মামলা জটিলতায় পড়েছে জামায়াত নিষিদ্ধের ইস্যু

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধের দাবি মামলার জটিলতায় পড়েছে। সরকার এখন এ দলটি নিষিদ্ধের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ জানিয়েছেন, হাইকোর্টে দায়েরকৃত রিটের শুনানির পরই জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন আগামী ২৬ মার্চের আগেই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শুরু করা যাবে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাইকোর্টে এ সংক্রান্ত বিষয়ে যে রায়ই হোক না কেন বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়াবে। ফলে হাইকোর্টের চূড়ান্ত শুনানি, রায় এবং আপিল কার্যক্রম নিষ্পত্তি করতে ছয় মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংবিধানের নতুন সংযোজিত ৩৮ অনুচ্ছেদের (গ) ও (ঘ) উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকার নির্বাহী আদেশেই জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে। ইতিপূর্বে নির্বাহী আদেশে চারটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন সংবিধানের এই দুই উপ-অনুচ্ছেদের সুবিধাও ছিল না। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চসহ কয়েকটি মহল থেকে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে। ব্লগার রাজীব নিহত হওয়ার পর খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের মাটিতে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি করার কোন অধিকার নেই। জাতীয় সংসদে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি উঠে। কিন্তু কি প্রক্রিয়ায় জামায়াত শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে এ নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। যদিও এর আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছিলেন, আজ (রায়ের দিন) থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। আইনমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর ২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী সংবিধান পুনমুদ্রণ করা হয়। এতে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদটি ফিরিয়ে আনা হয়। ওই অনুচ্ছেদে উল্লেখ ছিল,‘জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে; তবে শর্ত থাকে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী কোন সাম্প্রদায়িক সমিতি বা সংঘ কিংবা অনুরূপ উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোন সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার বা তাহার সদস্য হইবার বা অন্য কোন প্রকারে তাহার তত্পরতায় অংশগ্রহণ করিবার অধিকার কোন ব্যক্তির থাকিবে না’। সংবিধানের এই ক্ষমতাবলে ১৯৭২ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়ে যায়। আপিল বিভাগের নির্দেশের পর ২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি হুবহু এই অনুচ্ছেদটি সংবিধানে ফেরত নিয়ে আসা হয়। কিন্তু মাত্র ৮ মাস এই বিধানটি সংবিধানে ছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৩৮ অনুচ্ছেদটিতে বর্তমান সরকার নতুন করে সংশোধনী আনে। ওই সংশোধনীতে বলা হয়,‘জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে; তবে শর্ত থাকে যে, কোন ব্যক্তির উক্তরূপ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার কিংবা উহার সদস্য হইবার অধিকার থাকিবে না, যদি (ক) উহা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (খ) উহা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (গ) উহা রাষ্ট্র বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোন দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত হয় ; বা (ঘ) উহার গঠন ও উদ্দেশ্য এই সংবিধানের পরিপন্থি হয়।’ ব্যারিস্টার এম আমিরুল ইসলাম মনে করেন, জামায়াত একটি সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠন। সুতরাং সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের (গ) ও (ঘ) উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এর রাজনীতি নিষিদ্ধ করা যায়। এর আগে যখন চারটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, তখন সংবিধানের ওই দু’টি অনুচ্ছেদের ক্ষমতাও ছিল না। তারপরেও সরকারের নির্বাহী আদেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের দায়ে জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, হিযবুত তাহরীর ও ফ্রিডম পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে চায়। এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, জামায়াত ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের রিটের শুনানি দুই সপ্তাহের মধ্যে শুরু করা যাবে। জামায়াত রাজনীতি করতে পারবে কি না বিষয়টি এখন নির্ভর করছে সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের উপর। ২০০৯ সালে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন এক আইনজীবী। কিন্তু এতদিন এই আবেদনের ওপর শুনানি হয়নি। ইতিমধ্যেই আইন মন্ত্রণালয় থেকে ওই মামলাটি শুনানিতে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়ার জন্য এটর্নি জেনারেল অফিসকে তাগাদা দেয়া হয়েছে।