দায়মুক্তি বিধান নিষিদ্ধের দাবি

তত্ত্বাবধায়ক আমলে ক্ষমতার অপচর্চা করেছে সেনাদের একাংশ :টিআইবি

২০০৭-২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেনাবাহিনীর একাংশ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে বলে উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল বুধবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ আয়োজিত ‘২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সশস্ত্র বাহিনী সদস্যদের একাংশের ভূমিকা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভবিষ্যতে এক-এগারোর মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধে দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের দায়মুক্তির বিধান আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়। টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম. হাফিজউদ্দিন খান, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার রেযাউল করিম। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সশস্ত্র বাহিনীর একাংশ ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব বিস্তার, সংবিধান লংঘন, আইন ও মানবাধিকার লংঘনের মাধ্যমে অর্থ ও সম্পদ অর্জন করে। এ সময়ে গণমাধ্যমের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। সে সময়ে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পেছনে সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একাংশের ভূমিকা ছিলো। তবে গবেষণার পর্যবেক্ষণে ওই দুই বছরে সশস্ত্র বাহিনীর ইতিবাচক ভূমিকার কথাও বলা হয়েছে। ইতিপূর্বে প্রকাশিত টিআই যুক্তরাজ্যের গবেষণা প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যুক্তরাজ্যের উল্লেখিত গবেষণার প্রেক্ষিতে যে সব সমস্যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তার মধ্যে রয়েছে জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতির অনুপস্থিতি, বিভিন্ন খাতে সশস্ত্র বাহিনীর লাভজনক ব্যবসার ক্রমবর্ধমান বিস্তারের ফলে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির ঝুঁকি। তাছাড়া নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সত্ত্বেও উচ্চতর পর্যায়ে পদোন্নতি, বদলি ও অবসরের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের ঝুঁকি, জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা বরাদ্দসহ প্রতিরক্ষা ক্রয় খাতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্যের ঘাটতি ও জনগণের আলোচনার সুযোগের স্বল্পতা রয়েছে। সর্বোপরি মাঠ পর্যায়সহ সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন কার্যক্রমে (অপারেশনস) স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সহায়ক এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি প্রতিরোধক সুনির্দিষ্ট কৌশলের ঘাটতি রয়েছে। এক-এগারো পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর কত শতাংশ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর বিষয়ে অনেক লেখালেখি হলেও গবেষণা হয়নি। আমরা মনে করি, সশস্ত্র বাহিনী জনস্বার্থে, জনগণের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দরকার। তাই এ ব্যাপারে তথ্য ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক আলোচনা দরকার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা হয়। প্রতিরক্ষা খাতে আমাদের দেশে গবেষণা নেই বললেই চলে। তাছাড়া বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা নীতি নেই। নির্বাহী পরিচালক বলেন, গবেষণা প্রতিবেদনে দুই শতাধিক মানুষের সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। কোনো সংখ্যাতত্ত্বের মাধ্যমে সরলীকরণ করা হয়নি। দেশের সশস্ত্র বাহিনী দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা থেকে শুরু করে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তি বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে সুনাম অর্জন করেছে। এই সুনাম অক্ষুণ্ন রেখে সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর করার স্বার্থে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও উজ্জ্বলতর সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে হলে প্রতিরক্ষা খাত সংক্রান্ত বিষয়ে খোলামেলা আলোচনার বিকল্প নাই। টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী এক-এগারো পরবর্তী সময়ে সেনা সদস্যদের একাংশের অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিধি-বহির্ভূতভাবে ও জোর করে অর্থ গ্রহণ ও আদায়, বিধি-বহির্ভূতভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে বার্থ অপারেটর নিয়োগ ও কন্টেইনার রাখার চার্জ বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্যাতন, রাজনীতিকদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানি, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও ঠিকাদারদের ওপর নির্যাতন, আইনি সহায়তা প্রত্যাশীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রক্রিয়া না মেনে দ্রুত বিচার, সুপ্রিম কোর্ট ও ঢাকা বারের নির্বাচন পেছাতে বাধ্য করা, জেলখানায় ডিভিশন প্রাপ্তিতে প্রভাবিত করা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। সেনা সদস্যদের একাংশের অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত, বিচারিক কার্যক্রম ব্যাহত ও জনগণ সঠিক তথ্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে টিআইবি সাত দফা সুপারিশ উত্থাপন করে। এর মধ্যে রয়েছে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা, সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর তথ্য প্রকাশ, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মপরিধি ও এখতিয়ার সুনির্দিষ্টকরণ, বেসামরিক কাজে সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহার সীমিতকরণ, দায়মুক্তির সুযোগ আইনত নিষিদ্ধকরণ, অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিতকরণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন। অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলায় সশস্ত্র বাহিনীর অনুপ্রবেশ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এম. হাফিজউদ্দিন খান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার কারণেই সেনাবাহিনীকে দেশ পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করতে হয়, যা আমাদের প্রত্যাশিত নয়। ড. ইফতেখারুজ্জামান তার বক্তব্যে আরো উল্লেখ করেছেন, গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই, যদি থাকে তা হলো আরো উন্নততর গণতন্ত্র। কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ই সশস্ত্র বাহিনী জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। ভবিষ্যতে তথাকথিত এক-এগারো এড়াতে গণতান্ত্রিক চর্চা ও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের বিকল্প নেই। ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত মাঠ পর্যায়ের তথ্য, দুই শতাধিক তথ্য দাতাদের সাথে সাক্ষাত্কার, ৮টি দলীয় আলোচনা, ২০টি কেস স্টাডি এবং পরোক্ষ উত্স থেকে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে প্রণীত গবেষণায় ২০০৭-২০০৮ সালে সেনা সহায়তায় গৃহীত ইতিবাচক কর্মকাণ্ড এবং সেনা সদস্যদের একাংশের অনিয়ম ও দুর্নীতির ধরন ও প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী দুর্নীতি বিরোধী অভিযান, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিভিন্ন সেবাখাতের বকেয়া বিল আদায়, অবৈধ ভূমি দখলদারদের উচ্ছেদসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচন সম্পন্নের মাধ্যমে সেনাবাহিনী সর্বমহল কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও সেনা সদস্যের একাংশের এখতিয়ার বহির্ভূত কর্মকাণ্ড, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্টতার প্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেনা সদস্যদের একাংশের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রকৃতি অনুসন্ধানে গবেষণায় ব্যবহূত ৫টি সূচক হলো ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ-সম্পদ অর্জন, সংবিধান ও আইন লঙ্ঘন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, প্রভাব বিস্তার এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, ব্যবসায়ী, সাবেক সেনাপ্রধান ?ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অন্যান্য সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, আইনজীবী, রাজনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশ্লেষক, বিভিন্ন পেশাজীবী, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিকদের মধ্য থেকে গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।