বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন

জগতের যত বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান, মাতা ভগ্নি ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহিয়ান। কাজী নজরুল ইসলামের চরণদু’টিই প্রমাণ করে জগতের প্রত্যেকটি সাফল্য, প্রত্যেকটি বিজয়, প্রত্যেকটি সৃষ্টির পেছনে নারীর অবদান কোনো না কোনো ভাবে আছে। নারী মমতাময়ী আশ্রয়ে শিশুকে বড় করেছে, পুরুষের পাশে থেকে প্রেরণা যুগিয়েছে, ভ্রাতৃবন্ধনে সহোদরকে এগিয়ে যেতে পাথেয় যুগিয়েছে। নারীর সাহসে পুরুষ আকাশ জয় করেছে, হিমালয়ে উঠেছে, সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। তবে নারীরা যে শুধু পুরুষকে প্রেরণা, ভালোবাসা, আনন্দ দিয়েছে তেমনটি নয়, সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে নারী পালন করেছে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা। উপমহাদেশের নারীনেত্রী ইলা মিত্র দেখিয়েছেন কীভাবে পরাধীনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার দেখিয়েছেন কীভাবে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম দেখিয়েছেন কীভাবে রাজাকারদের বিচার করতে হয়। বাংলাদেশ পৃথিবীর ক্ষুদ্র একটি জনবহুল দেশ। অত্যন্ত জনসংখ্যার চাপ, দুর্নীতি, গুম-হত্যা ও নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত দেশটি। এতকিছুর পরেও দেশটি এগিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমারা ধারণা করছেন আগামীতে দেশটি অতিসত্বরই উন্নত রাষ্ট্রের সমপর্যায়ে চলে আসবে। তবে নারীর ক্ষমতায়ন বাংলাদেশকে পৃথিবীতে আরেকটি পরিচয় এনে দিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আজ অনেক দেশই অনুসরণীয় বলে মনে করে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের সরকার প্রধান এবং বিরোধী দলের প্রধান উভয়ই হলেন নারী। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এসে নারীর ক্ষমতায়নকে আরও সংহত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০-এ উন্নীত করেছেন। মন্ত্রীসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের অধিষ্ঠিত করেছেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রধান হিসেবেও বাংলাদেশে নারীদের স্থান দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নারীর এত ক্ষমতায়নের পরেও কি এদেশে নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে? নারীদের প্রতি নির্যাতন, বৈষম্য কি সামান্য পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে? উত্তরে বলবো ‘না’। বাংলাদেশ এখনও নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। এখনও পারেনি নারী নির্যাতন রুখতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে। বরং নারীর প্রতি সহিংসতা আরও মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে। মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে এক নারীকে ধর্ষণ করে দিল্লির ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়েছে বাংলাদেশেও। চট্টগ্রামে সিএনজি চালিত অটো রিকশায় ধর্ষিত হয়েছেন এক নারী। নারীর প্রতি যৌন লালসার হিংস তা থেকে বাদ যাচ্ছে না নারী শিশুরাও। নারী আজ কর্মস্থলে নিরাপদ নয়। শিকার হচ্ছে ইভটিজিংয়ের তারই সহকর্মীর দ্বারা। নারী তাই সমাজ থেকে শুধু প্রতারিতই হচ্ছে। তাই বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন হলেও নারীমুক্তি এখানে এখনও আসেনি। শুধু নারীর ক্ষমতায়ন নারীর মুক্তি নিয়ে আসবে না। নারীর মুক্তির জন্য প্রয়োজন পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষের মানসিকতার পরিবর্তন। পুরুষ যতদিন না নারীকে তার সহযোগী ভাবতে শিখবে, যতদিন না নারীকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভাবতে শিখবে ততদিন এ সমস্যার সমাধান হবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়