দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড় করছে আইএমএফ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রথম কিস্তির কার্যকারিতা বিষয়ে পর্যালোচনা শেষ করেছে সংস্থাটির নির্বাহী বোর্ড। সভায় প্রতিশ্রুত দ্বিতীয় কিস্তির অর্থছাড়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আইএমএফ এর বর্ধিত ঋণ সুবিধা পেতে অনেকগুলো শর্তের একটি ছিলো, বৈদেশিক উত্স থেকে কঠিন শর্তে একশ’ কোটি ডলারের বেশি ঋণ নেয়া যাবেনা। কিস্তু সমপ্রতি রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র ক্রয়ের জন্য প্রায় দেড়শ’ কোটি ডলারের একটি ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশে সরকার। পরবর্তীতে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থের জন্য আইএমএফ এর শর্ত শিথিল করার আহ্বান জানানো হয়। বোর্ড সভায় এ শর্ত শিথিল করা হয়েছে বলে জানানো হয়। গতকাল বোর্ড সভার পর্যালোচনা বিষয়ে আইএমএফের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। গত বছরের এপ্রিলে প্রথম কিস্তির ১৩ কোটি ৯৪ লাখ ডলার ছাড় করা হয়েছিল। দ্বিতীয় কিস্তিতেও একই পরিমাণ অর্থ ছাড় করা হবে। আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দেয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কারণে সরকারের ঋণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রভৃতি বিষয়ে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ আগের চেয়ে কমেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন মন্দা চলছিল ঠিক সে সময়েও এদেশের অর্থনীতি শক্ত অবস্থানে ছিল। তবে অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি যে হারে আশা করা হয়েছিলো তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয়নি। এসব সম্ভাবনার মধ্যে অর্থনীতির কিছু ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে রফতানি পণ্যের বাজার কমে যাওয়া, ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, রাষ্ট্রয়ত্ব ব্যাংকগুলোর তারল্য সঙ্কট এবং নির্বাচনের বছরের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ইসিএফ সমর্থিত কর্মসূচি দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়নের জন্য সব অর্জন একত্রিতকরণ, আর্থিক ও ঋণ স্থিতিশীলতা ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি কমানো এবং সর্বোচ্চ ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। সরকারের আর্থিকনীতি সঠিক পথে থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা কাঙ্খিত মানের কর আদায় হয়নি। এজন্য কর আদায় প্রক্রিয়া আরো শক্তিশালী করতে হবে। রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য মধ্যমেয়াদী নতুন মূল্য সংযোজন কর ও ট্যাক্স গাইডের হালনাগাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে আইএমএফ। সংস্থাটি বলছে, এখনো পর্যন্ত ভুর্তুকির সিংহভাগ যাচ্ছে জ্বালানী খাতে। প্রবৃদ্ধি ও নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য এখন সরকারের উচিত গ্যাস ও সার বিষয়ক বিষয়গুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে তদারকী করা। এছাড়া সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশলের ক্ষেত্রে সুবিধা ও তুলনালমূলক সহজ শর্তের বিষয়গুলোর উপর জোর দিতে হবে। ঋণবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কার্যকর ছিল। তবে মুদ্রানীতি আর্থিক স্থিতিশীলভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেই কার্যকর হয়। এছাড়া তখন ওই নীতি বিনিময় হার ও সুদের হারের ক্ষেত্রেও কার্যকরী হয় বলে সংস্থাটি মত দিয়েছে। অবকাঠামো পূনগর্ঠন ঠিক ভাবেই সামনে এগুচ্ছে। তারপরও দ্রুত অভ্যন্তরীণনীতি সমন্বয়েরর জন্য বড় ধরণের সহায়তা প্রয়োজন। নতুন ভ্যাট আইন একটি মাইলফলক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যথাসময়ে এটার বাস্তবায়নের জন্য সতর্ক পরিকল্পণা ও সবার আগে অটোমেশনের সমর্থন প্রয়োজন। ব্যাংকিং আইনের সংশোধনী, আর্থিক খাত শক্তিশালীকরণ, চেকের ক্ষেত্রে ঝুকি বিশেষ করে যা রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের থেকে সৃষ্টি হয়েছে এসব ক্ষেত্রে ঝুকি রয়েছে। সরকারী ও বেসরকারী বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য রাজস্ব বিভাগের পুনগঠন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক বিনিময় নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। এটা করতে পারলে দ্রুত আর্থিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র বিমোচন সম্ভব হবে। আর্থিক সুশাসন ও ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে ২০১৩ সাল একটি স্থিতিশীল, প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক পরিবেশ এবং ঝুকি এড়ানো সম্ভব। সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে পারলে বিশ্বব্যাপী মন্দার সত্বেও একটি ভাল অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে পারবে বলে সংস্থাটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় সহজ শর্তে সমপ্রসারিত ঋণ সুবিধা (ইসিএফ) আওতায় ২০১২ সালের ১১ এপ্রিল বাংলাদেশকে ৯৭ কোটি ৫৯ লাখ ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় আইএমএফ। তবে পুরো অর্থ একসঙ্গে না দিয়ে ছয় কিস্তিতে অর্থ ছাড় করা হবে। ইসিএফের আওতায় কোনো একক দেশের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় অঙ্কের ঋণ। ঋণের জন্য জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো, সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ, ব্যাংকঋণের সুদহারের সীমা প্রত্যাহারসহ বাংলাদেশকে আইএমএফের বেশ কিছু শর্ত ইতিমধ্যে মানতে হয়েছে। প্রসঙ্গত, বর্ধিত ঋণ সুবিধা দিতে যেসব শর্ত আরোপ করা হয়েছিল সেগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তা পর্যবেক্ষণে গত ২৭ নভেম্বর আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসে। ডেভিড কাউয়েন সাতজনের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। পরে ৫ ডিসেম্বর দেশ ত্যাগ করেন তারা। আইএমএফ তাদের নির্বাহী সভায় মার্চে ইসিএফের অনুকূলে ৯৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার ঋণ অনুমোদন করে।বিনা সুদের এই ঋণ বাংলাদেশ বাজেট প্রণয়ন, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, সামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়নসহ দেশের স্বার্থে ব্যয় করতে পারবে। প্রসঙ্গত, আইএমএফ থেকে এর আগে দারিদ্র্য নিরসন প্রবৃদ্ধি সহায়তা (পিআরজিএফ) কর্মসূচির আওতায় ১৯৮৭-৯০, ১৯৯০-৯৩ এবং ২০০৩-০৭ সময়কালে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ। ইসিএফের আওতায় এটি চতুর্থ উদ্যোগ।