বিএমএড কোর্স :বঞ্চিত মাদ্রাসার তিন লক্ষাধিক শিক্ষক

শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বিশেষ ধারা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের জন্যে প্রশিক্ষণের আলাদা ব্যবস্থা থাকলেও মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্যে নেই প্রশিক্ষণ গ্রহণের অবাধ সুযোগ। সারাদেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্যে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট রয়েছে ৫৩টি, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি ১টি, সরকারি মাধ্যমিক টিটি কলেজ ১৪টি, বেসরকারি ৫৫টি, উচ্চ মাধ্যমিক টিটিআই ৫টি, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (ভিটিআই) রয়েছে ৫১টি। এছাড়াও রয়েছে বাউবি, নায়েম, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট ঢাবি, কারিগরি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, মাদ্রাসার প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরে সারাদেশের শিক্ষকদের জন্যে ‘বিএমটিটিআই’ নামে একটি মাত্র শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট রয়েছে। তাতেও নেই অন্যান্য ইন্সটিটিউটের মতো নানা রকম সুযোগ-সুবিধা। যেমন বর্তমান এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগে এখানে নেই আইসিটি ইউনিট। দুটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম থাকলেও তা যথার্থ নয়। তাছাড়া ক্লাসরুমগুলোতে নেই এসিসহ অত্যাধুনিক ব্যবস্থা। নায়েমের আদলে ইন্সটিটিউটটি গঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা এখন পর্যন্ত হচ্ছে না। তথাপি আশার কথা যে, এ ইন্সটিটিউট দিন দিন এগিয়ে চলছে দুর্বার গতিতে। বিষয়ভিত্তিক শর্ট কোর্সের পাশাপাশি এবারই চালু হলো বিএমএড (ব্যাচেলার অফ মাদ্রাসা এডুকেশন) কোর্স। ‘বিএমটিটিআই’-এর প্রাক্তন অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান ও বর্তমান অধ্যক্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর আবদুল মালেকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফসল এই কোর্স। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী গত বছরের প্রথম দিকেই এ কোর্সের উদ্বোধন করেছেন। বিএড কোর্সের অনুরূপ সিলেবাস রয়েছে এই কোর্সে। তবে এ কোর্সের রয়েছে স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য। এতে মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্যে আরবি বিষয়গুলো সংযুক্ত করা হয়েছে। সরকার কর্তৃক দাখিল ও আলিম স্তরের শিক্ষকদের জন্য এই কোর্স বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ‘বিএড ডিগ্রি ছাড়া আর শিক্ষক হওয়া যাবে না’ শিরোনামে ২৫.৯.২০১২ তারিখে পত্রিকান্তরে একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের ২৭ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় শিক্ষক শিক্ষা মান নির্ধারণী কমিটি’ (এনটেক) গঠন করে। ওই কমিটি প্রায় ১১ মাস খেটেখুটে একটি ‘জাতীয় প্রমিতমান’র (ন্যাশনাল স্টান্ডার্ড-এনএস) খসড়া তৈরি করেছে। এনটেকের সদস্য সচিব এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) পরিচালক-প্রশিক্ষণ অধ্যাপক তাসলিমা বেগম জানান, ‘কেবল বিএড ডিগ্রিধারীরাই শিক্ষক হবেন, যেমনিভাবে কেবল এমবিবিএস পাস ব্যক্তিরাই চিকিত্সাসেবা দেন। জানুয়ারি-ডিসেম্বর ২০১২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তির জন্য প্রথমবারের মতো রাখা হয়েছে কিছু শর্ত। যেমন ভর্তির যোগ্যতা—ক) ২০০৬-০৭ বা তত্পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাজিল পাস অথবা কোনো অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩ বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হবে। খ) এসএসসি/ দাখিল/ সমমান থেকে ফাজিল/ স্নাতক পর্যন্ত কমপক্ষে যে কোনো ২টি পরীক্ষায় ২য় শ্রেণি বা বিভাগ থাকতে হবে তবে কর্মরত শিক্ষক যাদের বিরতিহীনভাবে ৭ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এ শর্ত শিথিলযোগ্য। গ) কোনো শিক্ষার্থী একই সময়ে একাধিক কোর্সে কিংবা একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে/ প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে থাকলে দ্বৈত ভর্তিজনিত কারণে তার ভর্তি/ ভর্তিসমূহ বাতিল বলে গণ্য হবে। ঘ) মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ফাজিল, কামিল এবং ফাজিল বিএ (স্পেশাল) ডিগ্রিধারী ভর্তির অযোগ্য। ভর্তি যোগ্যতার ধারা খ ও ঘ শর্তদ্বয় কতটা যৌক্তিক আমাদের বোধগম্য নয়। কেননা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিশাখা-১৩ কর্তৃক এমপিও নির্দেশিকা ২০১০ (আগস্ট ২০১২ পর্যন্ত সংশোধিত)-এর আংশিক সংশোধনী অনুচ্ছেদ নম্বর ১১(১৬)-তে বলা হয়েছে, “বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে সমগ্র শিক্ষাজীবনে একটি তৃতীয় শ্রেণি/ সমমান গ্রহণযোগ্য হবে।” সমগ্র কোর্সটাই যেখানে মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্য সেখানে “মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ফাজিল, কামিল এবং ফাজিল বিএ (স্পেশাল) ডিগ্রিধারী ভর্তির অযোগ্য।” শর্তটি মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্যে অনেকটাই হতাশাব্যঞ্জক। অথচ এই ডিগ্রিধারীদের শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বাধা দিচ্ছে না ‘এনটিআরসিএ’। তাছাড়া ফাজিল বিএ (স্পেশাল) সে তো ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই অনুষ্ঠিত একটি পরীক্ষা। তাকে যথার্থ মূল্যায়ন যদি না করা হলো তবে কেন এ পরীক্ষা? এ প্রশ্ন এখন অনেকের মাথায়। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত শর্তাবলির কারণে বিএমএড কোর্সের উদ্দেশ্য অনেকাংশেই ব্যাহত হবে এবং বঞ্চিত হবে মাদ্রাসার তিন লক্ষাধিক শিক্ষক। অথচ মাদ্রাসার শিক্ষকগণ এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে অতি দ্রুত এর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এই আগ্রহ পূরণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করছি—যেন ‘বিএমটিটিআই’-এ টিটিসি ও মাদ্রাসা বেইজড বিষয় শিক্ষক এবং আরবি বিষয়ে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হয়। কেননা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কোর্স পরিচালনায় মাত্র কয়েকজন টিটিসি বেইজড আরবি শিক্ষকের ওপর নির্ভর করা কিছুতেই কাম্য নয়। তাই বিষয়টি বিবেচনায় আনলে বিএমএড কোর্স হবে আরও নিখুঁত। এমনকি বিভাগীয় পর্যায়ে ঐ কোর্স এবং কর্মরত শিক্ষকদের টিকিউআই-এর অনুরূপ তিন মাস মেয়াদি প্যাডাগজি প্রশিক্ষণ কোর্স চালুর ব্যবস্থা করা হলে অতি দ্রুত মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন সম্ভব। কিশোরগঞ্জ