বিশ্বজুড়ে আলো অন্ধকারের গল্প
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০১৩, ১৯:১২
আমরা যখন নানা সময়ে নারীর প্রগতি ও অগ্রগতি বিচার করতে চাই তখন অবধারিতভাবে আলোচনায় চলে আসে সেই অগ্রগতির পেছনের যুদ্ধের গল্প, সহযোগিতার গল্প বা পিছিয়ে পড়ার গল্পগুলোও। বছরজুড়ে সফল নারী হিসেবে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হওয়া ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি পার্ক জিউন-হাই, কানাডার সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ ওন্টারিওর প্রথম নারী এবং সমকামী প্রিমিয়ার ক্যাথেলিন ওয়েন বা পাকিস্তানের প্রতিবাদী কিশোরী মালালা ইউসুফজাই, যিনি সাহস ও কাজের জন্য প্রভাবশালী টাইম সাময়িকীর ২০১২ সালের দ্বিতীয় বর্ষসেরা (রানারআপ) ব্যক্তিত্ব নির্বাচিত হয়েছেন- এমন অসংখ্য নারী লড়াই ও সহায়তার কলমে লিখেছেন তাদের সাফল্যের গল্প। কিন্তু বিশ্ব একই সাথে জেনেছে এই তথাকথিত অগ্রসরমান বিশ্বে এখনো কতটা অন্ধকার বিরাজ করছে। খায়বার-পাখতুনখোয়া প্রদেশের সোয়াত উপত্যকা দখলে নেয়ার পর মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তালেবান জঙ্গিরা। এর প্রতিবাদে ২০০৯ সালে বিবিসি উর্দু বিভাগের ওয়েবসাইটে ছদ্মনামে একটা ডায়েরি লিখছিল মালালা। ধর্মান্ধ শক্তির বিরুদ্ধে ১২ বছরের কিশোরীর সাহসী কণ্ঠস্বর সবাইকে চমকে দিয়েছিল, জুগিয়েছিল সাহস, বাড়িয়েছিল মনোবল। পাকিস্তানের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা যখন তালেবানের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস করছিল না তখন মালালা দৃঢ়চিত্তে বলেছিল শিক্ষার দ্বার কারও জন্য বন্ধ করো না। ফলস্বরূপ গত ৯ অক্টোবর সোয়াত উপত্যকায় তালেবান সদস্যদের গুলিতে আহত হন মালালা। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে খুব কাছ থেকে তার মাথায় গুলি করা হয়। এখন পুরোপুরি সেরে ওঠার পথে তিনি। তার উপর এ হামলায় সারা বিশ্বে নিন্দার ঝড় ওঠে। এ হামলার মাধ্যমে তার কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার চেষ্টা হলেও বিশ্ব পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তার। হাজার হাজার পাকিস্তানি হামলার প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে আসে। মালালা এখন বিশ্বব্যাপী তরুণীদের সাহসের প্রতীক। অনেক স্বীকৃতি, অনেক শুভ কামনা সাথে আছে বলে মালালা তালেবানদের পুনরায় আক্রমণের হুমকিতেও যথেষ্ট সাহসী মনোভাব দেখিয়ে নারী শিক্ষার জন্য কাজ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে মানবতা, নারী অধিকার এসবকিছু বিশাল বড় একটা হোঁচট খেয়েছিল যখন গত বছর ১৬ ডিসেম্বর রাতে নয়াদিল্লিতে চলন্ত বাসে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ২৩ বছর বয়সী এক মেডিক্যালের ছাত্রীকে ধর্ষণ করে বাসচালকসহ ছয়জন। ধর্ষণের পর তাকে ও তার সঙ্গের ছেলেবন্ধুকে রড দিয়ে বেদম পিটিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় চলন্ত বাস থেকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ মৃত্যুর সাথে লড়ে হার মানেন সেই তরুণী। শুধু নয়াদিল্লি নয়, সারা বিশ্ব ক্ষোভে ফেটে পড়ে এ ঘটনায়। সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে সব সুখকর চিন্তা ভেঙে পড়তে চায় এই ঘটনায় অভিযুক্তদের পরিচয় শুনে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছে বাসচালক রাম সিং, তার ভাই মুকেশ, ফল বিক্রেতা পাভান গুপ্তা, শরীরচর্চার প্রশিক্ষক বিনয় শর্মা ও বাসের পরিচ্ছনতাকর্মী অক্ষয় ঠাকুর এবং ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর। ধর্ষণের উদ্দেশ্য নিয়ে তরুণীকে বাসে উঠিয়েছিল বাসচালক ও বাস সংশ্লিষ্ট অন্যরা। কিন্তু সুযোগ পেয়ে কালো হাত বাড়াতে কসুর করেনি শরীরচর্চা প্রশিক্ষক, ফল বিক্রেতা, এমনকি অনূর্ধ্ব ১৮ বয়সের কিশোরও। নারী যখন বিভিন্ন বয়স, যোগ্যতা ও পেশার মানুষের কাছে শুধুই একটি ভোগ্য বস্তু হিসেবে ধরা দেয় তখন বুঝতে হবে খুব বড় একটা ফাঁক রয়ে যাচ্ছে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও শিক্ষায়। এই খবর প্রকাশের পর এমনকি বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি ঠিক এমন উপায়ে নারী ধর্ষণের চেষ্টা করতে। ধর্ষণের ফলে ও ধর্ষণ থেকে বাঁচতে এমনকি মৃত্যুর স্বাদও নিয়েছেন অনেক নারী। পরিবার, সমাজ ও গণমাধ্যমে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি নতুন মাত্রা নিয়ে না আসলে অগ্রগতির সকল ধারণা মিথ্যে হয়ে দেখা দেবে। থাকবে শুধু অন্ধকার আর অমানুষিকতা।