ঘূর্ণিঝড়: এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ

ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন বাতাসের প্রচণ্ড ঘূর্ণির কারণে সৃষ্টি হয়। খুব গরমে বায়ুমণ্ডলে কোনো কোনো স্থানে বায়ুর চাপ কমে গিয়ে হঠাৎ শূন্যতার সৃষ্টি হয় । তখন শূন্যতা পূরণে বাতাস সেই স্থানের দিকে ছুটে আসে। তখনই সৃষ্টি হয় ঘূর্ণির। দক্ষিণ আটলান্টিক ও দক্ষিণ-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর বাদে পৃথিবীর বাদবাকি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সাগরে যে মারাত্মক বায়ুমণ্ডলীয় দুর্যোগ সৃষ্টি হয় তা সাধারণভাবে ঘূর্ণিঝড় হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর সারা পৃথিবীতে গড়ে ৮০টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়।

ভৌগোলিক দিক থেকে বাংলাদেশ আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলের অংশ, যার উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের প্রান্তে রয়েছে অনেকটা চোঙ আকৃতির উপকূলভাগ। বাংলাদেশের এ স্বতন্ত্র ভৌগোলিক অবস্থান মৌসুমিবায়ুর সঙ্গে সঙ্গে সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী, টর্নেডো এবং বন্যাও বয়ে আনে। বঙ্গোপসাগর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য এক আদর্শ ক্ষেত্র।

ঝড় এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভয়ংকর তীব্র বাতাস, ভারি বৃষ্টিপাত আর বজ্র বিদ্যুৎ, সমুদ্রে ফুঁসে উঠা উঁচু ঢেউ-সবমিলে এই হলো ঝড়। যেখানে আঘাত হানে সেখানে পুরো সৃষ্টি ওলটপালট হয়ে যায়। মানুষ, লোকালয়, জীবজন্তু, ফসলি জমি, গাছ-পালা সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে ধ্বংস করে দিয়ে যায়। বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় প্রধানত দুইটি মৌসুমে হয়। এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর-নভেম্বর। অর্থাৎ বর্ষা মৌসুমের আগে ও পরে।

টর্নেডো, কালবৈশাখী আশ্বিনী ঝড় এসবের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় হলো সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক। একটি ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাস ৩০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ে সবসময়ই বাতাসের গতিবেগ থাকে ঘণ্টায় ১১৮ কিলোমিটার এর বেশি এবং তা শক্তিশালী নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে প্রবাহিত হয়। নিম্নচাপ কেন্দ্রে বায়ুর চাপ থাকে ৫০ থেকে ৬০ হেক্সা প্যাসকেল এবং ঝড়ের প্রান্তদেশে এর পরিমাণ আরো বেশি হয়। সাপের মতো কুণ্ডলী পাকানো ঘূর্ণায়মান বাতাস নিম্নচাপের কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হলে সেখানে প্রচণ্ড গতিবেগ সৃষ্টি করে। ঘূর্ণিঝড়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর গাঠনিক চিত্র হলো—এর ‘চোখ’। উপগ্রহ চিত্রগুলোতে এ চোখের গঠন বা আকৃতি আরো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ঘূর্ণিঝড়ের চোখের মতো অংশটি ক্ষুদ্র এবং প্রায় বৃত্তাকার বা কখনো এটি চ্যাপ্টা হয়। এ অঞ্চলের ব্যাস থাকে ৮ থেকে ৫০ কিলোমিটার। চোখে বায়ুর চাপ থাকে সর্বনিম্ন এবং তাপমাত্রা থাকে সর্বোচ্চ। ঘূর্ণিঝড়ের চোখ যত উষ্ণ থাকে ঝড় তত বেশি শক্তিশালী হয়। চোখে বায়ু প্রবাহ থাকে খুবই হালকা। সাধারণত ঘণ্টায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার-এর বেশি নয় এবং মেঘ থাকে না বললেই চলে। এর বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায় চোখটির পরিসীমার বাইরে। ১০-১৫ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় যাকে চোখ-দেয়াল বলা হয়। এখানে বাতাসের বেগ এবং বৃষ্টিপাত সবচেয়ে বেশি।

