চট্টগ্রাম সিলেট নীলফামারীতে ব্যাপক সহিংসতা, নিহত ৪

চট্টগ্রাম, সিলেট ও নীলফামারীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গতকাল শনিবার ব্যাপক সহিংসতায় চার জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে পুলিশ, সাংবাদিকসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তি। জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবির সংঘর্ষ চলাকালে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাতকানিয়ায় ৩ জন ও জলঢাকায় একজনের মৃত্যু হয়। জামায়াত কর্মীদের তাণ্ডব ও হামলার জবাবে পুলিশ গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হয় বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কমপক্ষে পাঁচ জেলার বেশ কয়েকটি স্থানে ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। সিলেটের দরগা গেট ও আম্বরখানায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অর্ধডজন গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করে জামায়াত কর্মীরা। এছাড়া বাঁশখালীতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপর হামলা হয়েছে। এসময় স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহত হন। চট্টগ্রাম অফিস জানায়, গতকাল সকাল ১১টায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে জামায়াত-শিবির কর্মীরা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়ার হাসমত আলী সিকদার দোকানের সামনে গাছ দিয়ে ব্যারিকেড দেয়। পুলিশ ব্যারিকেড সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে জামায়াত-শিবির কর্মীরা র্যাব-পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এনিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার পর অবরোধকারীরা মারমুখী হয়ে উঠলে র্যাব-পুলিশ বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালাতে বাধ্য হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে ২ জন এবং পরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় অপর একজন মারা যান। নিহতরা হলেন: উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামের আবু তাহেরের পুত্র শহিদুল ইসলাম (১৫), ছোট ঢেমশা এলাকার আবদুর রশিদের পুত্র আবু তাহের (২৮) এবং আফজল নগর এলাকার ছিদ্দিক আহমদের পুত্র ওছমান (২৬)। এরপর ওই এলাকায় আরো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অবরোধকারীদের সাথে এলাকার মহিলা শিশু কিশোরসহ বিভিন্ন স্তরের লোকজন সামিল হয়। গ্রামবাসীরা লাঠি, ঝাড়ু নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। গতকাল সারাদিন পুরো সাতকানিয়া এলাকায় উত্তেজনা ও আতংক অবস্থা বিরাজ করে। বিভিন্ন সড়কে সকল ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়রা জানান, সংঘর্ষে কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। ঘটনার সময় ২ বিদেশি পর্যটক আটকা পড়লে পুলিশ তাদের থানায় নিয়ে আসে। এরা হলেন- লেস কলিন্স (৫৪) ও জনাথন আবেল (৪০)। এদিকে গত বৃহস্পতিবার সাতকানিয়ার কেরানীহাটে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও পুলিশ আহতের ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের ৯১ জনসহ অজ্ঞাত ৪/৫ হাজার লোকের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদি হয়ে থানায় মামলা করেছে। দুপুরে বাঁশখালীর চাম্বল এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা চালায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। পুলিশ তাদের ধাওয়া দিলে দুই পক্ষে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাব্বির আহমদ পরিস্থিতি শান্ত করতে গেলে ইটের আঘাতে আহত হন। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাম্বল এলাকায় বিকাল পর্যন্ত সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল বলে এলাকাবাসী জানায়। এছাড়া সীতাকুণ্ডে ভোর ৫টার দিকে দুটি গাড়িতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। পৌরসভার বটতল নামক ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লোহা বোঝাই একটি ট্রাক (ঢাকা মেট্রো- ট- ১৬-৬৬৩৯) ও গার্মেন্টসের মালামাল বোঝাই একটি কাভার্ড ভ্যানে (ঢাকা মেট্রো-ট-১১-৭৩১০) আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পরে সীতাকুণ্ড ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাইদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে গত তিন দিনে দক্ষিণ চট্টগ্রামে সহিংসতায় ৬ জন জনের মৃত্যু হলো। কার্যত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ও