জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’

মৃত্যু ও শিশিরের ঘ্রাণ

মধ্যাহ্নের প্রখর রোদ্দুরের মধ্যেও কেউ কেউ প্রদোষের বিষণ্নতা অনুভব করে। করোজ্জ্বল সকালে সোনালি শস্যের উচ্ছ্বাসে সম্পন্ন যে জনপদের ছবি জেগে ওঠে, সেখানেও কেন দেখা দেয় মৃত্যু আর অবসাদের শ্রান্ত ধ্বনি? জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’ প্রকাশিত হয় কবির জীবনাবসানের পরে; ১৯৫৭-তে। কিন্তু কবিতাগুলো রচিত হয় ‘ধূসর পাণ্ডলিপি’ পর্যায়ে (১৯৩৬), কাব্যটির নামকরণে রূপের যে বর্ণাঢ্যতা ঝরে পড়ে কিংবা মাতৃময় বাংলার যে নিবিড়তা স্ফুট হয়ে ওঠে, অন্তর্গত অন্বেষণে হয়তো সেটিই এর শেষ বা একমাত্র পরিচয় নয়, এমনকি প্রধান পরিচয়ও নয়। এ কথা আমাদের জানা আছে যে, ‘রূপসী বাংলা’র জনপদটি আমাদের স্মৃতি ও শ্রুতির বাংলা, কিন্তু যেটি জানা নেই, তা হলো এই বাংলা উপনিবেশিত বাংলা, এই বাংলা লুণ্ঠিত বাংলা, এই বাংলা রূপসী নয়—রোদসী ও নিঃস্ব এই বাংলা। লোকপুরাণের প্রাচীন আলো উদ্ভাসিত করেছে এই বাংলার প্রান্তর, ইতিহাসের উদ্ধৃত রাজসিক দর্প সন্ত্রস্ত করেছে বাংলার মানুষ ও নিসর্গকে। জীবনানন্দ ‘রূপসী বাংলা’র নাম দিয়েছিলেন ‘বাংলার ত্রস্ত নিলিমা’। এক গভীর শঙ্কা ও ত্রাস ছড়িয়ে আছে এই নামের মধ্যে। পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কালে বাংলার সম্পদ ও সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়েছিল, ঔপনিবেশিক কালে এসে লুণ্ঠিত হলো এর নীলিমা। কৃষিনির্ভর কৌম সমাজের এক সনাতন ছবি প্রবলভাবে দেখা যায় কাব্যটিতে। কিন্তু ‘অপনা মাঁসে হরিণা বৈরী’র মতোই এর অপার শস্যভান্ডার আর নিসর্গ বৈরী হয়ে উঠেছে বাংলার। জীবনানন্দ ঔপনিবেশিক সময়ের সন্তান। বাংলার মানুষ আর নিসর্গের ওপর উপনিবেশের সেই ক্রুর ছায়াটিকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন কবি। কোনো নিভৃত বেদনা কিংবা অস্ফুট কান্না কি রূপসী বাংলার দিগন্তকে শোকার্ত করে তোলেনি? এলিট ও সাব অল্টার্নের চিরায়ত দ্বন্দ্বের কোনো চিহ্ন কি জেগে ওঠেনি রূপসী বাংলার পঙিক্ততে? কবিতা সৃষ্টির অমিত শক্তির অধিকারী হয়েও জীবনানন্দ জীবিকা ও জীবনের প্রশ্নে ছিলেন দোলাচলে। বরিশালের মফস্বলীয় পরিমণ্ডল থেকে অগ্রসর কোলকাতার অনিশ্চিত বলয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন জীবনানন্দ। জীবনের টানাপড়েনে ছিন্নভিন্ন কবি জীবিকার নিশ্চিত আশ্রয় পেতে বিপন্ন হয়ে উঠেছিলেন। ট্রামচাপায় কবির মৃত্যুটা হয়তো অভিমানী বিধ্বস্ত জীবনানন্দের একধরনের আত্মহনন। কলোনির শাসনে নেটিভদের সৃজনশীলতা ও সৌন্দর্যও উপেক্ষা আর অবজ্ঞার বিষয় হয়ে ওঠে। ফলে ‘রূপসী বাংলা’র কবিতায় ঔপনিবেশিকতার প্রতিরূপক