নার্সারি শিল্পে এসএমই ঋণ
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৩২
নার্সারি শিল্পে সহজ শর্তে ক্ষুদ্র উদ্যোগ বা এসএমই ঋণের প্রবর্তন করা গেলে তা পাল্টে দিতে পারে এদেশের চেহারা। উন্মোচিত হতে পারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। যা কৃষি, পরিবেশসহ সার্বিক অর্থনীতিতেই শুধু ভূমিকা রাখবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাতেও রাখবে অনেক বড় ভূমিকা। এ বিষয়গুলো খোলসা করেছেন টাংগাইলের ঘাটাইল উপজেলার পরিবেশবাদী কৃষক আব্দুল আজিজ। চাষা আজিজ নামে পরিচিত ওই কৃষক ২০১০ সালে লাভ করেন চ্যানেল আই কৃষি পদক। সম্প্রতি মাটি ও মানুষের কৃষিপাতার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি বলেন, আমি বিভিন্ন ব্যাংকে নার্সারির ঋণের জন্য গেলে তারা আমাকে নার্সারির বদলে ফলের প্রক্রিয়াজাতকরণ বা জুস কারখানা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বলেন, এই খাতে ঋণ নিলে তা পেতে সুবিধা হবে। কিন্তু আমি আমার দীর্ঘদিনের নার্সারি শিল্পের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, নার্সারি খাতে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। আর একথা বলাই বাহুল্য যে, সারাদেশেই রয়েছে গাছের ও চারার চাহিদা। যেহেতু একটা গাছে ফল ধরতে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। ১৬ ইঞ্চি একটি টবের দাম সর্বোচ্চ এক’শ টাকা, এই টব মাটি দিয়ে তৈরি করছে দরিদ্র জনগোষ্ঠি, এরও বাণিজ্যিক গুরুত্ব রয়েছে। যদি নার্সারি মালিকরা সহজ শর্তে ঋণ পায়, তাহলে তারা বড় পরিসরে চারা উত্পাদনের আগ্রহ পাবে। একইভাবে তারা কম মূল্যে বিক্রিও করতে পারবেন চারা। টেলিভিশন মিডিয়ার প্রচারসহ বিভিন্ন কারণেই এখন দেশের মানুষের মধ্যে গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে ভালো ও উন্নতমাণের চারা যোগান এখনও সহজপ্রাপ্য নয়। যারা ইতোমধ্যে নার্সারি পেশায় দক্ষতা অর্জন করেছেন বা এক্ষেত্রে যাদের আগ্রহ রয়েছে তারা যদি সহজ শর্তে উদ্যোক্তা হিসিবে ঋণ পায় তাহলে সহজেই নার্সারি গড়ে তুলতে পারে। এর মধ্য দিয়ে একদিকে ক্ষুদ্র পর্যায়ে মৃিশল্প এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে, অন্যদিকে কৃষি ও পরিবেশের মধ্যে নতুন একটি সেতুবন্ধন তৈরি হবে।
সরকার বিভিন্ন দিকেই টাকা বিনিয়োগ করছে কিন্তু সবক্ষেত্রে ওই ঋণ কৃষককে সার্বিকভাবে উপকৃত করতে পারেনা বা পারছে না। আমি বলতে চাই, মশলা ফসলে ঋণের কথা। সরকার ২ শতাংশ সুদে মশলা ফসলে ঋণ দেয়া শুরু করলে দেশে যখন ব্যাপকভাবে মশলা ফসলের চাষ বেড়ে যায়, তখন সরকারের উচিত্ ছিল কৃষকের বাজারমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু গত বছর ও চলতি বছর সারাদেশের কৃষক মশলা ফসলে মার খেয়েছে। এ বছর শুকনা হলুদের দাম ১০০০ টাকা মনে নেমে এসেছে। ইতোমধ্যে দুই শতাংশ হারে ঋণও আর দিচ্ছে না সরকার। সব লোকসানের বোঝা গিয়ে পড়লো কৃষকের কাঁধেই। আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি, সারা বাংলাদেশে প্রচুর সংখ্যক নার্সারি রয়েছে। এই নার্সারি উদ্যোক্তাদেরকে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি উর্দ্ধে ১০ একরে ১০ কোটি ও নিচে ১ একরে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত যদি সুদমুক্ত এসএমই ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয় তাহলে নার্সারিশিল্প প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে যাবে। আর কৃষক যদি একটি ফল গাছ রোপন করে তাহলে দুই-তিন বছরের মধ্যে তার ফল পাওয়া শুরু হয়ে যাবে। এখনকার উন্নত প্রযুক্তিতে নার্সারিতে চারার জাত উন্নয়ন ও বর্ধনের নানা রকমের কৌশল চালু হয়েছে। সেগুলো ব্যবহার করে সারাদেশে সবুজায়ন, ফলের চাহিদা পুরণ সবই সম্ভব। অথচ আমাদের দেশে এখন যতখানি ফসল আবাদের বাইরে জায়গা অবশিষ্ট রয়েছে, তা একেবারে কম নয় সেখানে বৃক্ষ রোপন করে দেশকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। কিন্তু কোন গাছ লাগাতে হবে, ভালো চারা কোথায় পাওয়া যাবে, এ বিষয়গুলো এখনও প্রশ্নসাপেক্ষ।
আমাদের দেশে প্রচুর নার্সারি রয়েছে। কিন্তু নার্সারি উদ্যোক্তারা কোন কিছু বিক্রি করে, কারোর কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায় নার্সারি মালিক সুদ টানতে টানতে আর নার্সারি টানতে পারছেন না। যার জন্য ওই নার্সারি মালিক অনেক বেশি দাম না পাওয়া পর্যন্ত চারা বিক্রি করে না। একজন সৌখিন বাগানমালিক বা কৃষককে দড়া দামে চারা কিনতে গিয়ে অনেক সময় দ্বিধার মধ্যে পড়তে হয়। অথচ এই খাতে যদি প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা যেত। যদি অসংখ্য নার্সারি গড়ে উঠতো ও সুলভমূল্যে উন্নত চারার যোগান দেয়া যেত তাহলে এই খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতো। দেশে বৃক্ষরোপন কর্মসূচি সফল করতে এত দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো না। পাশাপাশি দেশের আপামর জনগোষ্ঠির শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হতো। আজ জলবায়ুর পরিবর্তন ও পরিবেশের বৈরী অবস্থা থেকে কৃষি ও জনজীবনকে বাঁচাতে নার্সারি উন্নয়ন ও বৃক্ষ রোপনের বিকল্প নেই। দেশের পুষ্টি উন্নয়নে অন্য যেকোন উদ্যোগের চেয়ে বচড় উদ্যোগ হতে পারে বেশি বেশি ফল গাছ লাগানো।
কিছুদিন আগে হূদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানে দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে বাংলাদেশের শ্রমিকরা নার্সারিতে কাজ করছে। পৃথিবীর দেশে দেশে নার্সারি শিল্পে দক্ষ শ্রমিকদের প্রয়োজন রয়েছে। আমি মনে করি সরকার যদি এসএমই ঋণ দেয়ার পাশাপাশি অদক্ষ বেকার যুবকদেরকে নার্সারি শিল্পের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করে। তাহলে আক্ষরিক অর্থেই পাল্টে যেতে পারে কৃষি, পরিবেশ। সহজ হতে পারে খাদ্য নিরাপত্তার লক্ষ্যপুরণ।
অনুলিখন : আদিত্য শাহীন