স্বঘোষিত হিট প্রকল্প!

আমাদের দেশে এখনও ডিজিটাল পদ্ধতিতে ছবির বাজার নির্ণয়ের কোনো পদ্ধতি নেই। শুধুমাত্র ঢাকার সিনেপ্লেক্স ছাড়া মৌলিকভাবে এটি নির্ণয়ও করা যায় না। এই অবস্থায় প্রত্যেক চলচ্চিত্র নির্মাতাকেই তাদের ছবি রিলিজের পর চলচ্চিত্রের সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বলেন ছবিটি ব্যপক ব্যবসা করছে। প্রতিদিনই নাকি হাউজফুল। ফলে সেই হাউজফুলের মিথ্যা গল্প শুনে দর্শক কৌতুহলী হয়ে যখন দেখেন সিনেমা হল ফাঁকা তখন বিভ্রান্ত হন। নিজেদের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ণয়ের এই প্রক্রিয়ায় মিডিয়া হিসেবে যেমন সংবাদকর্মীদেরও বিভ্রান্ত হতে হয়, তেমনি চলচ্চিত্র নির্মাতারা জানতে পারেন না চলচ্চিত্রের মূল অবস্থান। এ প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি শহীদুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘এটা নির্ণয়ের জন্য আমরা বুকিং এজেন্ট থেকে শুরু করে সর্বস্তরে একটা সমন্বয়ের চেষ্টা করছি। কারণ এতে আমরা প্রত্যেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের নির্মাণে যে ধরনের চলচ্চিত্র হচ্ছে তাকে মোটেও হিট বলা চলে না। অথচ নিজেদের মতো করেই প্রচারণা চালাচ্ছে হিট বলে। এই ধরনের বিভ্রান্তিতে সকলের ক্ষতি হচ্ছে। সর্বশেষ মোস্তফা সারওয়ার ফারুকীর ‘টেলিভিশন’সহ বেশ কটি চলচ্চিত্র মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি হলে মুক্তি পেয়েছে, তার কোনোটিই ব্যবসাসফল বলা যায় না। অথচ গণমাধ্যমে এ নিয়ে কোনো রিপোর্ট প্রকাশ পাচ্ছে না। চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘দেবদাস’ চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিনপর শাকিব খান একেবারেই অন্যভাবে হাজির হয়েছে। এ কারণে ছবিটির হল বুকিং থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ভালো সাড়া পাচ্ছি, কিন্তু আমাদের দেশে ছবির ফলাফল নির্মাণের কোনো সংগঠন বা এর মনিটরিং নেই বলেই এখন আর জানা যাচ্ছে না কোন ছবিটি হিট বা ফ্লপ হচ্ছে। পত্রিকায় আগে সিনে সাংবাদিকেরা বিভিন্ন বুকিং এজেন্ট বা হলে গিয়ে সরেজমিন রিপোর্ট করলেও এখন সম্পর্কের খাতিরেই পরিচালকের নাম দেখেই বলে দিচ্ছে ছবিটি হিট বা ফ্লপ হচ্ছে। এর ভেতরে শুরু হয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের ডিজিটাল তকমা লাগিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রকল্প। আগে একটি ভালো মানের টেলিফিল্ম নির্মাণের খরচ ১৫ থেকে বিশ লাখ রেকর্ড করলেও প্রায় একই খরচে এখন ডিজিটাল ফিল্ম নামে চলচ্চিত্র তৈরি করছেন। ফলে একজন টেলিফিল্মের প্রডিউসার দীর্ঘ নাটক নির্মাণ করতে এসে মাঝপথে সেটিকেই সিনেমা নামে ঘোষণা দিয়ে ফেলছেন। দর্শকদের মনে তাই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এই বলে যে, ডিজিটাল ফিল্ম মানেই বুঝি কম খরচের চলচ্চিত্র। অন্যদিকে জ্যাজ মাল্টিমিডিয়া তাদের ডিজিটাল সিনেমা হল প্রকল্পে মাত্র ৫০টি হলে ডিজিটাল প্রক্রিয়া চালু করলেও মোটা অংকের ফি দিয়ে তাদের হলগুলোতে ছবি প্রদর্শন করতে হবে বলে অধিকাংশ নির্মাতায় জ্যাজ মিডিয়ার এই অপরিকল্পিত প্রজেক্টের সাহায্য নিতে চাইছেন না। তাই এখন পর্যন্ত তাদের নিজেদের বাজেটের কম খরচের ছবি ‘ভালোবাসার রং’ বা ‘অন্যরকম ভালোবাসা’ অর্বাচীন দুই নবীন তারকা দিয়ে তৈরি ছবিটিও দর্শকেরা গ্রহণ করেনি। সেক্ষেত্রে ‘স্বঘোষিত হিট’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নিজেই! চলচ্চিত্র নিমাণের এই প্রক্রিয়ায়, আবার অধিকাংশ নাট্যনির্মাতা হুট হাট করে চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিচ্ছেন। আশাবাদী কেউ কেউ বলছেন যে একটি ভালো ছবি তৈরি হওয়ার জন্য একশটি মন্দ ছবি তৈরি হোক। তবু ছবি নির্মাণ হোক। কিন্তু এ যাত্রায় অনেকেই আবার ছবির বড় আয়োজনে মহরত করছে, অডিও রিলিজ হচ্ছে কিন্তু ছবি নির্মাণ হচ্ছে না। ফলে এখানেও একজন সাধারণ দর্শক আরেকদফা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে অভিনেতা প্রযোজক এম এ জলিল অনন্ত বলেন, ‘এ ব্যাপারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সিনেমা হলগুলো ডিজিটাল করার ঘোষণা দিতে হবে। কারণ সরকার সমস্ত জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসককে যদি দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয়, যে সিনেমা হল গড়লে শুল্ক মওকুফ করা হবে, তবেই অনেকে এগিয়ে আসবে। আর ডিজিটাল হল তৈরি হলে এমনিতেই আমি ঢাকায় বসে কম্পিউটারের মাধ্যমে সেল রিপোর্ট পেয়ে যাব। আমাকে কোনো সাংবাদিকের আশ্রয় নিয়ে ভুল রিপোর্ট ছাপিয়ে বিভ্রান্ত করার সুযোগ থাকবে না। তাই সকলের সুবিধার্থেই এখন প্রকৃত হল রিপোর্ট পাওয়ার জন্য উপায় খুঁজছেন। নয়তো চলচ্চিত্রের এই মহামন্দার বাজারে এই ‘স্বঘোষিত হিট প্রকল্প’ ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রিকে আরও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।’ শাকিব খান ও অনন্ত :চলচ্চিত্রে তাদের জনপ্রিয়তা ও বাজেট মূল্যায়নে এখন পর্যন্ত এই দুই তারকাই তথাকথিত ফিল্ম বক্স অফিসে গ্রহণযোগ্যতা ধরে রেখেছেন।