মুনতাসীর মামুন
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪১
বীরাঙ্গনা ১৯৭১-এ তুলে ধরা হয়েছে ভুলে যাওয়া বীরাঙ্গনাদের মর্মস্পর্শী কাহিনি। পাকিস্তানিদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামীর কর্মী, যাদের অধিকাংশ ছিল দালাল, রাজাকার, আলবদর, নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে বাংলার অসংখ্য নারীকে তুলে দিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাদের মনোরঞ্জনের জন্য। তাদের নির্মম অত্যাচারে বহু নারীর জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে, কেউ কেউ হয়েছেন অন্তঃস্বত্ত্বা। বাংলাদেশ সরকার এঁদের ‘বীরাঙ্গনা’ অভিধা দিয়েছে। এমন ৯০ জন বীর নারীর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত বয়ানও তুলে ধরা হয়েছে এই বইয়ে।
নিয়াজি একটি গোপন চিঠি পাঠান সব কমান্ডারের কাছে। চিঠির মূল বিষয় ছিল সৈন্যদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, বিভিন্ন জায়গায় লুট, খুন চলছে কোনো কারণ ছাড়া। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন জায়গা থেকে ধর্ষণের খবর আসছে। এমনকি পশ্চিমা পাকিস্তানিরা রেহাই পাচ্ছে না। ১২ এপ্রিল, দুজন পশ্চিম পাকিস্তানি মহিলা ধর্ষিতা হয়েছেন এবং আরো দুজনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। লুটের মাল পাঠানো হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে। নিয়াজি লিখেছেন, তার সন্দেহ অফিসাররাও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত। এসব কার্যকলাপ সৈন্যদের দক্ষতা কমিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, এক সময় তাদের মহিলারাও আক্রান্ত হতে পারেন।
তার ভাষায়: ‘It is not uncommon in history, when battle has been lost because troops were over indulgent in loot and rape.’
সতর্ক করে দিয়ে কমান্ডারদের তিনি জানিয়েছেন, কেউ যদি এ ধরনের কার্যকলাপে লিপ্ত হয় তাকে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে।
নিয়াজির চিঠি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে এ পরিপ্রেক্ষিতে যে, যিনি নিজেই ধর্ষণে আগ্রহী তিনি আবার এ চিঠি লিখছেন কীভাবে? কারণ একটিই। লুট ও ধর্ষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সৈন্যদের শৃঙ্খলা আর থাকছিল না। সে জন্য এই চিঠি। কিন্তু, তিনি নিজে বাঙালিদের চেহারা বদলে দেবার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন। গোপন এক প্রতিবেদনে দেখা যায় তিনি লিখেছিলেন আরো হত্যা চালাতে হবে—
‘There must be more killing, more mopping up and more witch hunting.’
পাকিস্তানের হায়দ্রাবাদ থেকে মেজর আফজাল খান সকিব যশোরে কর্মরত তার বন্ধু সেনা অফিসার ইকরামকে লিখেছিলেন—
‘প্রিয় বন্ধু ইকরাম
... আমি এ খবরে অবাক হই যে, রশিদ বাঙালি বাঘিনীদের পোষ মানিয়েছে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে অবশ্যই পরিবর্তন করা প্রয়োজন। ...হয়তো যে কোনো দিন তুমি ফজল বা আমাকে ওখানে খুঁজে পাবে। এই সময়ের মধ্যে তুমি সাবধানে সেখানে কিছু বন্যকুকুরীকে পোষ মানাবার পরিকল্পনা করো। তুমি কি অজানা আতঙ্কের সাথে প্রতিদিন তোমার বিছানা, চেয়ার, টেবিল এবং ড্রয়ার পরীক্ষা করো? যদি না করো তাহলে এখন থেকেই তোমার তা করা উচিত। তোমার ভৃত্য ইত্যাদি থেকে সাবধান থেকো যদি তারা ঐ এলাকার হয়ে থাকে। খাদ্য গ্রহণের আগে তোমার খাবার বিড়াল ইত্যাদিকে দিয়ে আগে খাইয়ে পরীক্ষা করে নেবে। যখন হোটেল ইত্যাদি পরিদর্শনে যাবে তখন তোমার অবশ্যই সন্দিগ্ধ থাকা উচিত। আমি নিরুত্সাহিত করছি না। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি মাত্র।...
