। শান্তর জানাজাশেষে তার বড় ভাই শরীফুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন শান্ত। তার নির্মিত কার্টুন, ছড়া, কবিতা, নাটকে এর ছাপ রয়েছে। বছর দুইয়েক আগে তার নির্মিত ‘ঘরে ঘরে দুর্গ’ নামে একটি টেলিফিল্ম টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়েছিল। সেটি পুনঃপ্রচারের মাধ্যমে তার প্রতি সম্মান জানানো যেতে পারে। তিনি জানান, বিকালে বনানী গোরস্থানে শান্তর মরদেহ কবরস্থ করা হবে। শান্তর জন্য সেখানে একটি স্থায়ী কবর নির্মাণের দাবি জানান তিনি। শান্তর বোন ডা. সৈয়দা ফাতেমা আক্তার ছন্দা বলেন, সহজ সরল জীবন যাপন করত শান্ত। যে আন্দোলনে এসে শান্ত আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, তা সফল না হওয়া পর্যন্ত যেন কেউ ঘরে ফিরে না যায়। শান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন বলেন জানান তিনি। অভিনেতা মামুনুর রশিদ বলেন, মৃত্যু খুবই হূদয়বিদারক। মুক্তিযুদ্ধ শান্তর হূদয়ে একটি গভীর জায়গা দখল করেছিল। শান্ত স্লোগান দিতে দিতে মারা গেছেন, এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে। এ গণআন্দোলনে এ পর্যন্ত তিনজনকে হারালাম আমরা। নিঃসন্দেহে তারা সবাই শহীদ। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ব্লগার ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, এই যুদ্ধে আমরা আরও একজন সহযোদ্ধাকে হারালাম। এ শোককে আমরা শক্তিতে পরিণত করছি। আন্দোলনে সফল না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরব না। শান্তর মৃত্যু আমাদের আরও প্রেরণা যোগাবে। ‘হত্যা করে আন্দোলন কেউ দমাতে পারবে না’ আন্দোলনের দিন যতই গড়াচ্ছে বাড়ছে বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠনের সংহতি। গতকাল মঙ্গলবার প্রজন্ম চত্বরে এসে সংহতি প্রকাশ করেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আ ক ম মোজাম্মেল হক, নাট্যকার মামুনুর রশীদ, কৃতী ফুটবলার আরিফ খান জয় প্রমুখ। গতকাল সংহতি জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক বলেন, আমরা এক রাজীবকে হারিয়েছি কিন্তু লাখো কোটি রাজীব ঘরে ঘরে তৈরি হয়েছে। হত্যা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন কেউ দমাতে পারবে না। আ ক ম মোজাম্মেল হক জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। ফুটবলার আরিফ খান জয় বলেন, এই যুদ্ধে আমাদের বিজয় অর্জন করতে হবে। না হলে মরতে হবে। দেশের এই কৃতী ফুটবলার বলেন, চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করে আমরা ঘরে ফিরবো না। ‘জাহানারা ইমাম আমাদের উদ্দীপ্ত করে’ বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছবিটি কয়েকদিন আগে প্রজন্ম চত্বর থেকে নামানো হলেও গতকাল আবার টানানো হয়েছে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, জাহানারা ইমাম আমাদের প্রতিনিয়ত আন্দোলনে উদ্দীপ্ত করে। তার দেখানো পথেই আমরা অগ্রসর হচ্ছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সর্বোচ্চ রায় না নিয়ে আমরা ঘরে ফিরব না। প্রতিবাদের আজ ১৬তম দিন ৭১’র মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ বিচারের শপথ দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম যে যুদ্ধ শুরু করেছিল আজ তা ১৬তম দিনে পা রাখছে। এ আন্দোলনের ঢেউ-এ এখন সারাদেশ আন্দোলিত, উদ্বেলিত। ঐক্যবদ্ধ সারাদেশ। সংহতি প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে দেশের সর্বস্তরের মানুষ। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, মূলত: যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায়ই জাগিয়ে দিয়েছে জাতিকে। কেননা, কাদের মোল্লার এই রায় জাতি কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি। প্রসঙ্গত গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায় তাত্ক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্ক শাহবাগে অবস্থান নেয় এবং যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবি জানায়। এরপর আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। বেলুন উড়বে আজ বিকালে আজ বুধবার বিকাল ৪টায় প্রজন্ম চত্বরে বেলুন ওড়ানোর এক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আন্দোলনরতরা তাদের বিভিন্ন আকাঙ্ক্ষার কথা লিখে বেলুন উড়িয়ে দেবেন। আকাশ জুড়ে তারুণ্যের স্বপ্ন ছড়িয়ে পড়বে নানা বর্ণের, নানা আকারের বেলুনে।