অ র্থ নৈ তি ক স ং ক ট

সন্তান পালনে অনুত্সাহ কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রে

লিন্ডা ম্যাককার্থির নিবাস যুক্তরাষ্ট্রে। পুরোপুরি গৃহিণী তিনি। স্বামীর আয়ও সীমিত। অর্থনীতির খারাপ অবস্থার কারণে ৬ মাস বয়সী একমাত্র মেয়ে এলেনাকে লালন-পালন করতে গিয়ে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। প্রতিমাসে দুধ বাবদই গুণতে হচ্ছে ৫০ ডলার। ডায়াপার্সের ১শ’ ডলার বাঁচাতে গিয়ে কন্যাকে টয়লেটের অনুশীলন করাচ্ছেন। অথচ সন্তানের সংখ্যা বিষয়ক প্রশ্ন শুনতে শুনতে তার কান ঝালাপালা। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারারের একটা রিপোর্ট ইদানীং তাকে আরো বেশি আতঙ্কিত করে তুলেছে। কলেজে যাওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রতিটি সন্তানের পেছনে খরচ হয় ২ লাখ ৮৬ হাজার ৫০ ডলার (বাংলাদেশের টাকায় ২ কোটিরও ওপরে)। সবদিক চিন্তা করেই লিন্ডা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, দ্বিতীয় সন্তান কখনোই নয়। মহামন্দা যুক্তরাষ্ট্রের মহিলাদের সন্তান পালনের ইচ্ছাকে নাটকীয়ভাবে পাল্টে দিয়েছে। এ কথা বলেছেন শীর্ষস্থানীয় জন্মদায়ক স্বাস্থ্য গবেষণা সংগঠন গুটমাচের ইনস্টিটিউটের অভ্যন্তরীণ নীতি বিভাগের পরিচালক ল্যারি ফিনার। সম্প্রতি তাদের পরিচালিত এক জরীপে অংশ নেয়া নববিবাহিতাদের ৬৪ শতাংশই বলেছে, চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এ মুহূর্তে সন্তান নেয়ার কথা ভাবছেন না। শতকরা ৩০ জন জানিয়েছে, শিগগিরই তারা সন্তান নেবেন ঠিকই কিন্তু সন্তানের সংখ্যাটাকে ভবিষ্যতে আর বাড়তে দেবেন না। আমেরিকায় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে এক সন্তানযুক্ত পরিবারের সংখ্যাটা বেড়ে ২৩ শতাংশে পৌঁছেছে। তার মানে প্রতি পাঁচটি পরিবারের একটিতে রয়েছে একমাত্র আদরের সন্তান। মন্দার ধাক্কা দেশের অধিকাংশ শিল্পের ওপর পড়েছে কিন্তু ছিটেফোঁটা আঁঁচও লাগেনি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী উত্পাদন শিল্পে। উপরন্তু ব্যবসা আরো স্ফীত হচ্ছে। একমাত্র সন্তানকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চাচ্ছেন অথচ বয়স পঁয়ত্রিশের নিচে— এমন মায়েরা আছেন দোদুল্যমান অবস্থায়। সর্বত্রই শুনতে হচ্ছে উপদেশ বাণী। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে রাস্তায় দেখা হওয়া আগন্তুক পর্যন্ত উপদেশ দিতে কার্পণ্য করেন না। সবার একই কথা, আরো সন্তান নাও। তাদের যুক্তি— ভাইবোন না থাকলে সন্তান আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। নিঃসঙ্গতার কারণে বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে বেশি। একক সন্তান ভাবুক হলেও শিক্ষাজীবনে আহামরি সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু সব বাবা-মাই চান সন্তান মেধাবী ও সামাজিক হোক। এক সন্তানে ঝুঁকি অনেক বেশি। তারপরও অগণিত বাবা-মা বংশধরের সংখ্যা একের বেশি করতে রাজি নন। সন্তান এক না একাধিক ভালো, এ বিতর্ক অবশ্য বহু পুরনো। ছেলে-মেয়ের সংখ্যা বিষয়ক গবেষণা যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয় ১২০ বছর আগে। গ্রানভিল হল স্ট্যানলি হল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আমেরিকান সাইকোলজি রিসার্চ ল্যাবরেটরি চাইল্ড স্টাডি মুভমেন্ট এমন গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছে বহু যুগ। এই গবেষণা সংস্থাটি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে— এক সন্তানের অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমি হওয়ার সম্ভারনা বেশি। তবে এমন বাবা-মাদের জন্য ইদানীং সুসংবাদ আসতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সার্বিক বিচারে একাধিক সন্তান এগিয়ে থাকলেও বুদ্ধিমত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে একক সন্তান অনেক এগিয়ে। ভাই অথবা বোন কিংবা দুটিই থাকলে শিশু খেলার সাথী পায়, একাকীত্বে ভোগে না-এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এ কথাও সত্য, একমাত্র সন্তানের প্রতি বাবা-মা তুলনামূলকভাবে অধিক মনোযোগী হয়। শত সমস্যা সত্ত্বেও তার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেন। চীন হচ্ছে এক সন্তানের ‘আদর্শ ভূমি’। জনসংখ্যা বিস্ফোরণের লাগাম টেনে ধরতে তারা কার্যকর করেছে এক সন্তানের নীতি। সেখানে এমন এক প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যারা আপন ভাই-বোনতো দূরের কথা, কাজিন কী জিনিস তাই জানে না। তাই বলে কেউ বলতে পারছে না, এই প্রজন্ম মিশুক নয়। কিন্তু সমস্যাটা বেধেছে অন্য জায়গায়। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনীতির দেশ। ধারণা করা হচ্ছে, নিকট ভবিষ্যতে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটিতে শ্রমিক সঙ্কট দেখা দেবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে তখন তাদের শ্রমিক আমদানি করতে হবে। এ বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। চীনের কিছু শহরে এক সন্তানের নীতি শিথিল করে একাধিক সন্তান গ্রহণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বিশ্বখ্যাত জরীপ প্রতিষ্ঠান পিউ সার্ভে আমেরিকা সম্পর্কে ভয়াবহ সব তথ্য জানিয়েছে। প্রতি তিনজনের একজন মনে করে, বিয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে পারস্পরিক সুখ ও পূর্ণতা, সন্তান লালন-পালনের ব্যাপারটা গৌণ। প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষদের ৪৬ শতাংশই মনে করে, পরিবারের জন্য দুই সন্তানই হচ্ছে আদর্শ। ৮ শতাংশ মনে করে, এক সন্তান থাকাই যুক্তিযুক্ত। অথচ ১০ বছর আগেও এই হারটা ছিলো মাত্র ৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, একমাত্র সন্তানরা স্কুলে ভালো রেজাল্ট করে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি মেডিক্যাল ও ল ডিগ্রি অর্জন করছেও বেশি। তবে একাধিক সন্তানে বিশ্বাসীরা এ সব তথ্য মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য একটাই— সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণেই বেশি বেশি সন্তান জন্ম দেয়া উচিত। কিন্তু সেই সংখ্যাটা কতো হওয়া উচিত এবং সন্তানদের কোন অনুপাত (এক ছেলে-এক মেয়ে, দুই ছেলে, দু্ই মেয়ে অথবা অন্যকিছু) পরিবারের জন্য শুভ এ প্রশ্ন দু’টির সুনিশ্চিত উত্তর হয়তো কখনোই পাওয়া যাবে না। অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের ছিলো একটি মাত্র বোন। ক্রিকেটের মার্ক ওয়াহ ও স্টিভ ওয়াহ’রা দুই ভাই। সফল দুই বোনের সর্বোত্কৃষ্ট উদাহরণ হলেন ভেনাস ও সেরেনা উইলিয়ামস। তাই বলে পরিবারের এক সন্তানরা কি সফল হচ্ছে না? অবশ্যই হচ্ছে। ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট, ক্যারি গ্র্যান্ট, কন্ডোলিত্সা রাইস, জন আপডাইক, ল্যান্স আর্মস্ট্রং, ফ্রাংক সিনাত্রা, এলভিস প্রিসলি ও চেলসি ক্লিনটন— এদের সবাই তো পরিবারের একমাত্র আদরের নন্দন-নন্দিনী। তবে একটা কথা ঠিক, আমেরিকায় এক সন্তানের প্রবণতা বাড়লে তৃতীয় বিশ্বের লাভ। —আইএইচটি অনুসরণে