তত্সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, অবরোধ, সভা-সমাবেশ ও সংঘর্ষ চলছেই। জামায়াত-শিবিরের লোকজন আদালত ভবন, পৌরসভা, ব্যাংক, বীমা, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় এবং সরকারি জীপসহ অসংখ্য যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘর-বাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের কয়েকটি বাড়িতেও ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে তারা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী চেষ্টা চালিয়েও চট্টগ্রামের সাথে কক্সবাজার, বান্দরবানসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্তত ২০টি রুটে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করতে পারছে না। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক গত তিনদিন ধরে বন্ধ থাকায় কক্সবাজারে বিপুল সংখ্যক পর্যটক আটকা পড়েছে। পণ্য ও লোকজন পরিবহনও বন্ধ রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল সড়ক এই দু’টি উপজেলাধীন হওয়ায় ঢাকার সাথে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। দু’দিন আগে রেলের ফিসপ্লেট তুলে নেয়ায় ফেনীর সন্নিকটে ৬টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে ১২ ঘণ্টা চট্টগ্রাম-ঢাকা রেল চলাচল বন্ধ ছিল। গত তিনদিন ধরে সীতাকুন্ড এলাকায় যানবাহনে অগ্নিসংযোগের কারণে বিশাল যানজটের সৃষ্টি হয়। এদিকে আগামী তিনদিন হরতাল থাকায় সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করার আশংকা করা হচ্ছে। একইভাবে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের হরতাল কর্মসূচি চলাকালে নাশকতার বিষয়ও কেউ উড়িয়ে দিচ্ছে না। এসব নিয়ে চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে এক প্রকার আতংক বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, দক্ষিণ চট্টগ্রামে সরকারি দলের পক্ষ থেকে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কোন প্রকার সহায়তা না পাওয়ায় তারা বেশি বেকায়দায় পড়েছে। ওই সকল এলাকায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সভা-সমাবেশ তো দূরের কথা তাদের অনেকে এলাকা ছেড়ে শহরে অবস্থান করছেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের যে সকল এলাকায় জামায়াত-শিবির সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব চালাচ্ছে ওই এলাকাসমূহে মূলত বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। এর মধ্যে চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আসনে এলডিপির কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি শামসুল ইসলাম ও বাঁশখালী সংসদীয় আসনে বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, শনিবার বিকেলে জামায়াত-শিবিরের সাথে হরতাল বিরোধীদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় গোটা শহরে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। এছাড়া জলঢাকা উপজেলার রাজার হাটে জামায়াত-শিবির কর্মীরা বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বেধে যায়। এসময় বিজিবির গুলিতে খুটামারা কবিরাজ পাড়া গ্রামের পল্ল¬ী চিকিত্সক আনিছুর রহমানের পুত্র আতিকুর রহমান আপন (১৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এসময় অজ্ঞাত আরো ২ জন গুলিবিদ্ধ হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এখানে বিক্ষুব্ধ জামায়াত-শিবির কর্মীরা ৮/১০টি মোটর সাইকেল এবং কয়েকটি দোকান ভাঙচুর করে। এতে গোটা উপজেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় সমস্ত দোকানপাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে সিলেট অফিস জানায়, নগরীর দরগা গেইট, আম্বরখানা ও শাহী ঈদগাহে শনিবার বেলা ৩টার দিকে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, যানবাহন পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। দরগা গেইটে জামায়াত-শিবির মিছিল বের করার প্রস্তুতিকালে হেলমেট মাথায় বেশ কিছু তরুণ জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে সড়কের ‘বসুন্ধরা’ মোটর সাইকেলের একটি শো’রুমে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে শো’রুমের ৬টি মোটর সাইকেল পুড়ে যায় ও শো’রুমটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় শিবির কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে হামলাকারীদের প্রতিহত করে এবং তাদের দু’টি মোটর সাইকেল আটক করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় আহত দু’জন ছাত্রলীগ কর্মীকে দ্রুত ওসমানী হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নেভায়। একাধিক সূত্র জানায়, হামলাকারীরা ছাত্রলীগ কর্মী ছিল। ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায় জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে শো’রুমে হামলার বিষয়টি শুনেছেন তারা। তবে ছাত্রলীগের কেউ জড়িত কিনা স্পষ্ট নয়। তারা এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছেন। এদিকে আম্বরখানায় সোনালী ব্যাংকের সম্মুখে একটি জীপে ও একটি অটোবাইকে আগুন দেয় জামায়াত কর্মীরা। তারা আম্বরখানায় পূবালী ব্যাংক, ডাচ বাংলা ব্যাংক এবং সুবিদবাজারে মার্কেন্টাইল ব্যাংকেও ভাঙচুর চালায়। কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি আতাউর রহমান জানান, পুলিশ এ ঘটনায় ২ শিবির কর্মীকে আটক করেছে। পুলিশ ফোর্সসহ তিনি ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন। তবে এ ঘটনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। পিরোজপুর অফিস জানায়, জেলার জিয়ানগর উপজেলার কলারন গ্রামের জোমাদ্দার হাটে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা মিছিল করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিস ভাঙচুর করেছে । সকাল ৮টার দিকে কয়েকশ’ সাঈদী সমর্থক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মিছিল নিয়ে আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা চালায়। হামলাকারীরা জমাদ্দারহাট আওয়ামী লীগের অফিস ঘর এবং অফিসে থাকা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি, টিভি সেট ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল ভাঙচুর ও লুটপাট করে। পুলিশ এ সময় ৭ জামায়াত-শিবির কর্মী ও সমর্থককে গ্রেফতার করেছে। এ ঘটনার পর ফয়সাল নামে এক সাঈদী সমর্থককে গণপিটুনি দেয়া হয়। তবে ফয়সালের বাবা ওয়াদুদ মিয়া জানান, তার ছেলে একজন গার্মেন্টস কর্মী। সে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এদিকে অফিস ভাঙচুরের খবর পেয়ে আওয়ামী লীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীরা দেশী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে স্থানীয় এক বিএনপি সমর্থকের অফিসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে। রাজশাহী অফিস জানায়, মহানগরীর অলোকার মোড়, রাণীবাজার ও বাটারমোড়ে গতকাল শিবির কর্মীরা তাণ্ডব চালিয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কেন্দ্র ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তারা এই তাণ্ডব চালায়। এসময় তারা রাজশাহী শিল্প বণিক সমিতির ভবন, ওই ভবনের ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অফিস, মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের অফিস, উত্তর পার্শ্বের ডাচবাংলা ব্যাংকের অফিস, একই ব্যাংকের এটিএম বুথ ও মাস্টারসেফ চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে শিবির কর্মীরা পুলিশের উপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। জবাবে পুলিশও রাবার বুলেট ও টিয়ারসেল ছুঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এসময় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরাম্যান ও পুলিশসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে শিবির সন্দেহে ৭ জনকে আটক করেছে। পুলিশের বোয়ালিয়া জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) রোকনুজ্জামান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। খুলনা অফিস জানায়, শনিবার বিকালে নগরীর ডাকবাংলো মোড় ও গল্লামারী এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াত-শিবির কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে এক কনস্টেবলসহ ১৫/২০ জন আহত হয়েছেন। সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জের মাদানীনগর এলাকায় শনিবার বিকেলে ৪টায় জামায়াত ও শিবিরের লোকজন একটি মোটর সাইকেলসহ অন্তত ৪টি যানবাহনে আগুন দিয়েছে ও ২টি ট্রাক ভাংচুর করেছে। এ সময় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় পুলিশ ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে জামায়াত-শিবির কর্মীরা শহরের প্রধান সড়কে অবস্থিত প্রাইম ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকে হামলা চালিয়েছে। এছাড়া শহরের লালদীঘিরপাড়, বাজারঘাটা, বাস টার্মিনাল এলাকাসহ বিভিন্নস্থানে ২০/২৫টি যানবাহন ভাংচুর করে তারা। এসময় আতংকে লোকজন দিগবিদিক ছুটোছুটি করে। দোকানপাট এবং গাড়ী চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, সাঈদীর মুক্তি ও হরতালের সমর্থনে গতকাল বিকেলে লোহাগাড়া