ঘূর্ণিঝড়গুলো সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি ঘটায় যখন তা বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আঘাত হানে। এর পিছনে কারণগুলো হলো—বিস্তৃত নিম্নসমতল ভূমি, জনসংখ্যার ঘনত্বের উচ্চমাত্রা এবং ঘরবাড়ির দুর্বল নির্মাণ কাঠামো। সর্বাধিক ক্ষয়ক্ষতি হয় খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলসমূহে এবং সমুদ্রতীর থেকে দূরবর্তী দ্বীপসমূহ যেমন ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, মনপুরা, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, নিঝুম দ্বীপ, উড়িরচর ও নতুন জেগে ওঠা দ্বীপসমূহে।

ঘূর্ণিঝড়ের ইংরেজি ‘সাইক্লোন’ যা গ্রিক শব্দ ‘কাইক্লোস’ থেকে এসেছে। কাইক্লোস শব্দের অর্থ কুণ্ডলী পাকানো সাপ। ঘূর্ণিঝড়ের উপগ্রহ চিত্র থেকেই বোঝা যায় কেন এমন নাম দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ-ভারতীয় বিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদ হেনরি পিডিংটন ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত সামুদ্রিক দুর্যোগ বিষয়ক বই ‘দি সেইলরস হর্নবুক ফর দি ল অফ স্টর্মস’ এ প্রথমবারের মতো সাইক্লোন শব্দটি ব্যবহার করেন। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়কে আমেরিকা মহাদেশে ‘হারিকেন’, দূরপ্রাচ্যে ‘টাইফুন’, দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে বলা হয় সাইক্লোন এবং বাংলায় ঘূর্ণিঝড়। বাংলায় এর আরেকটি প্রচলিত নাম ‘তুফান’ যা চীনা শব্দ ‘টাইফুন’ থেকে এসেছে। পাশ্চাত্যে হারিকেনকে মানুষের নামেও চিহ্নিত করা হয়, যেমন: মিচেল, এন্ড্রু, ক্যারল, ডরোথি এবং ইভ। তবে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে এ ধরনের নামকরণ প্রবণতা নেই। বর্তমানে সাইক্লোন শব্দটি হারিকেনধর্মী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় নিম্নচাপকে প্রকাশের জন্যই ব্যবহূত হচ্ছে, বিশেষত যখন তা ভারত মহাসাগর থেকে সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বুঝে এর শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছে। বাতাসের গতিবেগ ৬২ কিলোমিটার/ঘণ্টা পর্যন্ত নিম্নচাপ, বাতাসের গতিবেগ ৬৩-৮৭ কিলোমিটার/ঘণ্টা হলে ঘূর্ণিঝড়; বাতাসের গতিবেগ ৮৮-১১৮ কিলোমিটার/ঘণ্টা হলে তা তীব্র ঘূর্ণিঝড় এবং বাতাসের গতিবেগ ১১৮ কিলোমিটার/ঘণ্টার উপরে হলে তা হারিকেন।

সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে থাকলে এ অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। অধিকাংশ ঘূর্ণিঝড়ের উত্পত্তি ঘটে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে।

ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায় যে, ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ঘণ্টায় ৫৪ কিলোমিটার-এর বেশি গতিসম্পন্ন ১৭৪টি ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছিল। তার মধ্যে জানুয়ারিতে ১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১টি, মার্চে ১টি, এপ্রিলে ৯টি, মে মাসে ৩২টি, জুনে ৬টি, জুলাই মাসে ৮টি, আগস্টে ৪টি, সেপ্টেম্বরে ১৪টি, অক্টোবরে ৩১টি, নভেম্বরে ৪৭টি এবং ডিসেম্বর মাসে ২০টি ঘূর্ণিঝড়ের ঘটনা ঘটে। এ তথ্য থেকে বোঝা যায় মারাত্মক ঘূর্ণিঝড়গুলো প্রধানত প্রাক-বর্ষা মৌসুম (এপ্রিল-মে) এবং বর্ষা-উত্তর সময়ে (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) বেশি ঘটেছে এবং এগুলোই ছিল সবচেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক। তবে ঘূর্ণিঝড়গুলোর সবকটি বাংলাদেশে আঘাত হানে নি।