তোমার প্রিয়
সাকিব’
১৯৭১ সালে যারা নীতি নির্ধারণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সে রকম অনেক পাকিস্তানির সাথে আলাপ করেছি। এর বাইরে সাংবাদিক, বামপন্থি রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও আলাপ হয়েছে। এদের মধ্যে একজন হলেন এম. এ. নকভী। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের প্রখ্যাত কলামিস্ট। তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে নকভী অকম্পিত স্বরে বললেন, “পাকিস্তানি বাহিনী ছিল বিশৃঙ্খল, লুটেরা বাহিনী, এরা লুট করেছে। ধর্ষণ থেকে শুরু করে সব রকমের অপরাধ করেছে। এ সেনাবাহিনী কত বোধহীন ছিল তার প্রমাণ জেনারেল টিক্কা খানের ঢাকা থেকে ফেরার পর সাংবাদিকরা যখন লুট, হত্যা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করেছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, ধর্ষণের সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত। মাত্র তিন হাজার, মাত্র তিন হাজার মহিলা ধর্ষিত হয়েছে।’ ক্রোধে নকভীর গলার স্বর কাঁপছিল, টিক্কা, ইয়াহিয়া, নিয়াজি, ভুট্টো সবাই এর সঙ্গে যুক্ত।”...
পাকিস্তানি এই নীতির কথা বলেছিলেন বিখ্যাত ভারতীয় ঔপন্যাসিক মুলক রাজ আনন্দ। ১৯৭২ সালে তিনি যা বলেছিলেন তার মূল কথা হলো “নতুন একটি জাতি সৃষ্টির জন্য পশ্চিম পাকিস্তানিরা এই নীতি গ্রহণ করেছিল।”
“[rapes were so systematic and pervasive that they had to be conscious Army policy. Planned by the West Pakistanis in a deliberate effort to create a new race or to dilute Bengali nationalism.]”
যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ডা. ডেভিস যার কথা পরে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছি। এক সাক্ষাত্কারে তিনি জানিয়েছিলেন—
‘প্রশ্ন :তারা নারী ধর্ষণের ব্যাপারটা কীভাবে জায়েজ করার চেষ্টা করেছে?
জেফ্রি:ওরে বাপস! তাদের ওপর টিক্কা খানের এক প্রকার আদেশ বা নির্দেশই ছিল যে, একজন সাচ্চা মুসলমান তার বাবা ছাড়া আর সবার সঙ্গেই লড়াই করবে। কাজেই তাদের যা করতে হবে তা হলো যতোটা পারা যায় বেশি সংখ্যক বাঙালি নারীকে গর্ভবতী করা। এটাই ছিল তাদের কাজের পেছনের তত্ত্ব।’
আমরা যে সব কেস স্টাডিগুলির বর্ণনা করেছি তাতে এই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। দেখা যাবে, ধর্ষণগুলির একটা প্যাটার্ন আছে। তবে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তাহলো পাকিস্তানের দমন নীতির একটি হাতিয়ার ছিল ১. ধর্ষণ ২. ধর্ষণের মাধ্যমে ‘নতুন জাতির সৃষ্টি’ যাতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে; ৩. কলোনির অধস্তন মানুষ হিসেবে যেনতেন ব্যবহার।’ যেন মানুষ মানুষ নয়, সামগ্রী মাত্র; ৪. জৈব আকাঙ্ক্ষা মেটানোর রাস্তা এবং এক রকম প্রতিশোধ স্পৃহা যা প্রথম ও দ্বিতীয়টির সম্পূরক।