স্মরণীয় যাঁরা বরণীয় যাঁরা
‘ বীরবল’ ওরফে প্রমথ চৌধুরী
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৩০
তারুন্য ও যৌবনের উপাসক ,সামাজিক মিথ্যার শত্রু ,পেগান সৌন্দর্যের ভক্ত, সর্বপ্রকার নীতিশাসনের বিরোধী—কৃষ্ণনগরের জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা বীরবল ওরফে প্রমথ চৌধুরী মনে করতেন “ মার্জিত রুচি ,পরিষ্কৃত বুদ্ধি,সংযত ভাষা ও বিনীত ব্যবহার মানুষকে চিরকাল মুগ্ধ করে এসেছে এবং সম্ভব চিরকাল করবে ।” তিনি বলেছেন —“জ্ঞানের প্রদীপ যেখানেই জ্বালো না কেন, তাহার আলোক চারিদিক ছড়াইয়া পড়িবে ।”...‘মনোজগতে বাতি জ্বালানোর ’জন্যে সাহিত্যচর্চার বিশেষ প্রয়োজন । স্বদেশপ্রীতি সম্পর্কে তাঁর অভিমত —আমরা স্বদেশে যাতে বিদেশি না হই, সে বিষয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে । তিনি মানসিক যৌবনকেই সমাজে প্রতিষ্ঠার প্রয়াসী ।কাব্যসাধনা যে কখনও ‘জোর-করা ভাব, আর ধার-করা ভাষা’য় হয় না সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন । সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন—“সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেওয়া —কারো মনোরঞ্জন করা নয়। ...কাউকে শিক্ষা দেওয়াও নয় ।” পাবনার বিখ্যাত চৌধুরী বংশের সন্তান প্রমথ চৌধুরী কেবল কুলে-মানে অভিজাত ছিলেন তা নয়, মনের দিক থেকেও ছিলেন অভিজাত । বাল্যকাল কেটেছে পাবনায়,কৈশোর কৃষ্ণনগরে, যৌবন বিলেত আর কলকাতায়,বার্ধক্য কলকাতা— শান্তিনিকেতনে । বীরবল তাঁর ছদ্মনাম। দিল¬ীপতি সম্রাট আকবরের সভাসদ বীরবলের ছিল প্রখর পরিহাসপ্রবণতা এবং যুক্তিধর্মিতা । যা প্রমথ চৌধুরীকে আকৃষ্ট করেছিল । সাহিত্যে হাস্যরসের বিশেষ প্রয়োজন । এ বিষয়ে তাঁর অভিমত ‘করুণরসে ভারতবর্ষ স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠেছে ।’ তাই ‘বাংলা সাহিত্যের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্যই হাসির চর্চা প্রয়োজন’ । তিনি ‘হাসি ও কান্না’ সনেটে বলেছেন: সত্য কথা বলি, আমি ভাল নাহি বাসি / দিবানিশি যে নয়ন করে ছলছল / কথায় কথায় যাহে ভরে আসে জল / আমি খুঁজি চোখে চোখে আনন্দের হাসি ।’ নানাশ্রেণির মানুষের সাথে তিনি অনায়াসে মিশে যেতে পারতেন । সদালাপী মানুষটি সবাইকে আপনার করে নিতে পারতেন । সহাস্য রসিকতা তাঁর চারিত্র্য । এক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে উপস্থিত ছিলেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ইন্দিরা দেবী । প্রমথ চৌধুরীর বন্ধু সে অনুষ্ঠানে যেতে অনুরোধ করলেন এবং রসিকতা করে ইন্দিরা দেবীর প্রসঙ্গটি তুলে ধরলেন । উত্তরে প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন—‘পরের বাড়ির খুকি দেখবার লোভ আমার নেই ।’ ভাগ্যক্রমে ইন্দিরা দেবীই হন তাঁর সহধর্মিনী (১৮৯৯) । পিতৃপুরুষের বাসভূমি পাবনা জেলার হরিপুর গ্রামের প্রতি আজীবন আকর্ষণ অনুভব করেছেন । তিনি ‘আত্মকথায়’ বলেছেন—‘আমি ছেলেবেলায় কৃষ্ণনগরেই বাস করতুম সাড়ে এগারো মাস ও হরিপুরে পনেরো দিন । কিন্তু হরিপুর আমরা সঙ্গেই এনেছিলুম, তার মানসিক আবহাওয়াও ।’ ‘সবুজপত্রের’ সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষার প্রবর্তক এবং বাকচাতুর্য সমৃদ্ধ প্রাবন্ধিক। কবিতা রবীন্দ্রানুরাগী হয়েও তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী স্বর্ণ পদক লাভ করেন (১৯৩৮) । বিশ্বভারতী পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন । শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী । দর্শনে বি.এ. অনার্স এবং ইংরেজিতে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন । উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন । ইংল্যান্ড থেকে বার-এট.ল. পাস করে কিছুদিন কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা করেছিলেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমথ চৌধুরী সম্পর্কে বলেছেন—“তাঁর চিত্তবৃত্তির বাহুল্যবর্জিত আভিজাত্য-আমাকে আকৃষ্ট করেছে । শান্তিনিকেতনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৬-এ ।