রেন্টাল-কুইক রেন্টাল ও আমদানির বেড়াজালে বিদ্যুত্

দেশের বিদ্যুত্ সমস্যা মেটাতে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুত্ কিনতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের নাভিশ্বাসের পর এবার ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানির সিদ্ধান্তে বিশেষজ্ঞ মহলের চিন্তায় নতুন টানাপড়েন শুরু হয়েছে। কেননা কয়লা দিয়ে সস্তায় বিদ্যুত্ উত্পাদনের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকার বা সংশ্লিষ্ট বিভাগ কেন সেদিকে দৃষ্টি দিচ্ছে না তা নিয়েও শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এনামুল হক ৩১ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে তথ্য দিয়েছেন যে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল থেকে বিদ্যুত্ কেনার ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৬ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। তিনি ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানির তথ্য দিলেও এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কী দাঁড়াবে তা উল্লেখ করেননি। তিনি সংসদকে আরও জানিয়েছেন যে বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান সরকারের সময়েই ছয়বার বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে বিদ্যুত্ ব্যবহারকারীদের ওপর এবং সরকারকেও আর্থিক দায় মেটাতে হচ্ছে। সরকারের সাহসী পদক্ষেপের অভাবেই বাড়ছে বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যয়—এমনটাই মনে করছেন দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা সস্তায় বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য কয়লাকেই একমাত্র অবলম্বন হিসাবে স্বীকার করলেও সরকার এক্ষেত্রে উদ্যোগ না নেওয়ায় বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। দেশের ব্লাক গোল্ড খ্যাত কয়লা মাটির নিচ থেকে উত্তোলন নিয়ে যা চলছে তা সব আবেগনির্ভর। দেশের উন্নয়নে বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য কয়লার গুরুত্ব বিবেচনা করে সব সরকারের সময়ে কয়লা তোলার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু সুযোগ সন্ধানী একটি মহলের উস্কানিতে কয়লা খনি এলাকার বাসিন্দাদের ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলা হচ্ছে। দৃশ্যত তাদের প্রতিহত না করায় খনিগুলো থেকে উত্পাদনও শুরু হচ্ছে না। এক্ষেত্রে মতবিরোধ মোকাবিলায় সরকারের দৃঢ় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সম্প্রতি বৈশাখী টেলিভিশনে প্রচারিত এক টকশো ‘এনার্জি টক’-এ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইজাজ হোসেন ভবিষ্যতে দেশে প্রাথমিক জ্বালানির জোগান নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যে জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হয় সেই গ্যাস, তেল বা কয়লার অভাবই বাংলাদেশের জ্বালানি সেক্টরে মুখ্য সমস্যা। প্রাথমিক জ্বালানি পাওয়া গেলে বিদ্যুত্ এমনিতেই উত্পাদিত হবে। তিনি বলেন, শিল্প সমৃদ্ধির জন্য আমাদেরকে জ্বালানির দাম কমিয়ে রাখতে হবে। তা করতে গেলে সস্তায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। প্রফেসর ইজাজ হোসেন বলেন, তেলচালিত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র সঙ্কটের সাময়িক সমাধান, তবে বিদ্যুত্ উত্পাদনে টেকসই জ্বালানি তথা গ্যাস বা কয়লার উেসর দিকেই যেতে হবে। তিনি বলেন, দেশে মজুদ এ কয়লা আমাদের সমস্যা সমাধানের বড় সম্পদ। কারণ দেশে গ্যাস থাকলেও খুব তাড়াতাড়ি নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হবে বলে মনে হয় না। গ্যাস বাদে বিকল্প তো কয়লাই। উন্মুক্ত খনি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কম দামে বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য আমাদের প্রয়োজন প্রচুর কয়লা। বড়পুকুরিয়ায় আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিং নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। সেখানে কয়লার বিপুল মজুদ থেকে মাত্র ৮ ভাগ তোলা হচ্ছে, এটা পরিতাপের বিষয়। তাছাড়া সেখানে ভূমি ধসের সমস্যাও রয়েছে। আমাদের যে বিপুল পরিমাণ কয়লা প্রয়োজন, তা আসতে পারে উন্মুক্ত খনি থেকেই। নিরপেক্ষ ও স্বাধীন মতামত গ্রহণ করে কয়লা বিতর্কের অবসান ঘটানো যায় বলে তিনি প্রত্যাশা করেন। টকশো-তে জিসিএম রিসোর্সেস-এর পরিচালক গ্যারি