তৈরি হয়—কলোনিশাসিত কোলকাতা হয়ে ওঠে ইন্দ্রের সভা। গাঙুরের জলে একাকিনী বেহুলা যখন ভেলা ভাসিয়ে অমরার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল তখন সেই লগ্নটিও তেমন আশাপ্রদ ছিল না। নদীর চড়ায় সেদিন কৃষ্ণা দ্বাদশীর জ্যোত্স্না মরে গিয়েছিল। সেটি ছিল এক ভীতিকর রাক্ষুসী বেলা। কলোনি-প্রভুদের মতো ইন্দ্রের রাজসভায় বেহুলা লাঞ্ছিতা হয়েছিল; বাংলার বেহুলা সেদিন হয়েছিল প্রমোদবালা— অমরার দেব শ্রেণীকে প্রমোদ বিতরণ করতে হয়ছিল বেহুলার। ‘কলোনাইজড পিপল’ বা ঔপনিবেশিত মানুষের রূপ-ঐশ্বর্য প্রভুদের ভোগ্যপণ্য হয়ে ওঠে। বেহুলার শরীরী বিনোদনেই কেবল তুষ্ট হয়নি ঔপনিবেশিক শক্তি, বেহুলার সঙ্গে সঙ্গে লাঞ্ছিত হয়েছে বাংলার প্রকৃতিও। কারণ বেহুলার পায়ে ঘুঙুরের কান্নার যে ধ্বনি শোনা যায়, সেই ঘুঙুর ছিল বাংলার নদী, মাঠ, ভাঁটফুল। কেবল ইংরেজ শাসকশ্রেণী নয়, বাঙালির আত্মপরিচয় ও সার্বভৌমত্ব বারবার পদদলিত হয়েছে বহিরাগত শক্তির কাছে। আর্য, শক, হুন, পাঠান, মোগলদের পথ ধরেই এসেছে ইংরেজ-প্রভুরা। লাঞ্ছিতা বেহুলা, লুণ্ঠিত বাংলা শোষণের সেই ঐতিহাসিক পরম্পরাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ইতিহাস ও সভ্যতার ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার ব্যাকরণ পাল্টায়। ভারতীয় নারীমানসে তথা লোকমানসে বেহুলা সতী নারী হিসেবে আর্কিটাইপে বা প্রত্ন-নারীতে পরিণত হয়েছে, তার নামে আছে সতিত্বের গৌরব; অথচ কামুক ইন্দ্রের সভায় কত তুচ্ছ ও উপহাস্যই না তাকে হতে হয়েছে। রেনেসাঁ-উত্তর কোনো নারী হয়তো অমন যৌন-নিগ্রহের বিনিময়ে তার পতির প্রাণ ফেরত চাইত না। ছায়া-সুনিবিড় গ্রামীণ বাংলার অঢেল প্রকৃতি এবং কৃষিজীবী জীবনের চিত্রটি রূপময় হয়ে উঠলেও এই বাংলা আমাদের কাছে অধরা। এ কাব্যে বেদনা ও বিষণ্নতা আছে, প্রাণের বিনষ্টি কাতর করে তোলে আমাদের। স্বপ্নময় এই ভূ-খণ্ড দিয়ে কী হবে আমাদের, যদি অবহেলায় আর অনাদরে ঝরে যায় বাংলার প্রিয় মুখ, প্রিয় নারী— পৃথিবীর পথ ঘুরে বহুদিন অনেক বেদনা প্রাণে সয়ে ধানসিড়িটির সাথে বাংলার শ্মশানের দিকে যাব বয়ে, সেইখানে এলোচুলে রামপ্রসাদের সেই শ্যামা আজো আসে। সেইখানে কল্কাপেড়ে শাড়ি পরে কোনো এক সুন্দরীর শব চন্দন চিতায় চড়ে—আমের শাখায় শুক ভুলে যায় কথা; সেইখানে সবচেয়ে বেশি রূপ—সবচেয়ে গাঢ় বিষণ্নতা; কল্কাপেড়ে শাড়িপরা বাংলার এই সুন্দরীর প্রাণ অকালে বিনষ্ট হয়। দুশ বছরের ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনে এভাবেই আত্মাহুতি দিয়েছেন প্রীতিলতা, ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ। তাঁদের পথ ধরেই নিগ্রহ সয়েছেন ইলামিত্র, মনোরমা মাসির মতো অকুতোভয় বাঙালি নারীরা। উদ্ধৃত পঙিক্তগুলোর মধ্যে যে গভীর বেদনা ছড়িয়ে আছে, সমগ্র ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যে তার তুলনা বিরল। ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যকে কখনো কখনো মনে হয় মৃত্যু-মগ্নতার কাব্য, কখনো মনে হয় চিতাভস্মের রেখায় উত্কীর্ণ হয়েছে কবির অন্তর্গত বিষণ্নতা। এত মৃত্যুময় কেন ‘রূপসী বাংলা’র আকাশ? গাছগাছালি-পাখপাখালির আনন্দঘন পরিবেশ থেকে কেন উঁকি দেয় প্রগাঢ় মৃত্যু? লক্ষ করলে দেখা যাবে এ কাব্যের একাধিক কবিতায় ছড়িয়ে আছে শ্মশান ও চিতার মোটিফ। শঙ্খবালিকার রূপ এখানে ধূসর হয়ে যায়, একদিন তার হাতে হাত রেখেছিলেন কবি কিন্তু শ্মশান-চিতায় সেই শঙ্খবালিকার হাড় একদিন ঝরে গেছে। ১১৭৬ কিংবা ১৩৫০ বঙ্গাব্দের দুর্ভিক্ষে ও মন্বন্তরে এই বাংলা শ্মশানে পরিণত হয়েছিল, মৃত্যুর মিছিলে ভারাক্রান্ত হয় এই জনপদ। প্রত্নস্মৃতির মতো এই ইতিহাস ঘুরে-ফিরে আসে জীবনানন্দের কবিতায়। লোকায়ত বাংলার স্নিগ্ধ চিত্রের আড়ালে ‘রূপসী বাংলা’য় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঔপনিবেশিকতার দ্বন্দ্ব। বাংলার রূপ নিয়ে কবির যে সন্তোষ ও তৃপ্তি; সেই বাংলাকে অর্জন করতে হয়েছে অশ্রু ও রক্তের জলধি পেরিয়ে। এখানে কখন মরণ আসে। কালীদহে কখন কমলের নাল ভাঙে, কখন গাংচিল-শালিখের প্রাণ যায়, কেউ জানে না। মৃত্যুর জন্য সবসময় তৈরি থাকতে হয় এখানে। দুই শতাব্দীব্যাপী ঔপনিবেশিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যে বাংলাকে অর্জন করেছি আমরা, উত্তর-উপনিবেশিক কোনো শক্তি যেন তাকে নষ্ট করতে না পারে—সে কারণে কবি জন্ম-জন্মান্তরে এই বাংলাতেই ফিরে আসতে চান। একটি নিজস্ব ভূ-খণ্ড ছাড়া কিছুই চায়নি ঔপনিবেশিক ভারতবাসী। শিল্পপণ্যের পুঁজিবাদী জৌলুস নয়, সোনালি শস্যের ঘ্রাণে তাই ভরে ওঠে ‘রূপসী বাংলা’র জনপদ-মাঠ-প্রান্তর। ‘অর্ধনারীশ্বর’ হয়ে কবি যে বাংলার অন্তরে ঘুমিয়ে থাকতে চান তার মূলেও রয়েছে কবির আবহমান বাঙালিত্বের টান। নির্বিত্ত কৃষিজীবী শিব আর গার্হস্থ্য পার্বতী মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে কবিসত্তায়। ‘তোমার বুকের থেকে একদিন চলে যাবে তোমার সন্তান বাংলার বুক ছেড়ে চলে যাবে,’—এই চলে যাওয়া শেষ পর্যন্ত ফিরে আসার জন্যই। ধনতান্ত্রিক কলোনিয়াল শক্তি শোষণ-লুণ্ঠনের মাধ্যমে বাংলাকে পরিণত করেছে শ্মশানে—এই শ্মশানময় বাংলার মধ্যেই জীবানানন্দ আরোপ করলেন স্বপ্ন-স্মৃতি-শ্রুতির বাংলাকে। প্রত্ন-করোটির মধ্যে যুক্ত হলো প্রাণের সজীব দেহরূপ। তাই ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যে মৃত্যু-অন্ধকার ও শ্মশানচিতার সমান্তরালে জেগে থাকে রৌদ্র ও শিশিরের ঘ্রাণ।