নতুন তথ্যচিত্র প্রকাশ

প্রভাকরণপুত্রকে হত্যা করা হয়েছিল

কিশোরটির নাম বলচন্দ্রন। ব্রিটিশ মিডিয়া দাবি করেছে, তাকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। বলচন্দ্রনের অপরাধ— সে শ্রীলঙ্কার তামিল টাইগার গেরিলা নেতা ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের পুত্র। প্রভাকরণের মৃত্যুর পর তার ১২ বছর বয়সী পুত্র বলচন্দ্র কীভাবে নিহত হয়েছে বাইরের পৃথিবী তা জানতো না। শ্রীলঙ্কা সরকার বলে আসছিল, বলচন্দ্র শ্রীলঙ্কার সৈন্যদের সঙ্গে গুলিবিনিময়ে নিহত হয়েছে। কিন্তু গোপনে ধারণকৃত কয়েকটি ছবিতে ধারণা করা হচ্ছে, সরকারি ভাষ্য সত্য নয়। স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, শ্রীলঙ্কার সৈন্যরা প্রভাকরণের বন্দি পুত্রকে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে। তবে শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনীর তরফে এগুলোকে মিথ্যে ও গুজব বলে দাবি করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার রুওয়ান ওয়ানিগাসুরিয়া জানান, শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এর আগেও এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের বিরুদ্ধে কোনো তথ্যপ্রমাণ পেশ করা হয়নি, ফলে কোনো তদন্ত করা সম্ভব নয়। ‘নো ওয়ার জোন— দ্য কিলিং ফিল্ডস অফ শ্রীলঙ্কা’ নামের ওই তথ্যচিত্র জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের পরবর্তী অধিবেশনে দেখানো হবে। প্রথম ছবিতে দেখা যায়, শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনীর কাছে অক্ষত বলচন্দ্রন প্রভাকরণ বসে রয়েছে একটি বাঙ্কারে। তার পরের ছবিতেই দেখা গেছে গুলিতে ঝাঁঝরা বলচন্দ্রের ছোট্ট দেহ পড়ে রয়েছে মাটিতে। ২০০৯ সালের মে মাসে ছবিগুলো তোলা হয়। এর আগে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশ হয় যে, সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন প্রভাকরণের অশীতিপর পিতা। রাজধানী কলম্বোর অদূরে অবস্থিত পানাগোদা সেনাক্যাম্পে গত ২০১০ সালের ৬ জানুয়ারি বুধবার রাতে প্রভাকরণের পিতা নিহত হন। তামিল বিদ্রোহীরা তাদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই করে আসছিল ১৯৭২ সাল থেকে। তামিলদের প্রতি শ্রীলংকার সংখ্যাগুরু সিংহলি জনগোষ্ঠীর বৈষম্য দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং প্রতিবাদ আন্দোলনে যোগ দেন প্রভাকরণ। প্রভাকরণের কথায়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রবাদ পুরুষ সুভাষ চন্দ্র বসু এবং ভগত সিং তাকে প্রভাবিত করেছিল। এছাড়া আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট ও নেপোলিয়ানের জীবনও মুগ্ধ করেছিল প্রভাকরণকে। ১৯৭৩ অথবা ১৯৭৪ সালে প্রভাকরণ ‘তামিল নিউ টাইগারস’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম দিকে এই সংগঠনটি তামিলদের প্রান্তিক অবস্থার প্রতিবাদকারী একটি সংগঠনের মতো কাজ করছিল। এক বছর পর যা লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল এলাম বা এলটিটিই নামে গড়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালে প্রভাকরণের বিরুদ্ধে জাফনার মেয়রকে হত্যার অভিযোগ ওঠে। আর তারপরেই টাইগাররা ১০ হাজারেরও বেশি সদস্যদের দুর্ধর্ষ এক বাহিনীতে পরিণত হয়। খুব শীঘ্রই অর্থ সংগ্রহের জন্য একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন প্রভাকরণ। গড়ে তুলেছিলেন লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল এলাম-এর নিজস্ব স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী। ২০০৭ সালে নরওয়ের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা ভেঙ্গে গেলে, চূড়ান্তভাবে এলটিটিই বিদ্রোহ দমনের সিদ্ধান্ত নেয় কলম্বো সরকার। তারপর থেকে শ্রীলংকা সরকার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করলে, একের পর এক এলাকা তামিল বিদ্রোহীদের হাতছাড়া হতে থাকে। ২০০৯ সালের গোড়ার দিকে টাইগারদের প্রশাসনিক রাজধানী কিলিনোচ্ছি হাতছাড়া হলে, শোচনীয় অবস্থায় পড়েন প্রভাকরণ। কয়েক মাসে শ্রীলংকার সেনাবাহিনীর কাছে একের পর এক ভূখন্ড হারাতে থাকে তামিল টাইগাররা। উত্তর-পূর্ব শ্রীলঙ্কার মুল্লাইতিভুর অদূরে ২০০৯ সালের মে মাসে শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনীর চূড়ান্ত পর্যায়ের অপারেশনে মারা যান সপারিষদ ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ। তাঁর স্ত্রী মাথিবাদিনী, মেয়ে দ্বারকা, বড় ছেলে তথা এলটিটিই-এর বিমান শাখার প্রধান চার্লস অ্যান্টনি এবং ছোট ছেলে, ১২ বছরের বলচন্দ্রনও নিহত হন।