মো. রাশেদ আহমেদ
শুধুমাত্র অর্থনীতি নয় দৈনন্দিন সুষম খাদ্য,পানি ও প্রোটিনসহ বিভিন্ন ধরনের চাহিদা মেটাতে আগামী দিনে জলসীমার উপর নির্ভরশীল হতে হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বাংলাদেশে আছে অসংখ্য নদ-নদী, সমুদ্র ও বঙ্গোপসাগরের মতো অপার সম্ভাবনাময় এলাকা। শুধু তাই নয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশে অবস্থিত। জলসীমার পরিমাণ প্রায় ২৪১৪০ বর্গকিলোমিটার।
একটু পেছনে ফেরা যাক, বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও ক্যারিসমেটিক নেতৃত্বেরগুণে ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমা মামলায় নেদারল্যান্ডস স্থায়ী সালিশি আদালতের রায়ে বাংলাদেশ প্রায় ১৯৪৬৭ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১৩ সালে মিয়ানমারের কাছ থেকে পায় ৭০,০০০ বর্গকিলোমিটার—যা বাংলাদেশে জলসীমা মোট আয়তনকে বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে আরো বেশি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে জলসীমা অর্থনীতিতে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল এককেন্দ্রিক অর্থাত্ কৃষিনির্ভর। সেই জায়গা থেকে আজ আমরা বেরিয়ে এসে বহুমাত্রিক অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছি। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গার্মেন্টস, শিল্প-কারখানা, প্রবাসীদের রেমিটেন্স ও সামুদ্রিক অর্থনীতি। বর্তমান আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা ভাবছি। যার মাধ্যমে শিল্প-অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেখানে মানুষের পরিবর্তে কাজ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিসত্তা অর্থাত্ রোবট। এর ফলে অনেক লোক বেকার হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যত্ যে জলসীমা অর্থনীতির কথা ভাবা হচ্ছে তাতে কর্মসংস্থান হারার কোনো সম্ভাবনা নেই বরং ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে জলসীমাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠবে নতুন নতুন শিল্প এলাকা যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উন্নয়নে অবদান রাখবে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছেন যে, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে পৃথিবীর বৃহত্তম জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মজুদ রয়েছে। যার কারণে এই অঞ্চলটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যা উত্তোলন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ হবে এশিয়ার অন্যতম জ্বালানি ও গ্যাস শক্তিধর দেশ। দেশের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত তেল ও গ্যাস বিদেশে রপ্তানি করার মাধ্যমে ব্যাপক পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশে সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলের প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহের প্রধান উত্স মত্স্য আহরণ করা। ভারত ও মিয়ানমার সমুদ্রসীমার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মেস্যর উপর নির্ভরশীলতা আরো বেশি বাড়ছে।
পর্যটন খাতেও সমুদ্র ও জলসীমা বড় অবদান রাখতে পারে। কারণ সমুদ্রপাড়ে সময় কাটাতে কার না ভালো লাগে! সেই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে বিদেশি পর্যটকরা। প্রতিবছর হাজার হাজার বিদেশি পর্যটকরা কুয়াকাটা ও কক্সবাজার সমুদ্রপাড়ে ভিড় জমাতে দেখা যায়। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা অনেক বেশি পিছিয়ে আছি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তার অভাব, উন্নতমানের হোটেল-মোটেলের অভাবে দিন দিন পর্যটন খাতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশে আমদানি রপ্তানির ৯০% সম্পাদিত হয় সমুদ্র পথে। তাছাড়া চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর দিয়ে প্রতিবছর প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার আমদানি-রপ্তানি হয়। এসব জাহাজ থেকে ভাড়া বাবদ আয় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। ভবিষ্যত্ এসব সমুদ্র বন্দরে সক্ষমতা ও কর্মদক্ষ জনবল বৃদ্ধি করা হলে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বৃদ্ধি পাবে সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে নতুন নতুন কর্মসংস্থান।
ভবিষ্যত্ বিভিন্ন ধরনের চাহিদা মেটাতে বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশ জলসীমা অর্থনীতির দিকে তাকিয়ে আছে। পৃথিবীর জনসংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে ২০৫০ সালে জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৯০০ কোটিরও অধিক। গবেষকরা বলছেন এই বৃহত্ জনগোষ্ঠীর খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। কারণ বর্তমান এই বৃহত্ জলসীমার বিকল্প হিসেবে অন্য কিছু খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বে ৪০০ কোটি অধিক জনসংখ্যার ১৫% ভাগ প্রোটিনের যোগান দিচ্ছে সমুদ্র। শুধুমাত্র তাই নয় বিশ্বের ৩০% গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করছে সমুদ্র। ১৯৯৪ সালে বিখ্যাত অধ্যাপক গুনার পাউলি ভবিষ্যত্ সমুদ্রে অর্থনীতি রূপরেখা প্রণয়নের জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক আমন্ত্রিত হোন। তিনি দীর্ঘ দিন গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে পরিবেশ বান্ধব মডেল হিসেবে ‘ব্লু ইকোনমি’ ধারণা প্রণয়ন করেন। গত দুই দশক বিভিন্ন পরিবর্তন,পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে ‘ব্লু ইকোনমি’ মডেল আজ বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশে জলসীমায় ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এবং অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে আমরা তা খুব বেশি লাগাতে পারিনি। অথচ যেখানে ইন্দোনেশিয়া অর্থনীতির সিংহভাগ আসে জলসীমা অর্থনীতি থেকে। তাই আমাদের এই বিশাল জলসীমাকে কাজে লাগাতে পারলে একদিকে যেমন অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে ঠিক তেমনি নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের চাহিদা মেটাতে জলসীমা অর্থনীতি হতে পারে আগামী দিনের প্রধান হাতিয়ার।
n লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া