শিক্ষায় ডিজিটালকরণ : কম্পিউটার সাক্ষরতা

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সুলতান মাহমুদ রানা-র লেখা ‘শিক্ষায় ডিজিটালকরণ : আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ পড়ে আমার নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণ উপস্থাপনের ইচ্ছা জাগলো। নিবন্ধকার ঐ নিবন্ধে ডিজিটাল শিক্ষায় তথ্য ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তবে এক্ষেত্রে আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন পরবর্তী এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষার পূর্ববর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেননি। যে বিষয়টি নিবন্ধকার তুলে ধরেননি সেটি আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত যথাযথ ব্যবহারের জন্য অপরিহার্য। বর্তমান নিবন্ধটি আগে প্রকাশিত নিবন্ধের সঙ্গে সামান্য যোগ করার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র । নিবন্ধকার উল্লেখ করেছেন— “সরকার জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে, উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে, সমাজের অবহেলিত জনগণসহ সবার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে, সরকারি কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে তথ্যপ্রযুক্তিসহ অন্যান্য জুত্সই প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। ডিজিটাল স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি শিক্ষিত দেশ এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষা।” তিনি প্রযুক্তিগত শিক্ষার কথা উল্লেখ করলেও প্রযুক্তিগত শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য যে কম্পিউটার সাক্ষরতা বা জ্ঞান প্রয়োজন সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা দেননি। কম্পিউটার সাক্ষরতাকে শিক্ষায় ডিজিটালকরণে অপরিহার্য উপাদান এবং অন্যতম পূর্বশর্তও বলা যেতে পারে। কম্পিউটার সাক্ষরতা ছাড়া শিক্ষায় ডিজিটালকরণ একেবারেই অসম্ভব এবং অকল্পনীয়। কম্পিউটার সাক্ষরতা হলো কম্পিউটার সম্পর্কিত এমন জ্ঞান ও যোগ্যতা যা দ্বারা কম্পিউটার এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত দক্ষতা যথাযথ ব্যবহার, মৌলিক কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার এবং অন্যান্য অ্যাপ্লিকেশন ও প্রয়োজনীয় সমস্যা সমাধানে পারদর্শিতা অর্জন করা যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটালকরণে সংশ্লিষ্ট জনসম্পদ তথা প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাইকে এই সাক্ষরতার আওতায় আনলে এর যথাযথ প্রয়োগ যথার্থই হবে বলে মনে হয়। পাঠ্যপুস্তকে কম্পিউটার বিষয়ে মৌলিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক শিক্ষায় ডিজিটালকরণের আরো একধাপ অগ্রসর হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে নবম-দশম শ্রেণিতে কম্পিউটার শিক্ষা পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেও তা কেবল পুঁথিগত জ্ঞান ছাড়া কিছু নয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ও মৌলিক ব্যবহারিক কম্পিউটার শিক্ষা। প্রয়োজনে সহায়ক অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার ও প্রয়োজনীয় সমস্যা সমাধানে ব্যাপক ধারণা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। মহাজোট সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষায় ডিজিটালকরণে কম্পিউটার সাক্ষরতাকে অপরিহার্য করণীয় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ব্যক্তি থেকে সরকারি পর্যায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে এ আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। দেশে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করতে গণস্বাক্ষরতা আন্দোলন এবং বিভিন্ন কর্মসূচি হয়েছে। সরকারের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় ১৯৯১ সাল থেকে এ আন্দোলন শুরু হয় । মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রম, মন্দিরভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রম এমনকি পাড়ায়-মহল্লায় গণশিক্ষা স্কুল প্রভৃতি কার্যক্রমের মাধ্যমে এ স্বাক্ষরতা আন্দোলনে প্রাণ পায় । সরকারি ওয়েবসাইট তথ্য মোতাবেক বাংলাদেশ স্বাক্ষরতায় ২৪ শতাংশ থেকে ১০০ ভাগ পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয় । বাংলাদেশের হাজার লোক নিরক্ষর থেকে স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন হয়েছে । যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে আজ সেই জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তিগত শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন কম্পিউটার সাক্ষরতা। এ কম্পিউটার সাক্ষরতায় ব্যাপকভাবে জনদক্ষতা তৈরিতে অতীতের মতো সাক্ষরতা আন্দোলন করা যেতে পারে এবং সেটা হবে কম্পিউটার বা প্রযুক্তিগত শিক্ষার ওপর । কম্পিউটার বা প্রযুক্তিগত শিক্ষাক্ষেত্রে মৌলিক যে সকল বিষয় জানতে হবে, তা হলো কম্পিউটার পরিচিতি, কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরিচিতি, কম্পিউটারে বিদ্যুতের ব্যবহার,কম্পিউটার পরিচালনা, মাউস এবং কির্বোড ব্যবহার, ইংরেজি লিখন, বাংলা লিখন, সহায়ক অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার, মাইক্রোসফট অফিস প্রোগ্রামসমূহের ব্যবহার, ইন্টারনেট সংযোগ ও ব্রাউজিং, ইন্টারনেটে তথ্য অনুসন্ধান ও ব্যবহার, ই-মেইল যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগ ও আন্তঃকম্পিউটার নেটওয়ার্কিং প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন প্রয়োজন। পাশাপাশি কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট কিছু ইংরেজি টার্মস জানাও জরুরি। জনগণের অধিকাংশ কম্পিউটার সাক্ষরতা অর্জন করতে না পারলে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে। গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে জাতীয় ই-সেবা পদ্ধতি, অব্যবহূত থেকে যাবে জাতীয় ই-তথ্যকোষ, অকার্যকর হয়ে পড়বে শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তি, অকার্যকর হয়ে পড়বে অনলাইন আউট সোর্সিং-এর মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিকল্পনাও। যতক্ষণ পর্যন্ত কম্পিউটার সাক্ষরতা বা কম্পিউটার বিষয়ে কোনো জ্ঞান অর্জন না করছি ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষায় ডিজিটালকরণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কাজেই জাতিকে ডিজিটালে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে জনসাধারণের মধ্যে কম্পিউটার সাক্ষরতা তথা কম্পিউটার জ্ঞানে পারদর্শিতা ও সচেতনতা সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তবেই ডিজিটাল বাংলাদেশকে কার্যকর অর্থে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এ রূপান্তর সম্ভব হবে। ঢাকা