জনশক্তি রফতানি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা

দেশের অর্থনীতি গতিশীল রাখতে প্রবাসী রেমিটেন্সের ভূমিকা অনেকখানি। রেমিটেন্স প্রবাহ কমে গেলে অর্থনীতিতে তার মারাত্মক প্রতিফলন ঘটবে। রেমিটেন্সের চাকা সচল রাখার জন্য প্রয়োজন জনশক্তি রপ্তানি অব্যাহত রাখা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে সরকারের এদিকে তেমন খেয়াল নেই। শুধুমাত্র মালয়েশিয়া ছাড়া অন্য কোনো দেশে উল্লেখযোগ্য হারে জনশক্তি রপ্তানির পথ মূলত বন্ধ। দেশের মধ্যে রেমিটেন্সের বড় অংশটাই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে জনশক্তি প্রেরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশ সফর করলেও ফলাফল শূন্য। একটি দেশের অর্থনীতির ভিত যেখানে জনশক্তি বলয়ে সেখানে সরকারের গাফিলতি চোখে পড়ার মতো। রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে দায়ী। এমনিতেই বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার কবলে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে অরাজকতা। সেখানে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে দেশের জনশক্তিকে। তাতে পুনর্গঠন ছিল জরুরি। তা না হয়ে আমাদের সাধ্যটুকুও হাতছাড়া করতে চলেছি। বেসরকারিভাবে ২০০৭-২০০৮ সালে চার লাখেরও বেশি জনশক্তি মালয়েশিয়া পাঠানো হয়েছিল। তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি তিন লাখ টাকারও বেশি নিয়েছে দালাল এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। কোনো কোম্পানিতে হয়তো একশো লোক প্রয়োজন সেখানে জালিয়াতি করে তারা এক হাজার লোক পর্যন্ত পাঠিয়েছে। এসবের কারণে মালয়েশিয়া গিয়ে হাজার হাজার শ্রমিককে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হয়েছে। অসহনীয় দুর্ভোগে পড়ে টিকতে না পেরে তারা শূন্য হাতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিল। তখন মালয়েশিয়ার সরকার বাংলাদেশের এ অরাজকতা দেখে জনশক্তি রফতানি বন্ধ করে দিয়েছিল। সে দুর্যোগ এখন কেটে গেছে। তা ধরে রাখা রাষ্ট্রের জন্য এখন অপরিহার্য। সরকারি ব্যবস্থাপনাতেই মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিদেশে লোক পাঠানো নিয়ে দেশের মধ্যে যে অরাজকতা সৃষ্টি হয় এবং মানুষ ভোগান্তির শিকার হন তা রোধ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হলেও সরকারের পক্ষে অসম্ভব নয়। দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখছে প্রবাসী রেমিটেন্স। কিন্তু সে তুলনায় শ্রমিকরা কখনোই সরকারের সহযোগিতা এবং আনুকূল্য পায়নি। রফতানিকারক এবং দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেক মানুষকে তাদের ভিটে-বাড়ি পর্যন্ত হারাতে হয়েছে। অনেককে জীবনযুদ্ধে হেরে যেতে হয়েছে শুধুমাত্র সঠিক পথের সন্ধান না পাওয়ার কারণে। জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন (বায়রা) সরকারি ব্যবস্থাপনার বদলে বেসরকারি রফতানিকারকদের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর দাবি তুললেও তা নাকচ করে দিয়েছেন শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী । তাঁর এ দৃঢ়তায় বাংলাদেশ আরো একটি অরাজকতা থেকে হয়তো রক্ষা পেলো। জনশক্তি রফতানিখাতের বিশৃংখলা ঠেকাতে সরকারি পর্যায়েই মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানো শুরু হবে। সেখানে বর্তমানে তালিকাভুক্ত ২ লাখ ৬৭ হাজার অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে। এরই মধ্যে তাদের বৈধ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকার অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিশৃংখলা রোধে সরকারি পর্যায়ে লোক পাঠাবে। তবে স্বার্থান্বেষী একটি মহল বেসরকারি ব্যবস্থাপনাতেই লোক পাঠানোর জন্য বিভিন্ন তদবির করেছিল। সরকার সেদিকে না গিয়ে লটারির মাধ্যমে দেশব্যাপী যে ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছে তা হবে খুবই ফলদায়ক। অঞ্চল ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের বৃহত্তম শ্রমবাজার। আর দেশ ভিত্তিতে সবচেয়ে বড় দুই শ্রমবাজার হলো সৌদিআরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সৌদিআরবে গত চার বছর ধরে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ প্রায় বন্ধ রয়েছে। গত বছর মাত্র ২ হাজার ১৩২ জন বাংলাদেশি কর্মীকে সৌদিআরবে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। আরব আমিরাতে গত বছর একজন শ্রমিকও যেতে পারেনি। কুয়েতে গেছে মাত্র ৮০৪ জন শ্রমিক। সৌদিআরব, কুয়েত ও মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি বন্ধ থাকার পর গত চার বছর ধরে আরব আমিরাতই ছিল বাংলাদেশের মূল শ্রমবাজার। কয়েক বছর ধরে গড়ে প্রতি মাসে ৩০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আরব আমিরাতে যাচ্ছিলো। এ শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ায় প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক শ্রমবাজারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় শ্রমিকদের বেতন বেশ ভালো। এসব বাজার হাতছাড়া হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবও পড়েছে শ্রমবাজারে। এসব দেশের মধ্যে লিবিয়া ও বাহরাইন ছিল বাংলাদেশের বেশ বড় শ্রমবাজার। এ দুটি দেশের বিশেষত লিবিয়ার পরিস্থিতি শ্রমবাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বড় বাজারগুলো ধরে রাখতে ব্যর্থতার একটি বড় কারণ দক্ষ শ্রমিকের অভাব। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার শ্রমিকরা এক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ায় বাজার চলে যাচ্ছে তাদের দখলে। দক্ষ শ্রমিক গড়ে তুলতে না পারাটা আমাদের সরকারের ব্যর্থতা। মধ্যপ্রাচ্যে বাজার হারিয়ে সরকার নতুন বাজারের সন্ধান করছেন । তবে এক মালয়েশিয়া ছাড়া এক্ষেত্রে সাফল্য খুব বেশি নয়। মালয়েশিয়ায় সরকারি উদ্যোগে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ আমাদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য অবশ্যই একটি সুসংবাদ। তবে এর পাশাপাশি দরকার আরও কিছু বড় বাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়া। আমাদের কূটনীতিকরা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারলে এক্ষেত্রে সাফল্য মিলতে পারতো। কয়েকটি বড় শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পরপরই এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য জোর কূটনৈতিক তত্পরতার প্রয়োজন ছিল। হারানো শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার এবং নতুন শ্রমবাজার সন্ধানে উদ্যোগ ততটা ছিল না। এখনও যদি এ ব্যাপারে সরকারের টনক না নড়ে তাহলে অচিরেই বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত হুমকির মুখে পড়বে। কূটনৈতিক তত্পরতার পাশাপাশি শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়াও জরুরি। এ লক্ষ্যে সারাদেশে গড়ে তুলতে হবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এ পদক্ষেপ না নিলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হবে আমাদের শ্রমিকদের। আরও একটি বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি দেয়া জরুরি। আগামী দু’বছরের মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের ব্যবস্থা করা না গেলে তাদের বিদেশে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। এতে জনশক্তি রফতানিতে তো বটেই, বিদ্যমান শ্রমবাজারেও বড় ধরনের ধস নামতে পারে। এ বিপর্যয় এড়াতে সরকারকে এখনই উদ্যোগী হতে হবে। দেশের বর্তমান রিজার্ভ রেকর্ড পরিমাণ থাকলেও রেমিটেন্সের গতি কমে গেলে অর্থনীতির জন্য তা বিপদ ডেকে আনবে। সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে অন্য দেশেও শ্রমিক পাঠানোর পথ আরো প্রসারিত করবে সেটাই দেশের মানুষের কামনা। নারায়ণগঞ্জ