উপজেলা সদরের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কস্থ বটতলী মোটর স্টেশন ও পদুয়াসহ বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবির বিক্ষোভ মিছিল বের করে। উপজেলার দরবেশহাট এলাকায় মিছিলকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ ঘটে। এতে দু’জন গুলিবদ্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে। সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, জেলায় জামায়াতের ডাকা অর্ধদিবস হরতাল ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ, রাস্তায় গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। তবে সাতক্ষীরা পৌর এলাকা ও আশাশুনি উপজেলা সদরে ১৪৪ ধারা বলবত্ থাকায় শহরের ভিতর জামায়াত-শিবির কোন ধরনের মিছিল, মিটিং, সমাবেশ, পিকেটিং করতে পারেনি । ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, উপজেলা শহরে বিকালে জামায়াত ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এসময় উভয় পক্ষ ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। পুলিশ ১০ রাউন্ড টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, পুলিশের বিনা বাধায় মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে ঝিনাইদহ শহরের হামদহ এলাকায় লাঠি, কুড়াল ও রামদাসহ মিছিল-সমাবেশ করেছে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা। কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, শনিবার কুমিল্লা মহানগরীতে হাসপাতাল ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ কমপক্ষে ২০টি স্থাপনায় জামায়াত-শিবির হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে। ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে তারা ছোট-বড় মিলিয়ে কমপক্ষে ২৫টি যানবাহনে ভাংচুর চালায়। সকাল পৌনে ১০টার দিকে বিভিন্ন স্থান থেকে জামায়াত-শিবির কর্মীরা নগরীর কান্দিরপাড়ে একটি অভিজাত শপিং কমপ্লেক্সের সামনে এসে জড়ো হয়ে আকস্মিকভাবে লাঠিসোঁটা নিয়ে মিছিল বের করে এই হামলা চালায়। মংলা সংবাদদাতা জানান, জামায়াত-পুলিশের সংঘর্ষে ২ পুলিশসহ অন্তত ২২ জন আহত হয়েছে। আটক হয়েছে দু’শিবির কর্মী। মংলা থানার ওসি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, পিরোজপুরে জামায়াত-শিবিরের বিক্ষোভ মিছিল থেকে কাউখালী উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা সিদ্দিকুল ইসলামসহ ৭ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এসময় পুলিশের লাঠিচার্জে কয়েকজন আহত হন। সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর হাফেজ মাওলানা রবিউল বাশারকে পুলিশ বিকালে তার গ্রামের বাড়ি থেকে আটক করেছে। পরে সাতক্ষীরা জজ কোর্টে হাজির করে তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। পরশুরাম সংবাদদাতা জানান, বিক্ষুব্ধ শিবির কর্মীরা শহরের এসএসকে সড়কস্থ মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। এসময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে পুরো শহরে গাড়ী চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে ১৪৪ ধারা আরো ৩ জনের মৃত্যু কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, জেলায় বিএনপি ও ১৪ দল একই স্থানে সভা ডাকায় জেলা প্রশাসন গতকাল কুষ্টিয়া পৌর এলাকায় ফের ১৪৪ ধারা জারি করেছে। দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ১৪৪ ধারা বলবত্ থাকবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরে মাইকিং করা হয়। এর আগে গত শুক্রবার দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সমগ্র কুষ্টিয়ায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল। বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, উপজেলা আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী একই স্থানে সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করায় ফয়লাহাট বাজারে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। রবিবার সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই আদেশ বহাল থাকবে। লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, শহরের উত্তর তেমুহনী এলাকায় জামায়াত-শিবিরের মিছিল থেকে বিপুল পরিমাণ ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে রায়পুর উপজেলা শহরে আজ রবিবার বিকাল ৩টায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত একই স্থানে সমাবেশ ডাকায় আজ সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত উপজেলা সদরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। ফেনী