ক্যামেরনের ভারত সফর
বাণিজ্যই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:১৯
সম্প্রতি তিন দিনের সফরে ভারত ঘুরে গেলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। ভারতের কিছু দাবি থাকলে তা কৌশলে এড়িয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু ব্রিটেনের মন্তর অর্থনৈতিক অবস্থায় তার ভারত সফর বিভিন্ন কারণেই তত্পর্যপূর্ণ ছিলো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ সফরে ডেভিড ক্যামেরন ভারতের বিনিয়োগকারী, শিক্ষার্থী ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করে গেছেন। এছাড়া যুক্তরাজ্য ও ইটালির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান অগাস্টা ওয়েস্টল্যান্ডের সঙ্গে হেলিকপ্টার কেনার চুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ভারতকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এসব দিক থেকে তার সফর গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। তবে পুরনো ক্ষত আবারও খোঁচানো হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
ক্যামেরন শুধু ভারতীয় শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেননি, গিয়েছিলেন পাঞ্জাবের অমৃতসরে। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে অন্যতম কুখ্যাত গণহত্যা জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডস্থল এই অমৃতসরেই। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসর শহরে ইংরেজ সেনানায়ক ব্রিগেডিয়ার রেগিন্যাল্ড ডায়ারের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এতে ৩৭৯ জন নিহত ও ১২শ মানুষ আহত হয় বলে তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়। ১৯৯৭ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ পরিদর্শনে গিয়ে প্রিন্স ফিলিপ বলেছিলেন, নিহতের সংখ্যা অতিরঞ্জিত করে বলা হয়েছে। রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এখানে এসে গণহত্যার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি, দুঃখ প্রকাশও করেননি। কিন্তু এবার ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর ধারণা ছিল ব্রিটিশ নৃশংসতার জন্য প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন দুঃখ প্রকাশ করবেন। অনেকেই মন্তব্য করেছিল এবার যদি ক্যামেরন দুঃখ প্রকাশ না করেন তবে তার সফর হবে অর্থহীন। আবার অনেকেই বলছিলেন, তিনি দুঃখ প্রকাশ করলে অনেক ভারতীয় তা স্বাগত জানাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্যামেরন অমৃতসরে গেলেও আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেননি। তবে তার কথায় আন্তরিক অনুতাপের বিষয়টি এসেছে। গত বুধবার সফরের শেষ দিনে তিনি অমৃতসরে গিয়ে বলেন, এ ঘটনা ব্রিটিশ ইতিহাসের একটি লজ্জাজনক অধ্যায়। এ সময় তিনি ঐ স্থানে একটি ফুলের মালা দিয়ে শোক প্রকাশ করেন। বলা হচ্ছে, এখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার একটি বড় কারণ হলো ব্রিটেনে ভালো সংখ্যায় পাঞ্জাবের নাগরিক রয়েছে। এটি ক্যামেরনের ভোট টানার জন্য কাজ করবে।
ক্যামেরন অমৃতসরে গেলেন কিন্তু দুঃখ প্রকাশ করলেন না, এর প্রভাব কেমন হতে পারে এ বিষয়ে বিবিসিকে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ ড. সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী বলেন, একদিক থেকে বিচার করলে অবশ্যই অর্থ রাখে। আজ থেকে ৯৪ বছর আগে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার মানুষের পরিবারের সদস্যদের কাছে তো বটেই সমগ্র ভারতবাসীর কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্যামেরন প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অমৃতসরে এসেছেন। ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি অবশ্য আলাদা। ক্যামেরন গিয়ে বলেছেন, তারা এ ঘটনার জন্য লজ্জিত। শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো অতীতে যে অন্যায় হয়েছে সেটা কার্যত স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। এটা দুইদেশের মানুষের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এছাড়া স্বীকার করে নেয়াটা অনেক সময় দুঃখ প্রকাশের চেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ক্যামেরনের এটি দ্বিতীয়বারের মতো ভারত সফর ছিল। এ সফরে তার সঙ্গী ছিল ১৪০ জনেরও বেশি ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সদস্য। প্রশ্ন হলো এ সফর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর জন্য কোনো কী কূটচাল ছিলো নাকি ঔপনিবেশিক দেশটির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা। ড. সব্যসাচী বসু রায় বলেন, সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পেছনে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া ব্রিটেনে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সংখ্যাও অনেক। যারা নাগরিক হিসেবে ব্রিটেনের ভোটদাতা। এক্ষেত্রে নির্বাচনী স্বার্থও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যামেরন এলেন, দেখলেন এবং তার বক্তব্য তুলে ধরলেন। তিনি এবার ভারতীয় তরুণদের হূদয় ছুঁয়ে গেছেন। ইউরোপের বাইরে শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া কঠোর করার কারণে গত বছর দেশটিতে ভারতীয় শিক্ষার্থী যাওয়ার হার ৩০ শতাংশ কমে গেছে। ক্যামেরন এবার ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব অনেক। ইউনিভার্সিটি টু ইউনিভার্সিটি সহযোগিতা বৃদ্ধিতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। প্রযুক্তি হস্তান্তর, সহ-উন্নয়ন ও সহ-উত্পাদনের মাধ্যমে ভারতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প বিকাশে দুইদেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। ক্যামেরন ২০১০ সালে প্রথম ভারত সফরে আসেন। তখন দুইদেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১১-১২ সালে তা ১৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে হয়েছে। ভারতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগকারী ইউরোপীয় দেশ হলো ব্রিটেন। ক্যামেরন বলেন, ২০১৫ সালের মধ্যে এ বাণিজ্যের পরিমাণ ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে দুইদেশ এগিয়ে চলেছে।
ক্যামেরন ঘোষণা দিয়েছেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ব্রিটেনে যেতে চাইলে অন অ্যারাইভাল ভিসার ব্যবস্থা করা হবে। মুম্বাইয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, আমরা চাই আপনারা দ্রুত আমাদের দেশে আসুন, বিনিয়োগ করুন এবং আমাদের দেশকে সহায়তা করুন। ভারতেরও উচিত তাদের বাজার উন্মুক্ত করা। যাতে এখানে সরাসরি বিনিয়োগ করা যায়।
ক্যামেরনের আসার কিছ দিন আগে ভারত সফর করে গেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রানকোইস ওলান্দে। সেই সফরে ভারতের সঙ্গে ১২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি করে গেছেন তিনি। এর দুই মাস আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুটিনও ভারত সফরে আসেন। সে সময় ৭১টি সামরিক হেলিকপ্টার বিক্রির বিষয়ে চুক্তি করেন তিনি। বিকাশমান অর্থনীতির দেশ হওয়ায় ভারত নিয়ে এসব বড় অর্থনীতির দেশগুলোর আগ্রহ থাকবেই। কিন্তু ক্যামেরন ভারতের সঙ্গে একটি বিশেষ সম্পর্ক তৈরির জন্যই সফরে এসেছিলেন। অনেকেই বলেছেন, ক্যামেরন যথাযথভাবে দুঃখ প্রকাশ করলে ভারতের সঙ্গে যে ধরনের বিশেষ সম্পর্ক চাইছেন তা স্থাপন করা হয়তো সম্ভব হতো।