দেখা হয় নাই

হাজীগঞ্জ জল দুর্গ

বাংলাদেশজুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য প্রাকৃতিক আর মনুষ্যনির্মিত দর্শনীয় স্থান। মূলত এই স্থানগুলোর কথা মাথায় রেখেই প্রতি শুক্রবারের আয়োজনে থাকছে একটি করে দর্শনীয় স্থানের বিবরণ। আর আজ এতে প্রকাশিত হলো নারায়ণগঞ্জের হাজীগঞ্জ জল দূর্গ-এর কথা। বহিঃশত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে একসময় বাংলার শাসকেরা এই ভূ-ভাগের বিভিন্ন অংশে যেসব দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন তারই একটি হলো ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের হাজীগঞ্জে অবস্থিত হাজীগঞ্জ জল দুর্গ। মূলত নদীপথে যাতায়াত করা শত্রুর ওপর নজর রাখতে এবং এই পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নদীর কোল ঘেঁষে স্থাপন করা হতো বলেই এ ধরনের দুর্গকে জল দুর্গ নামে পরিচয় দেওয়া হতো। ঢাকাকে রক্ষা করতে সপ্তদশ শতকের আগে পরে যে তিনটি জল দুর্গকে ত্রিভূজ জল দুর্গ বা ট্রায়াঙ্গল অব ওয়াটার ফোর্ট গড়ে তোলা হয়েছিল তারই একটি হলো এই হাজীগঞ্জ দুর্গ; অধিকাংশ মানুষের মতে যেটি ১৬৫০ সালে নির্মিত হয়েছিল বলেই জানা যায়। তবে এটি কে নির্মাণ করেছেন তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। মুন্সি রহমান আলী তাঁর এক গ্রন্থে লিখেছেন, মীর জুমলা দুর্গটি নির্মাণ করেন। অন্যদিকে আহম্মাদ হাসান দানি তার ‘মুসলিম আর্কিটেকশ্চার ইন বেঙ্গল’ গ্রন্থে বলেছেন, ইসলাম খান ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করার পর এটি নির্মাণ করেন। পাঁচ কোণাকারে নির্মিত এ দুর্গের বাহুগুলো এক মাপের নয় এবং পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা দুর্গটির আয়তন আনুমানিক ২৫০ বাই ২০০ ফুট। দুর্গের কোণগুলোতে কামান বসানোর জন্য যে বুরুজ নির্মাণ করা হয়েছিল সেগুলো এখনও টিকে আছে। অন্যদিকে দুর্গের দেয়ালগুলো বেশ উঁচু এবং প্রায় ২০ ফুট পুরু। দুর্গের উত্তর দেয়ালেই এর একমাত্র প্রবেশ পথ বা দুর্গ তোরণটি অবস্থিত। কিছুটা উঁচু এই দুর্গে ঢুকতে হলে আপনাকে প্রবেশ তোরণের প্রায় ২০টি সিঁড়ি ডিঙাতে হবে। আবার তোরণ থেকে দুর্গ চত্বরের নামতে হবে ৮টি ধাপ। প্রাচীরের ভেতরে চারদিকে চলাচলের পথ রয়েছে প্রাচীর ঘেঁঁষেই। দুর্গের পূর্ব-দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় দুটি বুরুজ জায়গা আছে। আরও একটি বুরুজ রয়েছে দক্ষিণ পাশে। তা ছাড়া উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম কোণায় ছোট দুটি বুরুজ অংশ আছে, যেখানে এক সাথে কয়েকজন বন্দুক বসিয়ে গুলি চালাতে পারত। দুর্গের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে রয়েছে চৌকো একটি ওয়াচ টাওয়ার। এখন এটি ধ্বংসপ্রায় হলেও টাওয়ারে ঢোকার জন্য একসময় এতে ছিল ছোট্ট একটি পূর্বমুখী দরজা আর ভেতরে ঠিক মাঝখানে একটি মোটা গোল পিলার লাগোয়া ঘোরানো সিঁড়ি। শত্রুদের ওপর নজর রাখার জন্য এই ওয়াচ টাওয়ারটি ছাড়া দুর্গের ভেতর আর কোনো স্থাপনার অস্তিত্ব চোখে পড়ে না এবং সম্ভবত এখানে তেমন কোনো স্থাপনা কখনো ছিলও না। এর ফলে সৈন্যরা এখানে তাঁবু ফেলে অবস্থান করত বলেই ধারণা করেন ইতিহাসবিদরা। হাজিগঞ্জের এই দুর্গটি দেখার জন্য দেশের যেকোনো স্থান থেকে ঢাকায় এসে সেখান থেকে বাস বা ট্রেনে করে নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় এসে নামতে হবে। তারপর চাষাড়া থেকে রিকশা, টেম্পু বা সিএনজি অটো রিক্সায় করে আধঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যাবে হাজীগঞ্জ জল দুর্গে।