চাঁদপুর ও সাভারে দুই গৃহবধূকে যৌতুকের দাবিতে পোড়াইয়া হত্যা করিয়াছে স্বামীসহ শ্বশুর বাড়ির লোকজন। গতকাল ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় ছাপা হইয়াছে সংবাদটি। রংপুরেও এক গৃহবধূর শরীরে তাহার স্বামী আগুন ধরাইয়া দিয়াছে। মেয়েটি এখন মৃত্যুর সহিত লড়িতেছে। সভ্যতার এই বিশাল ব্যাপ্তির কালে এমন ঘটনা আমাদের স্তব্ধ করিয়া দেয়। স্ত্রীর গায়ে আগুন লাগায় যে, তাহাকে হত্যা করে যে, সে মানুষের পর্যায় নাই। নিষ্পাপ মেয়েগুলির কথা মনে হইলে অবশ হইয়া যায় শরীর, ভাবনা গুলাইয়া যায়। মানুষ এমন ‘অমানুষ’ হইয়া উঠিল কবে!
আমরা যতই আধুনিক হই না কেন, নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায় নাই। আমাদের সমাজে বহু বত্সর হইতেই যৌতুক নেওয়ার প্রবণতা চলিয়া আসিতেছে। আমরা যতই শিক্ষিত হই না কেন, নারীদের সকলেই নিয়ন্ত্রণ করিতে চাহে। আর তিনি যদি হন পুত্রবধূ তবে তাহাকে শ্বশুরবাড়ির সবারই নিয়ন্ত্রণ করিবার যেন অধিকার জন্মায়! কেননা, উপরে উল্লিখিত ঘটনায় দেখা যায়, পুত্রবধূকে আগুন লাগানোয় সামিল ছিলেন শাশুড়িও।
তাই, প্রযুক্তিগত উন্নতি, অর্থনৈতিক উন্নতির কালেও সমাজে যৌতুকের দাবিতে নারীকে প্রাণ দিতে হইতেছে। যৌতুক নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির মূল কারণ নারীদের প্রতি পরিবার এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা শিক্ষায়, প্রযুক্তিতে আধুনিক হইতেছি; কিন্তু মন-মানসিকতায় সেই বর্বর মধ্যযুগেই বাস করিতেছি। তাহা না হইলে, সমাজে এখনো যৌতুকপ্রথা কেন থাকিবে? এ জন্য যে পরিবার যৌতুক দাবি করে বা নেয়, তাহাদের সামাজিকভাবে বয়কট করিতে হইবে।
সরকার নারী নির্যাতন ও যৌতুক বন্ধে ‘যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮’ করিয়াছে। পুলিশ ও প্রশাসন নারী নির্যাতন এবং যৌতুক বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করিতেছে। কিন্তু সমাজে পরিবারে যৌতুক নেওয়ার মানসিকতা বাড়িয়াছে; কেবল পাল্টাইয়াছে ধরন। এখন যৌতুকের জন্য নারীর প্রতি নির্যাতনের হার অসহনীয় মাত্রায় বাড়িয়াছে।
যৌতুকের কারণে অনেক নারীই হত্যার শিকার হইতেছে। আবার অনেকেই অপমানের জ্বালায় বাছিয়া লইতেছেন আত্মহত্যার পথ। আমাদের দেশে নারীকে দমন করা ও নির্যাতন করাকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসাবে দেখা হয়। তাহা হইলে যদি না হইবে, তাহলে এসব ঘটনায় পাড়া-প্রতিবেশী ও পাড়ার মুরুব্বিদের সোচ্চার হইতে, অত্যাচারী ছেলে ও পরিবারকে নিবৃত্ত করিতে দেখা যায় না কেন?
জনগণকে যৌতুকবিরোধী আইন সম্পর্কে সচেতন করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সংবাদ, ফিচার, আলাদা সাময়িকী, নাটক মঞ্চায়ন, বক্তব্য, বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যবস্থা এবং শাস্তির কথা প্রচার করিতে হইবে। সবচাইতে বেশি প্রয়োজন নির্যাতনের শিকার নারীদের সচেতন করিয়া তোলা। এজন্য নারী সমাবেশ, উঠান বৈঠক, কর্মশালা ইত্যাদির মাধ্যমে সচেতন করা যাইতে পারে। ইহাছাড়া, যাত্রাপালা, শোভাযাত্রা, পোস্টার ইত্যাদির মাধ্যমে বিশেষ করিয়া গ্রামাঞ্চলে যৌতুকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন জোরদার করিতে হইবে।
ইহার পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টিকে মানবিক করিয়া তুলিয়া ধরিতে হইবে। যাহাতে শিশুকিশোরদের মধ্যে যৌতুকবিরোধী মানসিকতা গড়িয়া উঠে। শুধু যৌতুকের কুফল এবং আইন সম্পর্কেই জানানো নয়, নারীদের আত্মমর্যাদা এবং ক্ষমতায়ন সম্পর্কে সচেতন করিয়া তোলাটা বেশি জরুরি। সর্বোপরি, সচেতনতা এবং মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন যৌতুক নির্মূল করিতে পারে। দিনের পর দিন সচেতন করার নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য লাভ করা যাইতে পারে। আমরা আশা করি, আগামীতে একজন নারীও যৌতুকের জন্য প্রাণ হারাইবে না। সমাজ মানুষ একদিন সেই ‘অমানুষ’-এর পর্যায় কাটাইয়া সত্যিকারের ‘মানুষ’ হইয়া উঠিবে।