সামপ্রদায়িক সমপ্র্রীতি প্রতিষ্ঠায় মহানবী (স.) এর আদর্শ

(পূর্ব প্রকাশের পর) মহানবী (স.)-র বাস্তব জীবনের উদাহরণ ঃ মুখরোচক কিন্তু অসমপ্রদায়িক বুলি আওড়ানো যত সহজ বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ অনেক কঠিন। অথচ কথার চেয়ে কাজই করেছেন মহানবী (স.) বেশি। নিম্নে তার কতক উপস্থাপন করা হলো ঃ মদীনার সনদ ঃ মদীনা কেন্দ্রিক ইসলামী রাষ্ট্রে মুহাজির ও আনসার ছাড়াও ইয়াহুদী, খৃষ্টান এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোক বসবাস করত। কলহপ্রিয় আরবের বিভিন্ন সমপ্রদায়ের লোকদের মাঝে মদীনায় কমনওয়েলথ, সমপ্রীতি সদ্ভাব, প্রতিষ্ঠার নিরিখে ৪৭টি (ইবেন ইসহাক ঃ সিরাত রসূল আল্লাহ, ইংরেজী অনুবাদ পৃ. ২৩১-৩৩; Watt, Muhammad at Medina, p.221) মতান্তরে ৫৩টি (ইবনে হিসাম) চুক্তি শর্ত সমন্বয়ে এক ঐতিহাসিক ইশতেহার ঘোষণা করেন রসূলুল্লাহ (স.); যা ইতিহাসে মদীনার সনদ নামে পরিচিত। উক্ত সনদের প্রায় প্রত্যেকটি ধারাই সমপ্রদায় সমপ্রীতি স্থাপনের নিরলস প্রয়াস ও উদ্যোগ। সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি স্থাপনের এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের মাঝে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এই নীতি স্বল্প-সংখ্যক অন্ধ বিরুদ্ধবাদী ও জ্ঞানপাপী ছাড়া দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই প্রশংসা করেছেন। উইলিয়াম মূর বলেন, “It reveals the man (the Prophet) in his real greatness a master mind not only of his own age, but of all ages, (W.Muir; The life of Muhammad)- “মদীনার সনদ শুধু সেই যুগেরই নয় বরং সর্বযুগের মুহাম্মদ (স.)-এর বিরাট মাহাত্ম্যও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে।” হিট্টি বলেন, “This was the first attempt in the history of Arabia At Organization with religion rather than blood as its basis. (P.K.Hitti, History of the Arbs)- “আরবের ইতিহাসে রক্তের পরিবর্তে ধর্মের ভিত্তিতে সমাজকে কায়েম করার প্রচেষ্টা এই প্রথম।” হুদায়বিয়ার সন্ধি (৬২৮ খ্রিঃ) ঃ হুদায়বিয়ার সন্ধির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে প্রতীয়মান হয় যে, বাহ্যত মুসলমানদের বিপক্ষে এ চুক্তি। এরই ফলশ্রুতিতে বিধর্মী ও মুসলমানদের মাঝে অন্তত দশ বছরের জন্যে নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি রক্ষার প্রচেষ্টা করা হয়। কুরআন মজীদে হুদায়বিয়ার সন্ধি ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ (কু ঃ ৪৮ ঃ ৩,৪) নামে অভিহিত হয়েছে। মুসলমান ও তদীয় নেতা সামপ্রদয়িকতার বিন্দুমাত্র ছোঁয়া বা গন্ধ ইসলামে বিদ্যমান থাকলে এ চুক্তি অস্বীকার করে তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত। অথচ হযরত আবূ বকর (রা) বলেছেন, “হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় আমরা যেরূপ বিজয়ী হয়েছিলাম অনুরূপ আর কখনও হইনি।’ বদর যুদ্ধোত্তর উদারতা (৬২৪ খ্রি:) ঃ দীর্ঘ চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে যখন ইসলাম সুসংহত ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং মুসলামানদের অসামান্য সাহস, উদ্দীপনা ও আত্মপ্রত্যয় সঞ্চারের মাধ্যমে বদর যুদ্ধে বৈরী শক্তি পরাজিত হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (স.)-এর মানসে বিন্দুমাত্র প্রতিশোধ স্পৃহা জাগ্রত হয় নাই। কুরাইশরা দয়া আশা করেনি, করতেও পারে না। কিন্তু বিশ্বনবী (স.) আদেশ করলেন ঃ “বন্দীদের প্রতি ভাল ব্যবহার কর।” তাঁর আদেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হলো। রাসূল (স.) প্রতিপক্ষের প্রতি যে উদারতা প্রদান করেছেন তা সমগ্র বিশ্বের ইতহাসে এক বিস্ময়কর ও অনুসরণীয় ঘটনা। আল্লাহর শত্রুর প্রতি উদারতার ব্যাপারে কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে ঃ “ আল্লাহর পথে তোমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর, কিন্তু তোমরা কখনই আক্রমণকারী হবে না। অবশ্যই আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের ভালবাসেন না।” (সূরা বাকারা ঃ ১৯০) আবূ আজিজ নামে জনৈক বন্দীর জবানীর মাধ্যমের মূর বলেন ঃ “Blessing be on the men of Medina who made us rede, while they themselves walked. They gave us wheaten bread to eat when there was little of it contenting themselves with dates.” (W.Muir)। “মদীনাবাসী ধন্য, তাঁরা পদব্রজে গমন করে আমাদের আরোহণের জন্য তাদের উষ্ট্র দিয়েছিলেন, নিজেরা খর্জুর আহার করে আমাদেরকে রুটি সংগ্রহ করে দিতেন।” মাক্কা বিজয়োত্তর সমপ্রীতি ও সংহতির দৃষ্টান্ত ঃ শান্তির সকল প্রচেষ্টা আশানুরূপ প্রতিফলন না ঘটাতে মক্কা অভিযান হয়েছিল। প্রায় বিনাযুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে, ধ্বংসাবশেষের অপ্রতুলতায় বলতে গেলে এক রকম প্রায় শান্তিপূর্ণতার মাঝে মক্কা বিজিত হয়েছে। চিরবৈরীদের প্রতি রাসূলূল্লাহ (স.)-এর বিন্দুমাত্র দুর্ব্যবহারের উদ্রেক হয় নাই। বরং সকলের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, “আমি তোমাদের প্রতি কিরূপ ব্যবহার করব বলে মনে কর।” সকলে বলে উঠল- “তুমি আমাদের উদারচেতা ভাই ও উদারচেতা ভ্রাতুষ্পুত্র।” (চলবে) লেখক :অধ্যক্ষ, সরকারি মাদরাস-ই-আলিয়া, ঢাকা