ভাঙ্গলো মিলন মেলা

ভাঙ্গলো বইপ্রেমীদের মিলনমেলা। শেষ হলো বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৩’। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে সারাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠায় বাঙালির মনন ও প্রেরণার প্রতীক এই মেলায় এবার আশানুরূপ বই বিক্রি না হওয়ায় হতাশ অধিকাংশ প্রকাশক। তবে আগামীতে আরো সুন্দর মেলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তারা। প্রকাশকরা জানান, শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ, জামায়াত-শিবিরের হরতাল ও এর পূর্বের সহিংসতা, বৃষ্টি, শেষ শুক্রবারে ধর্মভিত্তিত দলগুলোর দেশব্যাপী তাণ্ডব এবং বইমেলার ইতিহাসের প্রথমবারের মতো অগ্নিকাণ্ড— সব মিলিয়ে একটি ‘হতাশার মেলা’ ছিল এবার। তবে শেষ দিন গতকাল লেখক-পাঠক-ক্রেতা-প্রকাশক সর্বসাধারণের পদচারণায় মুখরিত ছিল বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণ। জ্ঞান ও সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশক সমিতির সহ-সভাপতি ও আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গনি বললেন, ‘সব কিছু বিবেচনার প্রেক্ষিতে আমরা মেলার মেয়াদ বাড়ানোর দাবি করেছিলাম। কিন্তু বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ সেই দাবির প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা দেখায়নি।’ সমিতির নির্বাহী পরিচালক ফরিদ আহমেদ বললেন, ‘এ বছর মেলার শুরুর দিনটি ছিল শুক্রবার। সেই দিন বা তার পরের দিন বই বিক্রি কম হয়েছে। একইভাবে মেলাটা শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার। এক্ষেত্রে প্রকাশক ও পাঠকদের স্বার্থে মেলার মেয়াদ অন্তত দুই দিন বাড়ানো যেত।’ নতুন বই ৩০৭০টি, এগিয়ে কাব্যগ্রন্থ একাডেমীর সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এ বছর সব মিলিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ৩০৭০টি নতুন বই। এর মধ্যে প্রকাশের দিক থেকে এগিয়ে আছে কবিতার বই। এ বছর কবিতার বই এসেছে ৭৭১টি। এর পরের স্থানে রয়েছে উপন্যাস। উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে ৫৩২। এছাড়া গল্প ৩৯৬, প্রবন্ধ ২২০, গবেষণা ৫২, ছড়া ১০৫, শিশুতোষ ৯৮, জীবনী ৮৮, রচনাবলী ৬, মুক্তিযুদ্ধ ৬৪, নাটক ২৫, বিজ্ঞান ৪৮, ভ্রমন ৪৯, ইতিহাস ৪৫, রাজনীতি ২২, চিকিত্সা/স্বাস্থ্য ২৫, কম্পিউটার ৬, রম্য/ধাঁধা ৬৮, ধর্মীয় ১৯, অনুবাদ ৩৪, অভিধান ২, গোয়েন্দা/বৈজ্ঞানিক ফিকশন ২১ এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর এসেছে ৩৭৪ টি নতুন বই। বৃহস্পতিবার মেলার সমাপনী দিনে ১০৭টি নতুন বই এসেছে। এরমধ্যে রোদেলা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত নূর কামরুন নাহারের উপন্যাস ‘বিকেলের চিল’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, ড. হারুনুর রশীদ এবং সুলতানা আজীম। পুরস্কার অমর একুশে গ্রন্থমেলায় এবার সেরাগ্রন্থের জন্য চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে প্রথমা প্রকাশিত ‘উয়ারী বটেশ্বর : শেকড়ের সন্ধানে’ বইটি। সর্বাধিক সংখ্যক মানসম্মত গ্রন্থ প্রকাশের জন্য ‘শহীদ মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ পেয়েছে তিন প্রকাশনা সংস্থা- ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড- ইউপিএল, আগামী প্রকাশনী ও শুদ্ধস্বর। গতকাল অনুষ্ঠান মঞ্চে তাদের পুরস্কৃত করা হয়। বিকেলে মেলার মূল মঞ্চে সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব সুরাইয়া বেগম, ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মামদুদুর রশিদ, স্টেপ মিডিয়া লিমিটেডের পরিচালক মোস্তফা জাহিদ খান ও এক্সপ্রেসন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামেন্দু মজুমদার। একাডেমীর সভাপতি প্রফেসর ইমিরেটাস ড. আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে এতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। মেলার প্রতিবেদন পেশ করেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব শাহিদা খাতুন। এদিকে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যদণ্ডের রায়ে সারাদেশের মতো গতকাল বইমেলা প্রাঙ্গণেও বয়ে যায় আনন্দের হিল্লোল। বইপ্রেমীদের চোখেমুখে দেখা গেছে স্বস্তি ও প্রশান্তির ছায়া। এই রায়ে জাতি কলঙ্কমুক্ত হওয়ার পথে আরো এক ধাপ এগিয়েছে- এমন মন্তব্য করেন অনেকেই।