ইতিহাসে নারী দিবস এবং নারীবাদ

নারীবাদ হলো একটি সামাজিক আন্দোলন যা নারীর গত্বাঁধা ভূমিকা ও ইমেজের পরিবর্তন, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বিলোপ এবং পুরুষের মতো নারীর সমান অধিকার অর্জনের প্রয়াসী। নারীবাদ নারীর সামগ্রিক কল্যাণের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। নারীবাদ ও নারী স্বাধীনতা অভিন্ন নয়। নারীর স্বাধীনতা অর্থবহ করার লক্ষ্যে যে আন্দোলন, যুক্তি ও তত্ত্ব বিভিন্ন চিন্তাবিদগণ প্রদান করেছেন তাকে সাধারণভাবে নারীবাদ আখ্যা দেয়া যায়। একজন মানুষ হিসেবে নারী তার পরিপূর্ণ অধিকারের দাবি হল নারীবাদ। ১৯১০ সালে জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেডকিন কর্তৃক আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী সম্মেলনে উত্থাপিত প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯১৪ সাল থেকে প্রতিবছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশ্চাত্যে নারীর মূল্য নিয়ে প্রথম প্রশ্ন তোলেন ফরাসী রাজসভার নারী সদস্য Christin de Pizan. ১৪০৫ সালে তিনি The book of the city of Ladies নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। নারীবাদের ইতিহাসে প্রথম নারীবাদীরূপে যার নাম পাওয়া যায় তিনি হলেন সতের শতকের ফরাসি নারী পলেইন ডিলা ব্যারে। নারীবাদকে প্রথম সংগঠিত আকারে উপস্থিত করেন ইংল্যান্ডের মেরি ওফেস্টোনক্রাফট তাঁর বিখ্যাত সাড়া জাগানো নারীবাদী গ্রন্থ ‘নারীর অধিকারের ন্যায্যতা’ গ্রন্থে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সিমন দ্যা বোভ্যেয়ার রচনা করেন ‘The Second Sex' নামক গ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি বলেন, ‘কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, বরং হয়ে ওঠে নারী’। নারী সম্পর্কিত বহুল আলোচিত, গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় এই কথাটির মূল অর্থ হল আমাদের পশ্চাদগামী পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অর্থাত্ পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থাই নারীকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে সম্মান না দিয়ে অবলা, অর্ধাঙ্গিনী রূপে গড়ে তুলছে। এই তত্ত্বটি আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৮৩৭ সালে আমেরিকায় প্রথম দাসপ্রথা বিরোধী নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যার মাধ্যমে মার্কিন নারীরা রাজনীতি করার অধিকার ও সুযোগ পায়। ১৮৪৮ সালের ১৯-২০ জুলাই নারীবাদীদের উদ্যোগে নিউইয়র্কের সেনেকো ফলস এ বিশ্বের প্রথম নারীর অধিকার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকরা এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সূচনা করেন। ১৮৬০ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্ক শহরের সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নিজস্ব ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে সমর্থ হন। বাংলার প্রথম নারীবাদীরূপে রোকেয়া সাখাওয়াত, সরলা দেবী এবং পন্ডিত রমাবাঈ হলেন তত্কালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের নারীবাদী চিন্তাধারার জনক।