প্রতিনিধি জানান, গতকাল সন্ধ্যায় ফেনীর ছাগলনাইয়ার জমাদ্দার বাজারে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একই স্থানে সভা ডাক দেয়ায় প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত নেয়। ফেনী সংবাদদাতা জানান, একই সময় আওয়ামী লীগ-জামায়াত বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ আহ্বান করায় ছাগলনাইয়া পৌর এলাকায় প্রশাসন শনিবার ১৪৪ ধারা জারি করেছে। সেনবাগ সংবাদদাতা জানান, জেলায় জামায়াত-শিবিরের ডাকা অর্ধদিবস হরতাল চলাকালে গতকাল একজনের মৃত্যু হয়েছে। নোয়াখালী-ফেনী মহাসড়কের সেনবাগ উপজেলার সেবারহাট বাজারে সকালে একদল জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী হরতালের সমর্থনে পিকেটিং করছিল। এ সময় একটি ট্রাককে তারা ধাওয়া দিলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোহাম্মদ হারুন (২৫) নামে এক পথচারীকে চাপা দেয়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে নোয়াখালীর প্রাইম হাসপাতালে ভর্তির পর দুপুর সোয়া ২টার দিকে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত হারুন ঐ বাজারের লাকড়ি ব্যবসায়ী এবং উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের রাজারামপুর গ্রামের চৌকিদার বাড়ির মো. সিরাজ মিয়ার ছেলে। সেনবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এমরান আলী ট্রাক চাপায় হারুন নামে একজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পীরগাছা (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, আহত শিবিরকর্মী আকমল হোসেন (১৪) রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গেছে। গত বৃহস্পতিবারের সহিংস ঘটনার সময় সে গুলিবিদ্ধ হয়। তার বাড়ি উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের জ্ঞানগঞ্জ গ্রামে। নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, সোনাইমুড়ীতে শুক্রবার র্যাব সদস্যদের গুলিতে আহত শিবিরকর্মী কোরবান আলী চিকিত্সাধীন অবস্থায় গতকাল রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন। নিহত কোরবান সোনাইমুড়ী উপজেলার মটুবি গ্রামের গোরফানের পুত্র। এই ঘটনায় অজ্ঞাত ৫-৬শ দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে র্যাব-১১ এর ডিএডি মো. জসীমউদ্দিন বাদী হয়ে গতকাল সোনইমুড়ী থানায় একটি মামলা করেছেন। এদিকে গতকাল জামায়াতের ডাকে জেলায় অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়েছে। হরতালকারীরা বিভিন্ন সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ব্যারিকেড দিলে বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা তা তুলে দেয়। হরতাল চলাকালীন জেলায় রিকশা ছাড়া ভারি কোন যানবাহন চলাচল করেনি। বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার কাটাখালী মোড়ে শনিবার বিকাল থেকে রাত সাড়ে সাতটা পর্যন্ত পুলিশের সাথে জামায়াত-শিবির কর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়েছে। বিকাল ৫টার দিকে জামায়াত-শিবিরের কয়েক হাজার কর্মী প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে খুলনা-মংলা সড়কের কাটাখালী মোড় এলাকায় অবস্থান নিয়ে রাস্তা অবরোধ করে। এক পর্যায়ে তারা ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবপ্রসাদ পালকে স্থানীয় একটি পেট্রোল পাম্পে অবরুদ্ধ করে রাখে। পুলিশ কয়েক দফা চেষ্টা চালিয়ে রাত আটটার দিকে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে উদ্ধার করে। এই ঘটনায় অন্তত আট পুলিশ সদস্যসহ অর্ধ শতাধিক মানুষ আহত হন। রাতে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আহতদের নাম পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে জান্নাতুল ফেরদৌস ও আলিমুর নামে দুই পুলিশ কনস্টেবলের নাম জানা গেছে। অবরোধ চলাকালে খুলনা-মংলা, বাগেরহাট-খুলনা ও খুলনা-মাওয়া সড়কে কয়েক শত যানবাহন আটকা পড়ে ব্যাপক জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সদর উপজেলার ফতুল্লার পঞ্চবটি এলাকায় শনিবার রাতে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগী সংগঠন ছাত্র শিবিরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসময় বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। শিবিরের নেতা-কর্মীরা বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করে। এ সময় পঞ্চবটি ও এর আশপাশ এলাকাতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ সড়কে যান চলাচল। পরে পুলিশ ফাঁকা গুলি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।