লন্ডনে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশরা সংখ্যালঘু!
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:২১
সামপ্রতিক আদমশুমারির তথ্য-উপাত্ত বেশ ভাবিয়ে তুলেছে ব্রিটিশদের। লন্ডনে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশরা কমতে কমতে সংখ্যালঘুতে গিয়ে ঠেকেছে। নতুন জনসংখ্যা জরিপ অনুযায়ী, রাজধানীতে এখন শ্বেতাঙ্গদের সংখ্যা মাত্র ৪৫ শতাংশ। গোটা যুক্তরাজ্যের মধ্যে লন্ডনই প্রথম, যেখানে শ্বেতাঙ্গরা এখন সংখ্যালঘু। রক্ষণশীল জাতি বলে খ্যাত শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশরা লন্ডন ছেড়ে গেলো কোথায়? আর কেনই তারা লন্ডন ছাড়ছেন? এ নিয়েই ব্রিটিশরা এখন মহাচিন্তিত। গত ১১ ডিসেম্বর আদমশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে চলছে নানামুখি গবেষণা, পর্যালোচনা।
শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রথম কারণ হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই অভিবাসনের কথা উঠে আসে। ২০০১ সালের আদমশুমারির সাথে তুলনা করে বলা হচ্ছে, যুক্তরাজ্যের ৬০ শতাংশ জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ অভিবাসন। রাজধানী হিসেবে লন্ডনেও বাহিরাগতদের সংখ্যা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। বর্তমান হিসেবে এ এলাকার ৩৭ শতাংশ অর্থাত্ প্রতি তিনজনের একজন বহিরাগত, যাদের জন্ম যুক্তরাজ্যের বাইরে অন্য কোন দেশে।
নতুন জরিপে বলা হচ্ছে, লন্ডনের নিউহ্যাম ও বার্কিং অ্যান্ড দাগেনহ্যামে গত দশকে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের সংখ্যা কমেছে ৩০ শতাংশেরও বেশি। রেডব্রিজেও কমেছে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। নগরীর অন্যান্য এলাকাতেও এ হার উল্লেখযোগ্য। এর বিপরীতে লন্ডনের বাইরে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের সংখ্যাধিক্যের হিসেবই প্রমাণ করে আদি ব্রিটিশরা অভ্যন্তরীণ বা অন্য দেশীয় অভিবাসীদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। আদি ব্রিটিশদের পারিবারিক সম্পত্তি নির্ভরতার কারণে উচ্চমূল্যের বাজারে লড়াই করেও টিকে থাকতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে তারা ঠিকানা খুঁজে নিচ্ছেন অন্যত্র। এর প্রমাণও মিলেছে ব্রিটিশদের সম্পত্তির মালিকানার পরিবর্তনের সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেবে।
আদমশুমারি অনুযায়ী, গত ১০ বছরে লন্ডন ছেড়ে গেছে ৬ লাখ ২০ হাজার শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ। তাদের স্থান দখল করেছে এশিয়ার অভিবাসীরা। তাদের কাজ করে খাওয়ার উচ্চ মানসিকতা ও অর্থনৈতিক সফলতার কারণেই আদি ব্রিটিশরা লন্ডনে টিকতে পারছেন না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ জন্য অর্থনৈতিক মন্দা এবং লন্ডনের সর্ববৃহত্ কার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফোর্ড কারখানা বন্ধ হওয়াকেও অনেকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, এলাকার অর্থনৈতিক ইঞ্জিন বন্ধ হবার পর স্থানীয় বহু ব্রিটিশ নিজেদের ভবিষ্যত্ নিয়ে হতাশায় পড়েন। মন্দায় লন্ডনের বার্কিং অ্যান্ড দাগেনহ্যামে এক দশকের পূর্ণদিবস কর্মসংস্থানের পরিমাণ কমে যায় এক-চতুর্থাংশ।
অন্য দেশ থেকে আগত মানুষের পাশাপাশি কেউ কেউ বেশ গুরুত্বের সাথেই বলছেন অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের কথা। যদিও এর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব কষা বেশ কঠিন। তবু প্রশ্ন হলো, ৬ লাখ ২০ হাজার ব্রিটিশের লন্ডন ত্যাগের স্থলে যদি যুক্তরাজ্যের অন্যান্য স্থানে তাদের সংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজার বেড়ে থাকে, তাহলে বাকি ৪ লাখ গেলো কোথায়? জনসংখ্যাতাত্ত্বিকরা বলছেন, এর কারণ হতে পারে ব্রিটিশদের কম জন্মহার ও দেশান্তরিত হওয়া।
সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ। ২০০১ সালের আদমশুমারিতে বার্কিং অ্যান্ড দাগেনহ্যামে ৮০ শতাংশ মানুষ নিজেদের শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ বলে পরিচয় দিয়েছিল, ২০১১ সালের আদমশুমারিতে ঐ এলাকার ৪৯ শতাংশ বাসিন্দা নিজেদের শ্বেতাঙ্গ এবং ব্রিটিশ বলে পরিচয় দিয়েছে। লন্ডনত্যাগী কেউ কেউ জানান, প্রতিবেশীদের সাথে সংস্কৃতি ও ভাষাগত অমিল থাকায় তারা সে স্থান ত্যাগ করেছেন। তারা বলেন, এলাকায় টি রুম ও রেস্টুরেন্টের বদলে আমদানিকৃত চিকেন শপ ও হালাল সুপারমার্কেট প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সব মিলিয়ে লন্ডনে বা যুক্তরাজ্যে থাকতে হলে বিপুল নগদ অর্থের প্রয়োজন। এ কারণে অনেকেই লন্ডনের বাসা ভাড়া দিয়ে সমুদ্র তীরবর্তী বা অন্য কোন স্থানে সস্তায় ছোট কটেজ ভাড়া করে থাকছেন।
লন্ডনে সাদা চামড়ার ব্রিটিশদের সংখ্যা কমে যাওয়ার এ রকম বিভিন্ন কারণ ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তবে সব দেশের মতোই যুক্তরাজ্যের আদমশুমারিতেও বেশ গুরুত্ব দেয় হয়েছে ধর্মকে। এতে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হলো, কোন ধর্মই মানে না, এমন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বলা হয়েছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা কমে গেলেও তা এখনো সর্বোচ্চ। তাদের সংখ্যা ৩ কোটি ৩২ লাখ। যাদের হার মোট জনসংখ্যার ৫৯.৩ শতাংশ। দশকের শুরুতে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের এই হার ছিলো প্রায় ৭২ শতাংশ। ধর্মীয় সংখ্যাধিক্যের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মুসলমানরা। গত এক দশকে যাদের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়েও চিন্তিত ব্রিটিশরা। যুক্তরাজ্যে বর্তমানে মুসলমানদের সংখ্যা ২৭ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ শতাংশ। তবে ধর্ম নেই এমন ব্যক্তির সংখ্যা আরো বেশি, জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ। এ তথ্যটিও কম ভাবায়নি ব্রিটিশদের।