হিরোম্যানের চাপাবাজি

এলাকার উন্নতির জন্য একটা সমবায় সমিতি গঠন করা হবে। সে জন্য গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডাকা হয়েছে। সেখানে হিরোম্যানের নাম নেই। হিরোম্যান হলো, নিজেকে নায়ক হিসেবে পরিচয় দেওয়া একটা ছেলে। সবাই তাকে হিরোম্যান ডাকে।

সভার ঘণ্টাখানেক পর হিরোম্যান দোকানে বসে চা খাচ্ছিল। একটা ছেলে তাচ্ছিল্য করে হিরোম্যানকে বলল, ‘কী হে হিরোম্যান, সবাই সভায় নিমন্ত্রণ পেল, অথচ তোমাকে তো ডাকল না!’

হিরোম্যান বিরক্ত হয়ে বলল, ‘চুনোপুঁটিদের সভায় হিরোম্যান যায় না।’

ছেলেটি হাসল।

হিরোম্যান বলল, ‘হাসছিস কেন! আমার বাবার বাবা ব্রিটিশ আমলে মন্ত্রী ছিলেন। আর আমার বাবা ঢাকা শহরের একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি বড় বড় ক্লাব-সমিতির সভাপতি ছিলেন। তাদের বংশধর হয়ে আমি কি না একটা গ্রাম্য সভায় যাব! ছিঃ ছিঃ! আমার সম্মান তো তোরা ডুবাবি!’

দোকানের সবাই অবাক হয়ে হিরোম্যানের কথা শুনছিল। তার কথা কেউ বিশ্বাস না করলেও কিছু বলার মতো সাহস নেই। কারণ কথার জোরে হিরোম্যান এই এলাকায় সেরা।

আরেকটা ছেলে সাহস করে বলল, ‘আপনার বংশের সবাই এত বড় বড় ছিল, আর আপনি এত ছোট কেন?’

হিরোম্যানের কপালের চামড়া ভাঁজ হয়ে গেল। সে একটু সময় নিয়ে বলল, ‘এই মূর্খ ছেলে! এই অঞ্চলের সবচেয়ে লেটেস্ট, ফিটেস্ট, গ্রেটেস্ট ম্যানটা কে? আমি! আর তুই আমাকে ছোট বললি! শিক্ষার আলো পাসনি তো, তাই কথাবার্তার এমন দশা!’

দোকানজুড়ে হাসির ঢেউ উঠল। ছেলেটি লজ্জা পেল। হাসতে হাসতেই একলোক বলল, ‘আপনি তো টাকা-পয়সা ইনকাম করছেন না, সেই অর্থে বলেছে!’

হিরোম্যান বলল, ‘ওহ! এ তো দেখছি মূর্খের দলনেতা। আরে এই হিরোম্যান যদি টাকা ইনকাম করে, তাহলে তোরা কী করবি? আমার বাপ, দাদায় যা রেখে গেছে; তা খেতে পঞ্চাশ ষাট বছর লাগবে। আমি আর আমার ভবিষ্যত্ সন্তান বসে বসে খাব, আমার নাতি হয়তো কাজটাজ কিছু করতে পারে!’

আবার সবাই হেসে উঠল। তবে একজন বয়স্ক লোক বলল, ‘চাপাবাজি এবার থামা! এত টাকা থাকলে ওই পাড়ার মন্টু মিয়ার কাছ থেকে টাকা ধার এনেছিসনি কেন?’

হিরোম্যান বলল, ‘কী অপবাদ! ব্যাংকের চেক শেষ হয়ে গেছে বলে টাকা উঠাতে পারছি না।’

লোকটি আবার বলল, ‘তুই ধনী হলে টাকা ধার করবি কেন?’

—জ্ঞানবুদ্ধির চরম ঘাটতি বলেই এমন কথা বলছেন! বড় বড় ব্যবসায়ীরও কোটি কোটি টাকা ঋণ আছে! রাষ্ট্রেরও দেনা থোকে। আপনি কি সেই খবর জানেন?

—বুঝলাম। শুনেছি কাওসারের কাছ থেকে টাকা নিয়েও পরিশোধ করোনি?

—ওর ঘরবাড়ি ভালো না। এত টাকা রাখবে কোথায়! আমার কাছে নিরাপদে আছে। আস্তে আস্তে নেবে।

দোকানের লোকজন আবার হেসে উঠল। সেই লোকটা বলল, ‘এইসব হাবিজাবি কথা আর বলিস না। আমরা সব বুঝি।’

—কী বোঝেন আপনি?

—ব্রিটিশ আমলে তোর বাবা মন্ত্রী ছিলেন, এই পচা গল্প বলে লাভ নেই। তখন জমিদারি শাসন ছিল। মন্ত্রীফন্ত্রী কিছু ছিল বলে মনে হয় না।

—আপনি ব্রিটিশ আমল সম্পর্কে আগে লেখাপড়া করে তারপর তর্ক করতে আসেন।

—লম্বাচওড়া কথা ছাড়া তোর আর কিছু নাই! তোর বাবার কথা কী বললি! ঢাকার বিরাট ব্যবসায়ী ছিলেন! যতদূর শুনেছি ঢাকায় টাউটগিরি করেছে। দু নম্বরিতে কিছু ইনকাম করেছে এটা সত্য!

হিরোম্যান অস্বস্তিতে পড়ে গেল। বাঁচার জন্য বলল, ‘আপনাকে দুদিন চা খাওয়াই নাই বলে আপনি আমার বিরুদ্ধে লেগেছেন! কিন্তু আগে তো নিয়মিত খাওয়াতাম। সেটা মনে করে হলেও এভাবে মিথ্যা অভিযোগ করতে পারেন না!’

দোকানের লোকজন আবার হেসে উঠল। হিরোম্যানও হাসতে হাসতে দোকান থেকে উঠে গেল। আরো কিছুক্ষণ থাকলে যে চাপাবাজি ধরা পড়ে যাবে!