এন লাই বলেন, সরকারের সঙ্গে চুক্তির আওতায় কোম্পানি উত্তরাঞ্চলে কয়লা অনুসন্ধান ও উত্তোলনের লক্ষ্যে নিয়োজিত। দিনাজপুরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ৪টি উপজেলা নিয়ে ফুলবাড়ি কয়লা প্রকল্পে বিস্তারিত সমীক্ষা চালিয়ে ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ পাওয়া গেছে। এই কয়লা দিয়ে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করা সম্ভব। প্রকল্পের নেতিবাচক প্রভাব সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে গ্যারি এন লাই বলেন,্ সেসব তথ্যভিত্তিক নয়, নিছক প্রচারণা মাত্র। এই খনি দেশের ক্ষতি করবে না, বরং বিপুল সুফল বয়ে আনবে। বড় অর্জন হবে বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ কয়লাপ্রাপ্তি। বিদ্যুত্ থাকলে উত্তরাঞ্চলসহ সারাদেশে শিল্পের জোয়ার বইবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যয় সবচেয়ে কম, ফলে বিদ্যুত্ উত্পাদনে লোকসান ও ভর্তুকি লাঘব হবে। অবহেলিত রংপুর বিভাগসহ সারাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে। ভারতে যেখানে বিদ্যুত্ উত্পাদনে কয়লার অবাধ ব্যবহার হচ্ছে এবং উত্পাদিত বিদ্যুত্ বাংলাদেশে আমদানি করার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা খরচের আয়োজন করেছে। শুধুমাত্র সরকার সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেই এ সংকট উত্তরণ করতে পারে। দিনাজপুরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ৩টি খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে বিদ্যুত্ উত্পাদনে গেলে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করেও বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। বড় পরিতাপের বিষয়, বাম মোর্চার নেতৃত্বাধীন তেল,গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত্-বন্দর জাতীয় রক্ষা কমিটি দেশীয় কয়লা উত্তোলনের বিরোধিতা করলেও ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানিতে দেশীয় অর্থ অপচয়ের বিষয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। এ যেন এক ভিন্ন পথের আলামত ! আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মাটির নিচের কয়লা উত্তোলনে ঐক্যমত পোষণ করার পরও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ জনগণের দৃষ্টিগোচর হয়নি আজও। সম্প্রতি দিনাজপুরে বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে খনিবিরোধী বাম নেতা আমিনুল ইসলাম বাবলু বিরোধিতা করলেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ভূমি প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান এমপি এবং ১৮ দলীয় জোটের প্রধান বিএনপির জেলা সভাপতি লুত্ফর রহমান মিন্টু দেশের উন্নয়নের স্বার্থে খনি এলাকার জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে খনি থেকে কয়লা উত্তোলনে ঐক্যমত পোষণ করেন। দেশের বিদ্যুত্ চাহিদা পূরণে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল এবং ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানি স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। স্বল্পমূল্যে বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে হলে কয়লাই একমাত্র ভরসা। দেশের উত্তরাঞ্চলে দিনাজপুরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ৩টি, রংপুরের পীরগঞ্জে ১টি এবং জয়পুরহাটের ১টি কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলনে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই বিদ্যুত্ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে। এখানকার উত্তোলিত কয়লা দিয়ে উত্পাদিত বিদ্যুত্ দেশের চাহিদা পূরণ করেও প্রয়োজনে রপ্তানি করতে পারবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে জনদুর্ভোগ লাঘব হবে এবং দেশের শিল্প কারখানা দ্রুত সমৃদ্ধি অর্জন করবে। এ লক্ষ্যে কয়লা উত্তোলনে সরকারের দ্রুত সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যুত্ সংকট থেকে শিল্প মালিকদের রক্ষা করতে না পারলে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়বে। কর্মহীনতা নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং সর্ব ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করতে খনি থেকে কয়লা তুলে দেশের কয়লা দিয়ে আরো তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনই এর সঠিক সমাধান। দিনাজপুর