স্মৃতির মিনারেও দ্রোহের আগুন

যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি আর সুন্দর ভবিষ্যত্ রচনার প্রত্যয় নিয়ে অমর একুশে পালন করল জাতি। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের স্মরণে নতুন শপথের গান শোনা গেছে এবার। শহীদ মিনারে আসা লাখো মানুষের হাতে ছিল ফুল আর কণ্ঠে রাজাকারের ফাঁসির দাবিতে শ্লোগান। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু করে শহর গ্রাম পাড়া মহল্লা এমনকি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে—একটু ভিন্ন আঙ্গিকেই এবার পালন করা হলো শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। শহীদ বেদীতে শুধু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো নয়। ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্রশ্রদ্ধা জানাতে খালি পায়ে পিচ ঢালা রাজপথে হেঁটে হেঁটে সমস্বরে উচ্চারণ করেছেন - ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’, ‘যুদ্ধাপরাধী মুক্ত দেশ চাই’। শহীদ বেদীতে ফুল দিতে আসা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর ব্যানারে এবার আর শুধুই ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ লেখা ছিল না। ছিল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিও। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু করে দেশের সকল শহীদ মিনারেই ছিল শ্লোগান। একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শুরু হয় যথাযথ মর্যাদায় শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কর্মসূচি। গতকাল সারাদিন সর্বস্তরের মানুষ বিভিন্ন সময়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। লাল বেদীর উপর হলুদ গাঁদা। ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে গিয়ে সবার কণ্ঠেই একই দাবি, ‘রাজাকারদের ফাঁসি চাই’। একুশের প্রথম প্রহরে মানুষের ঢল নামে শহীদ মিনারগুলোতে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ১মিনিটে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অমর একুশে উদযাপন। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি, বেসরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। গতকাল ছিল সরকারি ছুটির দিন। ভোরে শহীদ মিনার অভিমুখে প্রভাত ফেরিতে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়। মসজিদে মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ভাষা শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। অন্য উপাসনালয়ে প্রার্থনা করা হয়। বিভিন্ন স্থানে স্কুল, কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের চিত্রাঙ্কন, বাংলায় সুন্দর হাতের লেখা, ভাষার গান, দেশাত্মবোধক গান ও রচনা প্রতিযোগিতা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একুশের প্রথম প্রহরে সরকার ও জাতির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথম পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে তিনি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি গাইতে থাকেন। এসময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্যসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শহীদ মিনারের বেদীতে দাঁড়িয়ে বাংলা ইউনিকোড ‘আমার বর্ণমালা’ উদ্বোধন করেন। রাত ১২টা ২০মিনিটে সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ জয়নাল আবদীন ফারুক দলীয় নেতাদের নিয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। এসময় হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাসদ, রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ওয়ার্কার্স পার্টি, দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী দল, খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে বাসদ এবং বিভিন্ন দল ও সংগঠন শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির নেতৃত্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী আবদুল মান্নান খানের নেতৃত্বে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এছাড়া এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম এবং যুবলীগ নেতৃবৃন্দ শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মূল বেদীতে বিএসবি ফাউন্ডেশন পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মেট্রোপলিটন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কিংস কলেজ এবং উইনসাম স্কুল এ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী, চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুন, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহি চৌধুরী বীর বিক্রম, এটর্নি জেনারেল মাহবুব-এ-আলম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়া, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার-ভাইস মার্শাল এনামুল বারী, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল হাবিব, আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও সিনেট সদস্য, সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম, বাংলা একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, জাতীয় প্রেসক্লাব, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি, শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিনিধি। সকালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এডভোকেট আফজাল হোসেন, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রমসহ অন্য নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে অনেক বিদেশি নাগরিককেও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গেছে। ‘মাতৃভাষায় শিক্ষার জন্য বই’ এবার চতুর্দশ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘মাতৃভাষায় শিক্ষার জন্য বই’ মাতৃভাষা দিবসে এক বিবৃতিতে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা বলেন, মানবতাকে সবার আগে স্থান দিতে হলে বহুভাষার চর্চাকে উত্সাহিত করার বিকল্প নেই। এটা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে আকৃতি দেবে; মতের প্রকাশ, চিন্তার নবায়ন আর কল্পনার শক্তিকে বাড়িয়ে দেবে। শান্তি আর উন্নয়নে শক্তি যোগায় বই। সুতরাং বই পৌঁছে দিতে হবে সবার হাতে। তিনি বলেন, নিত্যনতুন প্রযুক্তির এই যুগেও পাঠ, জ্ঞানের বিনিময়, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং পৃথিবীকে সবার সামনে মেলে ধরার সহজতম হাতিয়ার বই। কিছু দেশে স্থানীয় ভাষার বই আর পাঠ্যবইয়ের মৃত্যু হচ্ছে। এতে উন্নয়ন ও সামাজিক সংহতি বিঘ্নিত হচ্ছে, লঙ্ঘিত হচ্ছে নিজেকে প্রকাশের স্বাধীনতা। ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগকে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৯৯ সালে এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা- ইউনেস্কো।