মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

ভাষা আন্দোলন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক অংশীদার ও স্রষ্টা, তাঁর কাছ থেকে তো আমাদের প্রাপ্তি থাকবেই। এই বইটিতে তিনি আলোকপাত করেছেন এমন সব বিষয়ে, যা নিয়ে তাঁর চিন্তার এক বড় আশ্রয় রবীন্দ্রনাথ, তবু তিনি সচল, প্রবহমান ও মুক্ত। তাঁর প্রায় সব লেখা একই সঙ্গে তথ্য, তত্ত্ব ও আপন বিবেচনায় পূর্ণ। মানুষের মন বইয়ের প্রতিটি রচনাই এর স্বাক্ষর বহন করছে। নারী-পুরুষের শিক্ষণীয় বিষয় এক নয়, এমন কথা বহুদিন ধরে চলে আসছে। একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের আইন প্রাকটিস করতে দেওয়া হতো না। এক আইনজীবীর সহধর্মিণী মাইরা কলবি ব্র্যাডওয়েল (১৮৩১-১৮৯৪) আইন পরীক্ষা পাস করার পর ইলিনোয়া বার সমিতির সনদের জন্য দরখাস্ত করেন। তাঁর দরখাস্ত নাকচ হয়ে গেলে তিনি সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হন। ব্র্যাডওয়েল বনাম ইলিনোয়া (১৮৭৩) মামলায় মিসেস ব্র্যাডওয়েল হেরে যান। মার্কিন সাইকোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম মহিলা সভাপতি মেরি কলকিন্স হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উইলিয়াম জেমসের কাছে মনোবিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন, কিন্তু নারী হওয়ায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে পিএইচডি ডিগ্রি দিতে রাজি হয়নি। জামানা পাল্টেছে। কিন্তু কিছু পার্থক্যবিচারে কথা থেকে যায়। এখন বলা হচ্ছে, অঙ্কশাস্ত্রের জন্য নারীর মস্তিষ্ক কিছুটা অপরিপক্ব। তথ্য পরীক্ষিত সত্য হলে মেনে নিতে হবে। আজ শিশুপরিচর্যায় শিক্ষিত পুরুষ পিতা দুধের বোতল ধুয়ে শিশুকে দুধ খাওয়াতে সক্ষম। কিন্তু নিজের স্তন্যপান করাতে এখনো অপারঙ্গম। নারী-পুরুষ সম্পর্কে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। মানুষের আচরণ হূদয়ঙ্গম করতে ব্যাখ্যা দিতে এবং তার পূর্বাভাস জানাতে আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা তাঁদের দার্শনিক মূলাশ্রয় থেকে সরে গিয়ে অধিকতর বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। গেশটাল্ট মনোবিজ্ঞান ও আচরণবাদ বিংশ শতাব্দীর চিন্তাধারায় অনেকখানি প্রভাবান্বিত হয়। সিগমুন্ড ফ্রয়েড মনঃসমীক্ষণের দ্বারা মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্র প্রসারিত করেন। যৌনতা স্নায়ুবৈকল্যের প্রধান কারণ—ফ্রয়েডের এই বক্তব্য ইয়ুং অস্বীকার করেন। কারেন হর্নি ফ্রয়েডের ইডিপাস কমপ্লেক্স তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। সব রহস্যের সমাধান হয়নি। হলে আমাদের কাজ তো ফুরিয়ে যেত। মনোবিজ্ঞান নানা স্তরে বিভাজিত—ব্যক্তিত্ব মনোবিজ্ঞান, সমাজ মনোবিজ্ঞান, উন্নয়ন-মনোবিজ্ঞান ইত্যাদি। এতে আমাদের তত্ত্বগত জ্ঞান যে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। অপরদিকে ফলিত মনোবিজ্ঞান