এদিকে, বাংলাদেশে আঘাত হানা ঝড়গুলোর মধ্যে গত প্রায় সাড়ে ৫শ বছরে ৫৩টি তীব্র ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়েছে। ১৫৮৪ সালে বাকেরগঞ্জ এবং পটুয়াখালী জেলায় আঘাত হানে যে ঘূর্ণিঝড় তা পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী ছিল। উঁচু স্থানে থাকা মন্দির ছাড়া সবকিছু তলিয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। সাম্প্রতিককালে ১৯৭০ সালের গোর্কি ও ১৯৯১ সালের ম্যারিয়েন ঝড় অন্যতম। এই দুটি ঝড়ে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল অনেক। ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে গোর্কি আঘাত হানে।

আবহাওয়া দফতর বলছে, গত দশ বছরে দেশে মোট পাঁচটি বড় ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ‘মোরা’। ২০১৭ সালের ৩০ মে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ আঘাত হেনেছিল। এর গতি ছিল ঘণ্টায় ১৪৬ কিলোমিটার। এর আগে, ২০১৬ সালের ২১ মে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ আঘাত হানে। এর গতিবেগ ছিল ১২৮ কিলোমিটার। ২০১৩ সালের ১৬ মে আসে মহাসেন, যার গতি ছিল ১০০ কিলোমিটার। আর ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই আসে কামেন। এর গতি ছিল ৬৫ কিলোমিটার। আর ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানে আইলা। এর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার।

তবে, এ পর্যন্ত হওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে ১৯৭০ সালের গোর্কির ভয়াবহতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ঝড়ের কারণে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এদের বেশিরভাগই জলোচ্ছ্বাসে ডুবে মারা যায়। ঝড়ের মাত্রা ছিল ‘ক্যাটাগরি ৩’। ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২২২ কিলোমিটার এবং জলোচ্ছ্বাসের সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল প্রায় ৩০ ফুট। ঝড়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তজুমদ্দিন উপজেলা। সেখানকার এক লাখ ৬৭ হাজার অধিবাসীর মধ্যে প্রায় ৭৭ হাজারই প্রাণ হারায়। ১৯৮৮ সালের ২৯ নভেম্বর বাংলাদেশে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়টি ইতিহাসের অন্যতম বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়। এই ঝড়ের ফলে দেশে যে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বন্যা হিসেবে পরিচিত। ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের ফলে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে পাঁচ হাজার ৭০৮ জন প্রাণ হারায়। ঝড়ে বাংলাদেশের প্রায় ৭০ ভাগ ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এর পরিমাণ ছিল প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার টন।

নিহতের সংখ্যা বিচারে ম্যারিয়েন ঘূর্ণিঝড়টি খুবই ভয়াবহ। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হয়। এর ফলে প্রায় এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। প্রায় এক কোটি মানুষ সর্বস্ব হারায়। ঝড়ের মাত্রা ছিল ‘ক্যাটাগরি-৫’। এতে ১ কোটি মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়ে।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে ২৬০ কিলোমিটার বেগের বাতাসের সঙ্গে ১০ থেকে ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস নিয়ে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’। শ্রীলঙ্কান শব্দ সিডর বা ‘চোখ’-এর নামে ঝড়ের নামকরণ করা হয়। এ ঝড়ের মাত্রা ছিল ‘ক্যাটাগরি-৫’। ঝড়ে দুই হাজার ২১৭ জন প্রাণ হারায়। পানির চাপে পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদের পাড়ের বেড়িবাঁধ ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ৬৮ হাজার ৩৭৯টি ঘরবাড়ি। পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে যায় ৩৭ হাজার ৬৪ একর জমির ফসল।

২০০৯ সালে ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে আঘাত হানে। ঝড়টির ব্যাস ছিল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, যা ঘূর্ণিঝড় সিডরের থেকে ৫০ কিলোমিটার বেশি। সিডরের মতোই আইলা প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় নিয়ে উপকূল অতিক্রম করে। ঝড়ে ১৯৩ জনের মৃত্যু ও সাত হাজার মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। দুই লাখ গবাদিপশু মারা যায়।