আদালত, শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র ও পরিবেশ, শিল্পসংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থায় আমাদের দৈনন্দিন আচরণপ্রসূত সমস্যা পূরণের চেষ্টা করছে। শিক্ষাঙ্গনে, বিশেষ করে শিশু-কিশোরের শিক্ষায় মনোবিজ্ঞানের অবদান অপরিসীম। দুঃখের বিষয়, মনোবিজ্ঞানের অপব্যবহার করে সন্দেহভাজন বা অভিযুক্তদের ওপর পীড়ন-নিপীড়ন করা হয় প্রায় সব দেশেই। যে দেশে নিপীড়ন অবৈধ বলে বিবেচিত সে দেশও আজ ভিন্ন অনুগত দেশে আউট সোর্সিং অব টর্চার করছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্ন মতাবলম্বীদের রোগী হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের সংশোধন করারও চেষ্টা হচ্ছে। মনঃসমীক্ষণ ও মনশ্চিকিত্সার সাহায্যে লিব্রিয়াম, ভ্যালিয়াম, এস্কালিথ, লিথোনেট, লিথেন প্রোজ্যাক ইত্যাদি নানা ধরনের ওষুধের সঙ্গে বৈদ্যুতিক শক থেরাপি, লোবোটমি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। কাজ যে কীভাবে বেড়েছে তার একটা উদাহরণ দিই। ১৯৫৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিজ-অর্ডারস (ডিএসএম) বের হয়, তখন তার মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ১৩২ এবং ২০০০ সালে তার পৃষ্ঠাসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৯৮০-তে। ‘সাহিত্যবিচার’ (১৩৩৬)-এ মনোবিজ্ঞান ও মনঃসমীক্ষণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘মানবপ্রকৃতির যা কিছু সাধারণ গুণ তারই প্রতি লক্ষ্য মনোবিজ্ঞানের, আর ব্যক্তিবিশেষের যে অনন্যসাধারণ প্রকৃতি তারই প্রতি লক্ষ্য সাহিত্যের। অবশ্য, এ কথা বলাই বাহুল্য, নারীকে আঁকতে গিয়ে তাকে অ-নারী ক’রে আঁকা পাগলামি। বস্তুত, সে কথা আলোচনা করাই অনাবশ্যক। সাহিত্যে কুমুর যদি কোনো আদর হয় তো সে হবে সে ব্যক্তিগত কুমু বলেই, সে নারীশ্রেণীর প্রতিনিধি বলে নয়। কথা উঠেছে, সাহিত্যবিচারে বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতি শ্রদ্ধেয় কি না। এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পূর্বে আলোচ্য এই—কী সংগ্রহ করার জন্য বিশ্লেষণ। আলোচ্য সাহিত্যের উপাদান-অংশগুলি? আমি বলি সেটা অত্যাবশ্যক নয়; কারণ, উপাদানকে একত্র করার দ্বারা সৃষ্টি হয় না। সমগ্র সৃষ্টি আপন সমস্ত অংশের চেয়ে অনেক বেশি। সেই বেশিটুকু পরিমাণগত নয়। তাকে মাপা যায় না, ওজন করা যায় না, সেটা হলো রূপরহস্য, সকল সৃষ্টির মূলে প্রচ্ছন্ন। প্রত্যেক সৃষ্টির মধ্যে সেটাই হল অদ্বৈত, বহুর মধ্যে সে ব্যাপ্ত, অথচ বহুর দ্বারা তার পরিমাণ হয় না। সে সকল অর্থাত্ তার মধ্যে সমস্ত অংশ আছে, তবু সে নিষ্ফল, তাকে অংশে খণ্ডিত করলেই সে থাকে না। অতএব সাহিত্যে সমগ্রকে সমগ্রদৃষ্টি দিয়েই দেখতে হবে। আজকাল সাইকো-অ্যানালিসিসের বুলি অনেকের মনকে পেয়ে বসে। সৃষ্টিতে অবিশ্লেষ্য সমগ্রতার গৌরব খর্ব করবার মনোভাব জেগে উঠেছে। মানুষের চিত্তের উপকরণে নানাপ্রকার প্রবৃত্তি আছে, কাম ক্রোধ অহংকার ইত্যাদি।’